রাজনীতিতে যোগ্যতার চেয়ে তেলবাজির কদর: ক্ষমতার চারপাশে সত্যের আকাল
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
রাজনীতিতে যোগ্যতার মূল্য আছে, অভিজ্ঞতার মূল্য আছে, জনসেবারও মূল্য আছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে—এসবের যথাযথ মূল্যায়ন কতটুকু? অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়, যোগ্যতা, সততা কিংবা দীর্ঘদিনের ত্যাগের চেয়ে ক্ষমতাসীন ব্যক্তির মন জোগানোর বিশেষ এক বিদ্যার কদরই বেশি। সেই বিদ্যার নাম তেলবাজি। যে যত দক্ষতার সঙ্গে তেল মাখাতে পারেন, ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সম্ভাবনাও যেন তাঁর তত বেশি।
তেলবাজির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে যোগ্যতার বিশেষ প্রয়োজন হয় না। নেতার বক্তব্যে ভুল থাকলেও বলতে হবে, ‘স্যার, অসাধারণ বলেছেন!’ পাঁচ মিনিটের বক্তব্যকে আখ্যা দিতে হবে পাঁচ বছরের গবেষণার ফসল হিসেবে। ভুল সিদ্ধান্তেরও ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হবে দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে। অর্থাৎ নেতা যা-ই বলুন বা করুন, তাঁর চারপাশের প্রশংসাবাহিনীকে প্রমাণ করতে হবে—সবকিছুই যথার্থ।
এ প্রবণতা নতুন নয়। তবে ক্ষমতার রাজনীতিতে এর বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কখনো কখনো মনে হয়, রাজনৈতিক যোগ্যতার চেয়ে তেলবাজির ওপরই যেন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতা চলছে!
রাজার নতুন পোশাক, রাজনীতির পুরোনো বাস্তবতা
ডেনিশ কথাসাহিত্যিক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের বিখ্যাত গল্প ‘দ্য এমপেররস নিউ ক্লোদস’-এর কথা মনে পড়ে। এক রাজাকে দুই প্রতারক বোঝাল, তারা এমন পোশাক তৈরি করতে পারে, যা কেবল বুদ্ধিমান ও যোগ্য ব্যক্তিরাই দেখতে পাবেন। বাস্তবে কোনো পোশাকই ছিল না। কিন্তু রাজাকে অসন্তুষ্ট করার ভয়ে মন্ত্রী থেকে শুরু করে দরবারের সবাই অদৃশ্য পোশাকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত রাজা সেই পোশাক পরেই নগর পরিদর্শনে বের হলেন। তখন এক শিশু বলে উঠল, ‘রাজা তো কোনো পোশাকই পরেননি!’
শিশুটির সরল উচ্চারণে ভেঙে পড়েছিল মিথ্যার রাজকীয় আয়োজন।
আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও এর প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। কোনো নেতা সিদ্ধান্ত নিলেই চারপাশের লোকজন সেটিকে যুগান্তকারী বলে প্রচার শুরু করেন। সিদ্ধান্তের ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা তো দূরের কথা, প্রশ্ন তোলার সাহসও অনেকের থাকে না। কারণ তাঁরা জানেন, সত্য বললে নেতার বিরাগভাজন হতে পারেন, আর প্রশংসা করলে পদ-পদবি, মনোনয়ন কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার দরজা খুলে যেতে পারে।
ফলে নেতার চারপাশে প্রশংসার দেয়াল যত উঁচু হয়, সাধারণ মানুষের বাস্তবতা তত দূরে সরে যায়। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, সরকারি দপ্তরে সেবা পেতে মানুষ হয়রানির শিকার হয়, স্থানীয় সমস্যার সমাধান হয় না; অথচ নেতার কাছে পৌঁছায় উন্নয়ন আর সাফল্যের মনগড়া বয়ান।
রাজা অন্তত এক শিশুর মুখে সত্য শুনেছিলেন। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সত্য উচ্চারণকারী মানুষটিকেই অনেক সময় ‘ষড়যন্ত্রকারী’, ‘বিরোধী’ কিংবা ‘উন্নয়নবিরোধী’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করা হয়।
শেয়ালের প্রশংসায় কাকের সর্বনাশ
ঈশপের আরেকটি গল্পে দেখা যায়, এক কাকের মুখে পনির দেখে শেয়াল সেটি পাওয়ার কৌশল আঁটে। কাকের সৌন্দর্য ও কণ্ঠের এমন প্রশংসা শুরু করে যে, আত্মপ্রশংসায় মুগ্ধ কাক গান গাইতে মুখ খুলতেই পনিরটি নিচে পড়ে যায়। শেয়াল সেটি নিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যায়।
