সিকিউরিটি চেক দিয়ে ‘মামলা-বাণিজ্য’ ও নদী দখলের রাজত্ব: আল মোস্তফা গ্রুপের এমডি'র বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৭ এএম
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনাঘাট এলাকায় অবস্থিত আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক সিকিউরিটি চেক অপব্যবহার করে একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রভাব খাটানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসায়িক সংকট আড়াল করতে পাওনা আদায়ের নামে একটি সংঘবদ্ধ ‘মামলা-বাণিজ্য’ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কোম্পানি।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের সুনির্দিষ্ট আর্থিক হিসাব নিষ্পত্তি না করেই জামানত হিসেবে রাখা সিকিউরিটি চেক ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা করা হচ্ছে। একই চেকের বিপরীতে একাধিক মামলা দায়ের, কথিত মিথ্যা জিআর মামলা এবং সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, সিআইডি ও ডিবি পুলিশের নাম ভাঙিয়ে গ্রেপ্তার ও নানা ধরনের হয়রানির হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে। হক ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় ৪২০, ৪০৬ ও ৫০৬ ধারায় দায়ের করা মামলাটিকেও সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দাবি, মামলায় যে ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, সেই দিন সংশ্লিষ্ট এমডি দেশেই উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি আল মোস্তফা অফিসের এক পিয়নকে বাদী বানিয়ে ওই মিথ্যা মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
মামলা-বাণিজ্যের পাশাপাশি মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে নদী ভরাট, জবরদখল ও অবৈধ কারখানা নির্মাণের পাহাড়সমান অভিযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোনারগাঁওয়ের বৈদ্যারবাজার এলাকার সাতভাইয়াপাড়া ও চর লাউয়াদী মৌজায় ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি না কিনে এবং নদীর তীরবর্তী সরকারি খাস জমি ও চলাচলের হালট জবরদখল করে গত এক সপ্তাহ ধরে অবৈধভাবে বালু ভরাট করে আসছে তারা।

স্থানীয় জমির মালিক হাজী আজিজুল্লাহ জানান, ৭টি দাগে প্রায় ১ একর ১০ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে তাঁর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের স্ত্রী সুরাইয়া করিম মুন্নীর বিরোধ চলছে এবং আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই বিচারাধীন ও নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জমিটার মালিক দাবি করে সুরাইয়া সেটি হেরিটেজ পলিমার অ্যান্ড সেমি টিউবস লিমিটেডের এমডি মোস্তফা কামালের কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ডা. আব্দুর রউফকে সঙ্গে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে আদালতের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জোরপূর্বক বালু ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন মোস্তফা কামাল। এ বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিলেও রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে স্থানীয় দোকানদার সাব্বির আহমেদ জানান, প্রভাবশালী চেয়ারম্যান ও তার লোকজন দোকানপাট ভেঙে জায়গা খালি করে দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছে। দোকান ভেঙে দিলে পরিবার নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী মহল নদী ও খাস জমি দখল করে আসলেও আল মোস্তফা গ্রুপ সরাসরি সাধারণ মানুষের বসতভিটা ও খামারে হাত দেওয়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন এলাকাবাসী।

ব্যবসায়ী মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি—প্রকৃত পাওনা নির্ধারণে নিরপেক্ষ লেজার যাচাই, একই চেকের বিপরীতে দায়ের করা মামলাগুলোর আইনগত পর্যালোচনা এবং কথিত মামলা-বাণিজ্য ও ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।