শ্রীপুরে ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দশমী মাঠে অর্ধশতাধিক প্রতিমার মিলনমেলা
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১২ পিএম
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি:
গাজীপুরের শ্রীপুরে ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দশমী মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের বর্ণিল প্রতিমা উৎসব। বিজয়া দশমী উপলক্ষে উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের কাচারি মাঠে বিভিন্ন মন্দির থেকে নিয়ে আসা অর্ধশতাধিক প্রতিমা একসঙ্গে প্রদর্শন করা হয়। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, কাঁসরঘণ্টা আর ভক্তদের উচ্ছ্বাসে পুরো মাঠ পরিণত হয় উৎসবের মিলনমেলায়।
বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুর থেকেই আশপাশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে একে একে প্রতিমা নিয়ে আসতে থাকেন পূজারি ও ভক্তরা। পরে মাঠজুড়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয় প্রতিমাগুলো। বাহারি রং, নান্দনিক সাজসজ্জা ও প্রতিমার বৈচিত্র্যে উৎসবস্থলে সৃষ্টি হয় মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন দেখতে দূরদূরান্ত থেকে আসেন দর্শনার্থীরা।
বিকেলে শুরু হয় প্রতিমার সৌন্দর্য ও সাজসজ্জা নিয়ে প্রতিযোগিতা। বিচারকদের মূল্যায়নে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমাকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী মণ্ডপ কমিটিগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়। এ সময় পূজারি ও ভক্তদের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
প্রতিযোগিতা ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা উৎসবের সমাপ্তিতে একে একে প্রতিমাগুলো পাশের পারুলী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের মতে, এই আয়োজন কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি শ্রীপুরের বহু প্রজন্মের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য প্রতিবছর নতুন করে মিলিত করে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের মানুষকে।
প্রতিমা উৎসবের ঐতিহ্য তুলে ধরে পূজারি রথীন্দ্র ঠাকুর বলেন, আশপাশের বিভিন্ন মন্দিরের প্রতিমা এক জায়গায় এনে এমন আয়োজনের কথা তাঁর জানা নেই। পূর্বপুরুষদের হাত ধরে প্রায় ৩০০ বছর আগে শুরু হওয়া এই উৎসব এখনো তাঁরা ধরে রেখেছেন। ভবিষ্যতেও এই ঐতিহ্য অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা তাঁর।
তিনি আরও বলেন, মাঠে সারিবদ্ধভাবে প্রতিমা সাজানো হয়। ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রতিমার সৌন্দর্য ও সাজসজ্জা বিচার করে বিজয়ী নির্বাচন করেন। প্রতিযোগিতাকে ঘিরেও পূজারি ও ভক্তদের মধ্যে আনন্দ-উৎসাহের সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, শ্রীপুরের দশমী মাঠে প্রায় ৩০০ বছর ধরে প্রতিমা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, যা তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালন করে আসছেন। একইভাবে দেশপ্রেম, ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্প্রীতির চর্চাও অব্যাহত রাখতে হবে।তিনি বলেন, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। ধর্মের কারণে মানুষের মধ্যে কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। প্রত্যেকেই যেন স্বাধীনভাবে ও নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন, সেটিই বিএনপির বিশ্বাস।
সংসদ সদস্য আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সারাদেশে নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শ্রীপুর পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি বাবু অরুণ চন্দ্র দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব খাইরুল কবির মণ্ডল আজাদ, শ্রীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহফুল হাসান হান্নান, রাজাবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক নাজমুল হুদা শাহীন, পূজা উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক অর্জুন কুমার মণ্ডলসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, পূজারি ও ভক্তরা।
তিন শতাব্দীর ঐতিহ্যকে ধারণ করে শ্রীপুরের দশমী মাঠে অনুষ্ঠিত এই প্রতিমা উৎসব আবারও ধর্মীয় অনুভূতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।