খাদ্যে ভেজাল: মুনাফার লোভে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০১ পিএম
খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান। অথচ সেই খাবারই যদি মানুষের শরীরে রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা ও বাজারব্যবস্থার নৈতিকতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে। বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলমূল, শাকসবজি, মাছ-মাংস, মসলা ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগও কমছে না। ফলে প্রতিদিনের খাবার কিনতে গিয়েও সাধারণ মানুষকে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে।
খাদ্যে ভেজাল মানে শুধু নিম্নমানের উপাদান মেশানো নয়। অননুমোদিত রাসায়নিক ও ক্ষতিকর রং ব্যবহার, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতুর দূষণ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত করাও বড় ঝুঁকি। দূষণের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী এসব উপাদান মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। বাড়তে পারে খাদ্যবাহিত রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অসুস্থ মানুষের জন্য এ ঝুঁকি আরও উদ্বেগজনক।
আইন আছে, কার্যকর প্রয়োগ কোথায়?
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫-সহ বিভিন্ন আইন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাজার তদারকি ও অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও পালন করছে। তবু একই ধরনের অনিয়ম বারবার সামনে আসা প্রশ্ন তৈরি করে—বিদ্যমান আইন ও অভিযান কেন স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে পারছে না?
শুধু জরিমানা করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নিয়মিত তদারকি, নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি এবং অভিযানের পরবর্তী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
পরীক্ষাগার ও তদারকি বাড়ানো জরুরি
খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা অপরিহার্য। কিন্তু পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার, দক্ষ জনবল ও নিয়মিত নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা না থাকলে কার্যকর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে।
এ জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন, বিদ্যমান ল্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করতে হবে। কোন খাদ্যের কতটি নমুনা পরীক্ষা করা হলো, কী ফল পাওয়া গেল এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে জনসচেতনতা ও কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি বাড়বে।
একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
উৎপাদন থেকে বিক্রি—নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক প্রতিটি ধাপে
খাদ্যনিরাপত্তা শুধু বাজারে পণ্য পরীক্ষা করার বিষয় নয়। কৃষিজমিতে অনুমোদিত কীটনাশকের ব্যবহার, ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত অপেক্ষাকাল অনুসরণ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবহন এবং উপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান ও রাস্তার পাশের খাবারের বিক্রয়কেন্দ্রেও স্বাস্থ্যবিধি মানা নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ এবং পণ্যের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নিয়মিত পরিদর্শন ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি চালু রাখতে হবে।
ভোক্তার সচেতনতা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি
খাবার কেনার সময় মেয়াদ, মোড়ক, সংরক্ষণের অবস্থা ও বিক্রয়স্থলের পরিচ্ছন্নতা যাচাই করা ভোক্তার জন্য জরুরি। ফলমূল ও শাকসবজি নিরাপদ প্রবাহমান পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু ধোয়া বা রান্না করলেই সব রাসায়নিক দূষণ দূর হয় না। অনেক ক্ষতিকর উপাদান চোখে দেখে, গন্ধে কিংবা স্বাদে শনাক্ত করাও সম্ভব নয়।
তাই খাদ্যনিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; আর মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে মুনাফা অর্জন থেকে বিরত থাকা ব্যবসায়ীদের নৈতিক ও আইনগত কর্তব্য।
খাদ্যে ভেজালের প্রভাব শুধু অসুস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসাব্যয় বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধার মতো পরিণতি পরিবার ও রাষ্ট্র—উভয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা উন্নয়ন ও জনকল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন উৎপাদিত খাদ্যকে নিরাপদ ও পুষ্টিকর হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এ জন্য চাই কার্যকর আইন প্রয়োগ, আধুনিক পরীক্ষাগার, সমন্বিত তদারকি এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
মানুষ খাবার কেনে বেঁচে থাকার জন্য, অসুস্থ হওয়ার জন্য নয়। নিরাপদ খাদ্য কোনো বিশেষ সুবিধা নয়—এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে লোকদেখানো অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ও কার্যকর পদক্ষেপ।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।