রাজনীতির তেলবাজদের কৌশলও অনেকটা এমন। তাঁদের মুখে নেতার জনপ্রিয়তা, দূরদর্শিতা, নেতৃত্ব ও অবদানের প্রশংসা লেগেই থাকে। কিন্তু সেই প্রশংসার আড়ালে থাকে পদ-পদবি, মনোনয়ন, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের হিসাব। নেতা যখন প্রশংসায় আত্মহারা, ততক্ষণে প্রশংসাকারী নিজের স্বার্থ উদ্ধার করে ফেলেছেন। আর নেতার হাত থেকে কখন যে জনস্বার্থের পনির খসে পড়েছে, তা বোঝার অবকাশও থাকে না।
তেলবাজির মাশুল দেয় জনগণ
তেলবাজির লাভ ব্যক্তির, কিন্তু ক্ষতি রাষ্ট্রের এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের। যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য পুরস্কৃত হলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অযোগ্য ব্যক্তির জায়গা করে নেওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। বাস্তব সমস্যার বদলে প্রশংসার খবর যখন নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছায়, তখন সিদ্ধান্তও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জনসেবার জায়গা দখল করে নেয় ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতার বলয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—নেতার ভালো কাজের প্রশংসা করা তেলবাজি নয়। বরং ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অংশ। সমস্যা তখনই, যখন প্রশংসা সত্যের ভিত্তিতে নয়, সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে করা হয়। যখন ভুলকে ভুল বলার সাহস হারিয়ে যায়, তখন আনুগত্য আর অন্ধ তোষামোদ একাকার হয়ে ওঠে।
একজন প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী নেতার ভুল ধরিয়ে দেন; তেলবাজ চান নেতা যেন নিজের ভুল কখনো বুঝতেই না পারেন। একজন যোগ্য সহকর্মী নেতাকে বাস্তবতা দেখান; তোষামোদকারী বাস্তবতাকে নেতার পছন্দমতো সাজিয়ে উপস্থাপন করেন। এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে না পারার রাজনৈতিক মূল্য অনেক বড়।
তেল দিয়ে চাকা চলে, রাষ্ট্র নয়
যন্ত্রের চাকা সচল রাখতে তেল প্রয়োজন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজন যোগ্যতা, সততা, জবাবদিহি, দূরদর্শিতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। সেখানে তেলবাজির আধিক্য রাষ্ট্রের চাকা সচল করে না; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে পিচ্ছিল করে তোলে।
নেতাদেরও বুঝতে হবে, চারপাশে যারা সারাক্ষণ ‘আপনিই সঠিক, আপনিই শ্রেষ্ঠ’ বলে প্রশংসা করেন, তাঁরা সবাই বিশ্বস্ত নন। অনেক সময় মুখের ওপর ভুল ধরিয়ে দেওয়া মানুষটিই সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। কারণ সমালোচনা শত্রুতা নয়; বরং ভুল সংশোধনের সুযোগ।
রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে তোষামোদ নয়, যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে হবে। পদ-পদবি দিতে হবে অভিজ্ঞতা, সততা, দক্ষতা ও জনসেবার ভিত্তিতে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার যোগ্যতাকে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতাকে রাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, নেতার গায়ে তেল মাখানোর খরচ শেষ পর্যন্ত জনগণের পকেট থেকেই যায়। আর সেই তেলে নেতা যখন বাস্তবতা থেকে পিছলে পড়েন, তখন তার মাশুলও দিতে হয় জনগণকে। যে রাজনীতিতে সত্য বলার চেয়ে তোষামোদ করা নিরাপদ, সেখানে নেতৃত্ব শক্তিশালী হয় না; বরং ক্ষমতার চারপাশে অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।