বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ‘বোদ্ধাপরাধ’: প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৫ এএম

 গোটা পৃথিবীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞান চর্চা, জ্ঞান উৎপাদন এবং জনকল্যাণমুখী বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের আঁতুড়ঘর বলে পরিগণিত করা হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও কথাটা কিছুটা সত্য। “কিছুটা” লিখলাম, এ কারণে যে বেশকিছু বিষয় এখানে সামগ্রিকভাবে গোটা প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে থাকে।

স্বাভাবিকভাবে, বিভিন্ন শ্রেণির অংশীজনদের সম্মিলিত কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বাঙ্গীণ অগ্রযাত্রা নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশ হোক কিংবা বহির্বিশ্ব; সবখানেই নানা মত ও পথের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর বহুবিধ কার্যক্রমকে এগিয়ে নেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক পঠনপাঠনই সব নয়। এখানে সকলের উচিত নিজের স্বতন্ত্র ধ্যান-ধারণার বিকাশ ঘটানো। নিজের জ্ঞানকে কোনো একটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজেকে সর্বজনীন করে তোলা। তবে, অবশ্যই এই প্রক্রিয়াটি হতে হবে গঠনমূলক, জনকল্যাণমূলক এবং ন্যায্যতাকেন্দ্রিক বিষয়াদির ওপর জোর দিয়ে। দেশ, সমাজ ও বিশ্বের ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

আর এখানেই বেশকিছু “যদি, কিন্তু”-র উপস্থিতি ঠাহর করা যায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কারণ, তথাকথিত প্রগতিশীল শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা প্রগতির নামে সারাক্ষণই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বুলি আওড়ালেও — যখনই কারো কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম তাদের ব্যক্তিস্বার্থ এবং স্ব স্ব মতাদর্শের পরিপন্থী বলে প্রতীয়মান হয়, তখনই তারা সেসবের ঘোর বিরোধিতায় লিপ্ত হন। অথচ, তারাই নিজ নিজ ক্যাম্পাসে নিজেদের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিস্বাধীনতার ভ্যানগার্ড হিসেবে জাহির করে থাকেন নির্লজ্জভাবে! ব্যাপারটা ঠিক এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, “তুমি অধম, তাই বলে আমি উত্তম হবো না কেন?”

এবার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মৌলিক অনুষঙ্গের দিকে আলো ফেলা যাক। অনলাইন বাংলা অভিধান ‘যথার্থ আধুনিক বাংলা অভিধান’-এ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য শব্দটিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলা হয়েছে: ব্যক্তির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও সত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের বিকাশ সাধনই হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। দার্শনিক ও চিন্তাবিদরা এই বিষয়টিকে প্রায়শই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বলেও আখ্যা দিয়ে থাকেন। বৃহত্তর অর্থে, এটি হলো এমন এক নৈতিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন, আদর্শ কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি — যেখানে ব্যক্তির নৈতিক মূল্যবোধকে বেশি জোর দেওয়া হয় নিজের সর্বজনীন বিকাশের ধারাকে অক্ষুণ্ন রাখার তাগিদে। ব্যাপারটির সঙ্গে তাই স্বভাবসুলভভাবেই ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল আঙ্গিকগুলোও বিবেচনায় নেওয়া যায়।

কিন্তু, আফসোসের বিষয় হলো বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সুশীল সমাজের বেশকিছু প্রতিনিধি মুখোশধারী ভণ্ডদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ আর ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসারে যতটা উচ্চস্বরে ফাঁকা বুলি আওড়ান, ঠিক ততটাই প্রবল হয়ে তারা বিরোধী মতের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াতে অপতৎপরতা চালান। কাকতালীয়ভাবে, তারাই আবার বিভিন্ন সভা-সেমিনারে গিয়ে সুনিপুণ বাগ্মিতায় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা আর আত্মোন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের সবক দেন। অথচ, নৈতিকভাবে দৃঢ়চেতা বোদ্ধারা যখন তাদের এসব ভণ্ডামির আড়ালে থাকা দ্বিচারিতার দিকটির প্রতি আলোকপাত করেন কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে গঠনমূলকভাবে বিষয়টির সমালোচনা করেন, তখন ওই বুর্জোয়া আধিপত্যবাদী শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সেই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে “অপরাধ” হিসেবে চিহ্নিত করেন! এই প্রসঙ্গটিকেই আমি সংশ্লিষ্ট বোদ্ধাদের “বোদ্ধাপরাধ” (বোদ্ধা + অপরাধ/ বুদ্ধিবৃত্তি + অপরাধ) বলে উপস্থাপন করতে চাই। তবে, এটিকে অবশ্য নেতিবাচক কিছু ভাবার কোনো সুযোগ নেই।

