শিশুর হাতে স্মার্টফোন: বিনোদন থেকে আসক্তি, দায় এড়াতে পারে না পরিবার
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্মার্টফোন এখন অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু এই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার যখন শিশু-কিশোরদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা আর নিছক ব্যক্তিগত অভ্যাস থাকে না; হয়ে ওঠে পরিবার ও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
একসময় স্কুল কিংবা মাদ্রাসা থেকে ফিরে শিশুরা মাঠে খেলত, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাত, গল্পের বই পড়ত কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিত। এখন অনেক শিশুর অবসর কাটে স্মার্টফোনের পর্দায় চোখ রেখে। অনলাইন গেম, কার্টুন, টিকটক ও বিভিন্ন ভিডিওতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। শুরুতে শিশুকে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় মনে হলেও একপর্যায়ে তা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। ফোন ছাড়া খাওয়াদাওয়া, সময় কাটানো কিংবা স্বাভাবিক আচরণ বজায় রাখাও তখন কঠিন হয়ে পড়ে।
আসক্তির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব
শৈশব মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশপর্ব। এ সময় শিশুর চিন্তাশক্তি, আবেগ, সামাজিক দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। খেলাধুলা, প্রকৃতির সংস্পর্শ, বন্ধুত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে কথোপকথন এই বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা এসব অভিজ্ঞতার সুযোগ সংকুচিত করে দিতে পারে।
দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, চোখের ক্লান্তি ও মেজাজের পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাস্তব জীবনের সম্পর্কেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব ঝুঁকি শিশুর বয়স, ব্যবহারের ধরন, কনটেন্ট এবং পারিবারিক পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন গেমের আকর্ষণ, নতুন ভিডিও দেখার আগ্রহ এবং বারবার আসা নোটিফিকেশন শিশুদের ঘন ঘন ফোনের দিকে ফিরিয়ে নেয়। ফলে পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও পারিবারিক সম্পর্ক উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
দায় এড়াতে পারেন না অভিভাবকেরা
শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় অভিভাবকদেরও ভূমিকা থাকে। শিশুর কান্না থামাতে, খাওয়ানোর সময় কিংবা নিজেদের ব্যস্ততা সামলাতে ফোন দিয়ে রাখেন অনেকেই। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে শিশুকে শান্ত করার এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে তার আচরণ ও দৈনন্দিন রুটিনে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি সন্তানকে সময় দেওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তিকে তার সঙ্গী বানিয়ে দিচ্ছি? সন্তানের মনের কথা শোনা, তার আনন্দ-বেদনা বোঝা কিংবা তার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ কি আমরা নিজেরাই কমিয়ে দিচ্ছি?
বাস্তবতা হলো, অনেক অভিভাবকও দিনের বড় একটি সময় স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকেন। সন্তানকে ফোন কম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে নিজেরা যদি সারাক্ষণ পর্দায় চোখ রাখি, তাহলে সেই নির্দেশ কতটা কার্যকর হবে? শিশুরা উপদেশের চেয়ে বড়দের আচরণ অনুকরণ করে বেশি শেখে। তাই সন্তানের অভ্যাস বদলাতে হলে আগে নিজেদের অভ্যাসের দিকেও নজর দিতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন সচেতন নিয়ন্ত্রণ
শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহার কমাতে শুধু বকাঝকা কিংবা হঠাৎ ফোন কেড়ে নেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবসম্মত নিয়ম, ধৈর্য এবং বিকল্প আনন্দের ব্যবস্থা।
প্রথমত, পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও পারিবারিক সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্মার্টফোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশুদের মাঠে খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা, সাইকেল চালানো ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে। ফোনের বিকল্প হিসেবে আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
তৃতীয়ত, পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিন কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, সন্তানের সঙ্গে কথা বলা এবং তার সমস্যার প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ঘুমের আগে স্মার্টফোন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি শিশুরা অনলাইনে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোনো অনুপযুক্ত কনটেন্ট বা হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে। তবে নজরদারি যেন সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক নষ্ট না করে। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো সমস্যায় পড়লে শিশু নির্ভয়ে মা-বাবাকে জানাতে পারে।
পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব
শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তির দায় শুধু পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলেও চলবে না। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত শিশুদের উপযোগী কনটেন্ট, কার্যকর অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ও অনলাইন নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা। অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল সচেতনতা, অনলাইন নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে হবে।
একই সঙ্গে মাঠ, খেলার জায়গা, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। শিশুরা যেন স্মার্টফোনকেই আনন্দের একমাত্র উৎস মনে না করে, সে জন্য পরিবার ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তবে স্মার্টফোনকে সম্পূর্ণ শত্রু ভাবারও কারণ নেই। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি শিক্ষা, জ্ঞান অর্জন ও সৃজনশীলতার কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। মূল সমস্যা প্রযুক্তি নয়; সমস্যা হলো বয়স ও প্রয়োজন বিবেচনা না করে এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।
সন্তানের স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে বিষয়টি অবহেলা করা যাবে না। প্রয়োজনে শিশু বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নিতে হবে।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের সুস্থ চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতার বিকাশ নিশ্চিত করা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।
সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে—আমরা কি তাকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখাচ্ছি, নাকি অজান্তেই বাস্তব পৃথিবী থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি? শিশুকে শুধু ফোন থেকে দূরে রাখলেই হবে না; তার জীবনে পারিবারিক ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, খেলাধুলা, বই ও সৃজনশীলতার জায়গা বাড়াতে হবে।
শিশুর হাতে স্মার্টফোন থাকতেই পারে, কিন্তু স্মার্টফোন যেন তার শৈশব কেড়ে না নেয়। প্রযুক্তি হোক বিকাশের সহায়ক, আসক্তির শৃঙ্খল নয়—এই হোক পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।