আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ—দুই বিপরীত ঘটনাপ্রবাহে বৈশ্বিক ন্যায়বিচার, রোহিঙ্গা জবাবদিহি এবং বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে নতুন প্রশ্ন।

নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কারের দিনেই আইসিসিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৯ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি সঞ্জয় মজুমদার, ১০ অক্টোবর ২০২৬।

আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। একই দিনে, ৯ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কার্যক্রমকে লক্ষ্য করে নতুন ও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। একই দিনে ঘটে যাওয়া এই দুই ঘটনা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাব এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের জবাবদিহি নিয়ে নতুন বিতর্ক সামনে এনেছে। 

নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারের অগ্রগতিতে অবদানের জন্য নাভি পিল্লাইকে এ বছরের শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ বিচারিক কর্মজীবনে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধের দায় নির্ধারণ ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন।

অন্যদিকে, এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য আইসিসির আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সীমিত করা। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ আদালতের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর বড় রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশ, প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিক্রিয়া এবং আদালতের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সক্ষমতার ওপর। 

আইসিসি একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত। এর এখতিয়ারভুক্ত গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার পরিচালনা করা এর দায়িত্ব। তবে আদালতের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী নেই; গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা এবং অভিযুক্তদের আদালতে হাজির করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আদালতের কার্যক্রম শুধু বিচারকদের সিদ্ধান্তের ওপর নয়, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে। 

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) মূলত রাষ্ট্রের মধ্যে আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি করে, আর আইসিসি ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করে। দুটি আদালতের দায়িত্ব ও এখতিয়ার এক নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে—কোনো রাষ্ট্র নিজের জাতীয় স্বার্থ বা নিরাপত্তার যুক্তিতে আন্তর্জাতিক আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে, অন্য রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। একদিকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন রয়েছে; অন্যদিকে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই বিতর্কের তাৎপর্য সরাসরি রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কথিত অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বিচারিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আইসিসির সরকারি বাংলাদেশ–মিয়ানমার পরিস্থিতি-পৃষ্ঠার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর আদালত সংশ্লিষ্ট অপরাধের তদন্তের অনুমোদন দেয়। পরে, ২৭ নভেম্বর ২০২৪-এ আইসিসির কৌঁসুলি মিয়ানমারের তৎকালীন সামরিক প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন ও নিপীড়নসংক্রান্ত কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করেন। আইসিসির সরকারি পৃষ্ঠায় আবেদনটি প্রাক্‌বিচার চেম্বার–১-এর বিবেচনাধীন হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। 

এখানে গুরুত্বপূর্ণ আইনি সতর্কতা রয়েছে: গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করা আর আদালতের পরোয়ানা জারি করা এক বিষয় নয়। জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা (IIMM) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর আইসিসির বিধিতে এমন পরিবর্তন আনা হয়, যার ফলে এ ধরনের আবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিচারিক সিদ্ধান্ত সাধারণত গোপন বা সিলমোহরযুক্ত রাখা হতে পারে। তাই প্রকাশ্য সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে আবেদনটি বিবেচনাধীন বলা যায়; তবে প্রকাশ্যে নতুন সিদ্ধান্ত না পাওয়া মানেই গোপনে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। 

বাংলাদেশের জন্য কার্যকর জবাবদিহি শুধু আইনি প্রশ্ন নয়। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হলে ভুক্তভোগীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে; আবার আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা বাড়লে জবাবদিহির সম্ভাবনাও জোরদার হতে পারে।

প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো আইসিসির বিচারিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বজায় রাখা। আর্থিক লেনদেন, প্রযুক্তিগত পরিষেবা কিংবা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর বিধিনিষেধ আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট পরিধি, বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। 

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। গুরুতর অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মিত্রতা বা বিরোধিতার ভিত্তিতে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হলে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে, কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত অপরাধপ্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন না করে স্বাধীন তদন্ত, বিচারিক পর্যালোচনা এবং অভিযুক্তের ন্যায্য বিচারের অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। রোহিঙ্গা সংকটের ন্যায়বিচার ও প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান ধরে রাখা ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে কাজের স্বীকৃতি। একই দিনে আইসিসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা এখনো রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের বাইরে নয়। এই দুই ঘটনার তাৎপর্য কেবল প্রতীকী নয়—এগুলো আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা, আদালতের স্বাধীনতা এবং গুরুতর অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন হলো, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কথিত অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার কীভাবে এগোবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেই প্রক্রিয়ায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে শুধু নীতিগত ঘোষণার ওপর নয়, বরং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, বিচারিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব সহযোগিতার ওপর।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com