কেননা, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন কিছু শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এখনও আছেন — যারা ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে বিস্তৃত নোংরা শিক্ষক, কর্মকর্তা আর অফিস পলিটিক্সের বেড়াজাল ছিন্ন করে আধিপত্যবাদী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকেন দৃঢ়ভাবে। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা আর অন্যায়ের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ার কারণেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এখনও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তাই শ্রেণিকক্ষ, সভা-সেমিনার কিংবা আলাপ-আড্ডাতে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসারে খুব বেশি “স্ফীত বাণী” প্রচার না করলেও, তাঁরা নির্মোহভাবে বিষয়টির প্রতি প্রচণ্ড রকমের শ্রদ্ধাশীল।

কিন্তু, এই শ্রেণির মানুষরা প্রায়শই পূর্বোক্ত শ্রেণির কপট ব্যক্তিদের দ্বারা নানা মহলে হেনস্তার শিকার হন। কারণ উক্ত গোষ্ঠী মুখে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বুলি জারি রাখলেও অন্তর থেকে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলে যেন তাঁদের আদর্শের কাছে পদানত থাকে। সকলে যেন স্রেফ তাদেরই গুণগান গায়। এর সুবিধা মূলত দুটি। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম রেখে অবৈধভাবে পদোন্নতি, পদায়ন, শিক্ষাছুটি লাভ কিংবা প্রশাসনিক নানা ইস্যুতে অনৈতিক অফিস পলিটিক্সের ফায়দা লোটা। দ্বিতীয়ত, দ্বিচারিতার মাধ্যমে বিরোধী মতের মানুষদের ব্যক্তি স্বাধীনতায় নগ্ন ও ঘৃণ্য হস্তক্ষেপ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নিজেদের “আমরাই মহান” ইমেজ গড়ে তোলা! এমনকি অন্যের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সংশ্লিষ্ট রীতিনীতি অনুসরণের প্রবণতার প্রতিও বিন্দুমাত্র সহনশীল নন এসব শ্রেণির মানুষেরা। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থীর নেকাব পরিধান নিয়ে কটূক্তি করে তাসনিম সিরাজ মাহবুব নামের এক শিক্ষকের শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম হতে অব্যাহতি পাওয়ার ঘটনা সেটিরই এক ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

উক্ত শিক্ষক স্রেফ নেকাব পরার কারণে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে “মৌলবাদী” বলে আখ্যা দিয়েছেন, তাঁর পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তিনি নিয়মিত ক্লাসে একাডেমিক পরিসরের বাইরে গিয়ে নিজের আদর্শের কথা অপ্রাসঙ্গিকভাবে উত্থাপন করেন এবং অন্যদের ওপর তা চাপিয়ে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রগতিশীল একটি প্রতিষ্ঠানে যখন কেউ এমন মানসিকতা লালন করেন, তখন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতিও খানিকটা আমাদের চোখে ধরা দেয়।

আশঙ্কা অবশ্য এখনও ফুরায়নি। শ্রেণি পাঠদান থেকে অব্যাহতি পেলেও পরীক্ষার খাতা কিংবা অন্যান্য কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের মূল্যায়নে তাসনিমের মতো শিক্ষকরা দায়িত্বে থাকলে, তাঁরা যে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বা তাঁর প্রতিবাদী সহপাঠীদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠবেন না — তেমন কোনো গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবেন না।

আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই মতো করে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এ ধরনের নীচ মানসিকতার মানুষের অভাব নেই। বিভাগটির শিক্ষার্থীরা মেরুদণ্ড সোজা রেখে ঘটনাটির প্রতিবাদ না করলে, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত না হলে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের চেতনার প্রতি অপেক্ষামূলকভাবে সহানুভূতিশীল না হলে — উক্ত শিক্ষকও এমন কোনো শাস্তির সম্মুখীন হতেন না, এটা বলাই বাহুল্য!

আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উন্মুক্ত জ্ঞান চর্চা ও সৃজনশীল জ্ঞান উৎপাদনের পুণ্যভূমি। এখানে তাই অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে সকল শ্রেণি, বর্ণ ও ধর্মের মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ঘৃণ্য স্বার্থান্বেষী, লোভী, অসাধু, দুর্নীতিপরায়ণ ও নৈতিকভাবে অধঃপতিত সব মহলের ভয়াল থাবা থেকে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করতে হবে। গবেষণা এবং বাস্তবধর্মী শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম বাড়াতে হবে। সঙ্গে গঠনমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলেই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনকল্যাণমুখী জ্ঞান এবং দক্ষ মানবশক্তি উৎপাদনে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস!

[লেখক: রুশাইদ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।]

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com