সাধারণ ঘরেই অসাধারণ গবেষণা, ২৫ জাতের ধান উদ্ভাবক সেন্টু হাজং
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম
তৌহিদুর রহমান, শেরপুর:
আধুনিক গবেষণাগার কিংবা উন্নত প্রযুক্তির কোনো সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষক সেন্টু চন্দ্র হাজং (৫৫)। নিজের মাত্র ১২ কাঠা জমিকে গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ ২১ বছরের প্রচেষ্টায় তিনি উদ্ভাবন করেছেন ২৫ জাতের নতুন ধান। তাঁর এই উদ্যোগে উপকৃত হচ্ছেন এলাকার শত শত কৃষক। বাড়ছে উদ্ভাবিত ধানের চাহিদাও।
নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু হাজংয়ের বেড়ে ওঠা কৃষক পরিবারে। এসএসসি পাস করার পর আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর পড়াশোনা আর এগোয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেমে গেলেও কৃষি নিয়ে নতুন কিছু করার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি তিনি। সেই আগ্রহ থেকেই ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত তিনি ।প্রত্যন্ত গ্রামের একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসেই চলছে তাঁর গবেষণার কাজ।
নেই নিজস্ব কোনো গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা। সীমিত সামর্থ্য আর নিজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই বছরের পর বছর ধরে ধানের নতুন জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ইতোমধ্যে ২৫টি নতুন জাত উদ্ভাবন করলেও এখানেই থেমে থাকতে চান না সেন্টু হাজং। নতুন জাত তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন তিনি। তাঁর দাবি, আরও দুই শতাধিক জাত উদ্ভাবনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এসব জাতের ধান চাষ করে স্থানীয় অনেক কৃষক লাভবান হচ্ছেন। কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ায় বাজারেও তাঁর উদ্ভাবিত ধানের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।সেন্টু হাজংয়ের দীর্ঘদিনের গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্থানীয় কৃষি বিভাগও অবগত। তবে এত বছরের পরিশ্রম ও সাফল্যের পরও এখন পর্যন্ত তাঁর ভাগ্যে জোটেনি কোনো জাতীয় স্বীকৃতি। সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে একজন প্রান্তিক কৃষকের এই প্রচেষ্টা যেমন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরছে, তেমনি তাঁর গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও স্বীকৃতির বিষয়টিও সামনে আনছে।
সেন্টু হাজংয়ের উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলোর মধ্যে ‘সেন্টু শাইল’, তিন ধরনের সেন্টু পাইজাম, তিন ধরনের চিনি শাইল ও তুলশিমালা উল্লেখযোগ্য। তাঁর উদ্ভাবিত জাতগুলো সেন্টু-১ থেকে সেন্টু-২৫ পর্যন্ত নামকরণ করা হয়েছে। প্রথম সফল জাত ‘সেন্টু শাইল’ উদ্ভাবন করতেই তাঁকে টানা সাত বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই সাফল্য তাঁকে নতুন জাত তৈরির কাজে আরও উৎসাহিত করে।
ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরীক্ষা ও পরিশ্রম। জানা গেছে, ২০০৫ সালে স্থানীয় একটি এনজিও থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এ কাজে হাত দেন সেন্টু হাজং। ধানের দুটি ভিন্ন জাতের মধ্যে সংকরায়ণ বা ব্রিডিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে নতুন জাত তৈরির চেষ্টা করেন তিনি। একটি জাত উদ্ভাবনের পর সেটির উপযোগিতা যাচাই করতেই তাঁর প্রায় সাত বছর সময় লেগেছে। গবেষণার জন্য নিজের ১২ কাঠা জমিতে ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট তৈরি করেছেন এই কৃষক। বছরের বিভিন্ন সময় সেখানে বিভিন্ন জাতের ধান নিয়ে পরীক্ষা চালান তিনি।
কোনো উদ্যোগ ব্যর্থ হলে থেমে না গিয়ে নতুন করে পরীক্ষা শুরু করেন। এভাবেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে একের পর এক ধানের জাত উদ্ভাবনে সাফল্য পেয়েছেন সেন্টু। তাঁর উদ্ভাবিত ধানের প্রতি স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহও রয়েছে। বিশেষ করে ‘সেন্টু শাইল’ জাতটি চাষিদের কাছে ভালো চাহিদা তৈরি করেছে। প্রথম উদ্ভাবনের পর থেকেই নিজের নামে ধানের জাতগুলো পরিচিতি পেয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আরও নতুন জাত তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে গেলেও সেন্টু হাজং এখনো সরকারি প্রণোদনা বা বিশেষ কোনো সহায়তা পাননি। তাঁর কাজের বিষয়ে স্থানীয় কৃষি বিভাগ অবগত থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাঁর এই গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা দেশি ধান সংরক্ষণেও সময় দিচ্ছেন সেন্টু হাজং। তাঁর ১২ কাঠা জমিতে প্রতিবছর বিভিন্ন স্থানীয় জাতের ধান পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে বগি, হালই, গোলাপী, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল ও খাসিয়াবিন্নিসহ নানা জাতের দেশি ধান। বর্তমানে ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নিসহ আরও কয়েকটি জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন তিনি। এসব ধান চাষে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবর ও নিজের তৈরি কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেন সেন্টু।
দেশি ধানের জাতগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সেন্টু হাজং বলেন, অনেক স্থানীয় জাতের ধান এখন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। অথচ প্রতিটি জাতেরই রয়েছে নিজস্ব স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য। কিছু জাতের ধানে পোকামাকড়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হয়। এসব বিবেচনায় তিনি পুরোনো দেশি ধানের জাত টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুন জাত উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের গবেষণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে এই কৃষক জানান, এখনো তাঁর কোনো নিজস্ব গবেষণাগার নেই। জরাজীর্ণ ঘরে বসেই তাঁকে ধানের জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হচ্ছে।
দীর্ঘদিন কাজ করেও পাননি সরকারি স্বীকৃতি। তাঁর মতে, সরকারিভাবে একটি গবেষণাগার নির্মাণ করে দেওয়া হলে দেশি ধানের আরও অনেক জাত সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজও আরও বিস্তৃত করা যাবে। সেন্টু হাজং বলেন, দেশি ধানের বৈচিত্র্য ধরে রাখা এবং নতুন জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। এ কাজে সরকারি সহযোগিতা পেলে তাঁর গবেষণার পরিধি বাড়বে এবং হারিয়ে যেতে বসা ধানের জাতগুলো ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা সহজ হবে।