রাত পোহালেই ছেঁউড়িয়ায় লালন স্মরণোৎসব, নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রস্তুতি।
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
তানভীর আজাদ ,কুষ্টিয়া প্রতিনিধি |
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় আধ্যাত্মিক সাধক ও বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে শনিবার (১৭ অক্টোবর) থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। উৎসবকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, বাউল, ফকির, ভক্ত ও দর্শনার্থীরা লালন আখড়াবাড়িতে সমবেত হতে শুরু করেছেন। সম্ভাব্য বিপুল জনসমাগম ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে লালন একাডেমি আয়োজিত এ স্মরণোৎসব চলবে সোমবার (১৯ অক্টোবর) পর্যন্ত। ছেঁউড়িয়ার লালন মাজার প্রাঙ্গণ ও মুক্তমঞ্চ ঘিরে আয়োজিত এ উৎসবকে কেন্দ্র করে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
সাধু-ভক্তদের নির্ধারিত রীতিনীতি অনুযায়ী শনিবার সন্ধ্যায় বাল্যসেবা, রোববার সকালে রাখালসেবা এবং সোমবার দুপুরে পুণ্যসেবা অনুষ্ঠিত হবে। সাধু-ভক্তদের বিশ্বাস, এই তিথিতেই ফকির লালন শাহ দেহত্যাগ করেছিলেন। দিনটি তাঁদের কাছে শোক ও স্মরণের হলেও সাধুসঙ্গ, ভাববিনিময় ও তত্ত্বালোচনার মধ্য দিয়ে তাঁরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন মানবতাবাদী এই সাধককে।
স্মরণোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় লালন মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে লালনের জীবন, দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তাধারা নিয়ে আলোচনা সভা। আলোচনা শেষে দেশবরেণ্য ও স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় পরিবেশিত হবে লালনসংগীত। পাশাপাশি মাজারসংলগ্ন এলাকায় বসবে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ লালন মেলা।
স্মরণোৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের পেশাদার আচরণ বজায় রাখতে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকাল ১০টায় কুষ্টিয়ার মোহিনী মোহন আদর্শ ডিগ্রি কলেজ মাঠে ব্রিফিং প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের দিকনির্দেশনা দেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও বিনয়ী আচরণের মাধ্যমে অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেন।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছেঁউড়িয়া ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে চেকপোস্ট, পিকেট ডিউটি, মোবাইল টহল এবং পায়ে হেঁটে টহলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উৎসবস্থলের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কন্ট্রোল রুম এবং সিসিটিভি মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নদীপথের নিরাপত্তায় স্পিডবোট, গুরুত্বপূর্ণ স্থান পর্যবেক্ষণে ওয়াচ টাওয়ার, প্রবেশপথে আর্চওয়ে গেট এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাদা পোশাকের পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ দল দায়িত্ব পালন করবে। দর্শনার্থীদের সহায়তায় স্থাপন করা হবে ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ বুথ।
ব্রিফিং প্যারেডে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শিকদার মো. হাসান ইমাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার সরকার, সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ মাহমুদুল হক মজুমদারসহ জেলা পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় কুমারখালী থানা, গোয়েন্দা পুলিশ, সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি তোহিদ বিন-হাসান জানিয়েছেন, স্মরণোৎসব ও মেলায় আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উৎসবস্থলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করবেন।
লালন শাহের মানবতাবাদী দর্শন, সাম্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মরমি সংগীতের টানে প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় সমবেত হন দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী। এবারও স্মরণোৎসব ঘিরে ব্যাপক জনসমাগমের প্রত্যাশা করছেন আয়োজকেরা।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে এবারের লালন স্মরণোৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।