গ্রাম সরকার: ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নাকি নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর বোঝা?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২১ পিএম
গ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। অথচ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গ্রামের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গ্রামের মানুষের সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রয়োজন সবচেয়ে ভালো বোঝেন সেখানকার বাসিন্দারাই। তাই স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণে কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার চিন্তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এই প্রেক্ষাপটে আবারও গ্রাম সরকার গঠনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন একটি কাঠামো তৈরি করলেই কি গ্রামের মানুষের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে, নাকি বিদ্যমান স্থানীয় সরকারব্যবস্থার ওপর যুক্ত হবে আরেকটি প্রশাসনিক স্তর?
সরকারের প্রকাশিত ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যের গ্রাম সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য হবেন এর প্রধান, সংরক্ষিত নারী সদস্য থাকবেন উপদেষ্টা হিসেবে। বাকি ১৫ জন সদস্য আসবেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা থেকে। সদস্য নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, গ্রামের উন্নয়ন, সামাজিক সমস্যা সমাধান এবং সরকারি সেবা কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
প্রস্তাবটি কাগজে-কলমে আকর্ষণীয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক কাঠামোর সফলতা শুধু সদস্যসংখ্যা কিংবা প্রতিনিধিত্বের বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তাদের ক্ষমতা, স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও কার্যকর ভূমিকার ওপর। ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করলেই জনগণের ক্ষমতায়ন হবে না, যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকে অন্য কোথাও কিংবা কমিটিটি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
গ্রাম সরকারের ধারণা বাংলাদেশে নতুন নয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৮০ সালে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ চালু হয়েছিল। গ্রামের মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, গণসাক্ষরতা, পরিবার পরিকল্পনা ও স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের সময় এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গ্রাম পরিষদ আইন করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৩ সালে নতুন গ্রাম সরকার আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু আইনটি নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন ওঠে। ব্লাস্টের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে হাইকোর্ট আইনটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। পরে ২০০৯ সালে আইনটি বাতিল হয়।
অর্থাৎ, প্রায় ৪৬ বছরের ইতিহাসে গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বারবার এসেছে, কিন্তু স্থায়ী ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। অতীতের এই অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে নতুন করে একই ধরনের কাঠামো দাঁড় করানো হলে পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়।
প্রস্তাবিত গ্রাম সরকারের কাজের পরিধি যথেষ্ট বিস্তৃত। রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নির্মাণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, টিকাদান, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন কার্যক্রমে সহযোগিতা, কৃষি উপকরণের সরবরাহ পর্যবেক্ষণ, মৎস্য চাষ, পশুপালন ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে মানুষকে উৎসাহিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাদক, জুয়া, চুরি, সন্ত্রাস এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু এসব দায়িত্ব পালনের জন্য গ্রাম সরকারের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, অর্থ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা কতটুকু থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে গ্রাম সরকারের দায়িত্বের সীমারেখা স্পষ্ট না হলে সমন্বয়ের পরিবর্তে তৈরি হতে পারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি। স্থানীয় সরকারের বিদ্যমান পাঁচটি কাঠামোকে কার্যকর ও ক্ষমতায়িত না করে নতুন একটি কাঠামো যুক্ত করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদারের আশঙ্কা, বাস্তবে গ্রাম সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ এজাজ মনে করেন, স্থানীয় সরকারকে ধাপে ধাপে ক্ষমতায়িত করার উদ্দেশ্যে গ্রাম সরকার ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এই দুই মতের মধ্যেই উদ্যোগটির মূল চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট—গ্রাম সরকার কি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিষ্ঠান হবে, নাকি স্থানীয় রাজনীতির নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হবে?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সদস্য নির্বাচনের স্বচ্ছতা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, যুবসমাজ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে। ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের প্রক্রিয়াটি যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা অর্থের প্রভাব যাতে সদস্য নির্বাচনে নির্ধারক হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অর্থায়ন। খসড়ায় গ্রাম সরকারের পৃথক তহবিলের কথা বলা হলেও ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব আয়ের কত অংশ এতে বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা সুনির্দিষ্ট নয়। অর্থের উৎস ও বরাদ্দের পরিমাণ নির্ধারিত না থাকলে দায়িত্ব পালন কঠিন হবে। প্রতিটি ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। গ্রাম সরকার সামাজিক সচেতনতা ও অপরাধ প্রতিরোধে সহযোগিতা করতে পারে; কিন্তু এটি কোনোভাবেই পুলিশের বিকল্প কিংবা স্থানীয় সালিশের নামে বিচারিক কর্তৃত্ব প্রয়োগের প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। নারী, শিশু, সংখ্যালঘু ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষায় আইনের সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মূল দর্শন হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা পৌঁছে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। গ্রাম সরকার গঠন করতে হলে সেই দর্শনকে সামনে রাখতে হবে। প্রয়োজন সদস্যদের প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট বাজেট, প্রশাসনিক সহায়তা, কার্যকর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ।
সরকার জনমত চেয়েছে—এটি ইতিবাচক। তবে জনমত গ্রহণ যেন কেবল আইন প্রণয়নের আনুষ্ঠানিকতা না হয়। বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ গ্রামবাসীর মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, গ্রাম সরকার গঠনের সাফল্য ১৭ সদস্যের কমিটি তৈরির মধ্যে নয়; সাফল্য নির্ভর করবে গ্রামের সাধারণ মানুষ কতটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পেলেন, কতটা উন্নয়ন ও সুশাসনের সুফল পেলেন তার ওপর। নতুন প্রতিষ্ঠান নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান। ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। গ্রাম সরকার যদি জনগণের অধিকার, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির প্রতিষ্ঠান হতে পারে, তবেই তা হবে সময়োপযোগী উদ্যোগ। অন্যথায় এটি স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় আরেকটি স্তর, আরেকটি ব্যয় এবং নতুন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হয়েই থেকে যাবে।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।