ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাময়িক অভিযান নয়, চাই বছরব্যাপী কার্যকর উদ্যোগ

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম

একটি মশার কামড়ে যখন একটি পরিবার প্রিয়জনকে হারায়, তখন ডেঙ্গু আর নিছক মৌসুমি রোগ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের কঠিন পরীক্ষা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ তৈরি হয়, বাড়ে মৃত্যুর সংখ্যাও। এরপর শুরু হয় মশার ওষুধ ছিটানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি। কিন্তু পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই এসব উদ্যোগে ভাটা পড়ে। ফলে ফিরে আসে একই সংকট।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১১ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৯৩ জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৩০৩ এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯৯ হাজার ২৭৫। অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৫৮ জন। এসব পরিসংখ্যানের প্রতিটির পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, স্বজন হারানোর বেদনা এবং অপূরণীয় ক্ষতি।

রাজধানীর বাইরে সংক্রমণ, চিকিৎসায় সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি

ডেঙ্গু এখন আর ঢাকা কিংবা বড় শহরকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ অনেক জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসক ও নার্সের সংকট রয়েছে। জটিল রোগীর জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সীমিত সুযোগও চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলছে।

বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অনেকে সাধারণ জ্বর ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। আবার আর্থিক অসচ্ছলতা ও হাসপাতালের দূরত্বও চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ, রোগী পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

ফগিং নয়, গুরুত্ব দিতে হবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বড় দুর্বলতা হলো ধারাবাহিক পরিকল্পনার অভাব। মশার প্রকোপ বাড়লে ওষুধ ছিটানো ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের ঘাটতি থেকেই যায়। অথচ শুধু ফগিং করে এডিস মশার বিস্তার স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন ও ড্রেনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই নিয়মিত লার্ভা জরিপ, প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগ এবং ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নালা-নর্দমা পরিষ্কার এবং নির্মাণাধীন ভবনে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ কারণে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদকে নিজ নিজ এলাকায় বছরব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। অবহেলা ও নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

চিকিৎসার ব্যয় বাড়াচ্ছে পারিবারিক সংকট

ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক বিপর্যয়েরও কারণ। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে বড় অঙ্কের ব্যয় বহন করতে হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, শয্যা ভাড়া ও অন্যান্য চিকিৎসা খরচ মেটাতে অনেককে সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা ঋণ করতে হয়।

তাই সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসাসামগ্রী সহজলভ্য করতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যয় ও সেবার মান তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চিকিৎসার ব্যয়ের ভয়ে কেউ যেন হাসপাতালে যেতে দেরি না করেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

সমন্বিত উদ্যোগ ও নাগরিক সচেতনতা অপরিহার্য

ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগ কিংবা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোন এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে, কোথায় মশার প্রজনন বেশি এবং কোন হাসপাতালে কতটা চিকিৎসাসক্ষমতা রয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরীক্ষা করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পাত্র ও পরিত্যক্ত সামগ্রী সরিয়ে ফেলতে হবে। শিক্ষার্থী, তরুণ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে পাড়াভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম গড়ে তোলা যেতে পারে।

তবে নাগরিক সচেতনতার কথা বলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রয়োজন বছরব্যাপী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাময়িক অভিযান নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। বর্ষা শুরুর আগেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, নিয়মিত জরিপ এবং কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগ শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো, পর্যাপ্ত বাজেট ও জনবল নিশ্চিত করা এবং ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহার তদারক করতে হবে।

প্রতিবছর শত শত মানুষের মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল মশা নিধনের লড়াই নয়; এটি অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠারও লড়াই।

আজ যে পরিবারটি আক্রান্ত স্বজনের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ছুটছে, আগামীকাল যেন আর কোনো পরিবারকে এমন অসহায় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। ডেঙ্গুর মৃত্যুমিছিল থামাতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। কারণ মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে বড় কোনো রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হতে পারে না।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com