কি আছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতে?

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: ডিসেম্বরের ঘড়িতে ঢাকা-দিল্লির হিসাব

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন—তাঁর এমন ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘোষণা ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ককেও নিয়ে এসেছে এক নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে। কারণ বিষয়টি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচারপ্রক্রিয়া, রাজনৈতিক বৈধতা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, ভারতের কূটনৈতিক হিসাব এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতি।

শেখ হাসিনা জানেন, দেশে ফিরলে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে। তারপরও তিনি দেশে ফেরার কথা বলছেন। ফলে তাঁর এই ঘোষণা নিছক ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। বরং এটি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবেরও ইঙ্গিত বহন করছে।

তবে রাজনীতির বাস্তবতা মনে রাখা জরুরি—ফেরার ঘোষণা আর প্রত্যাবর্তনের বাস্তবতা এক বিষয় নয়।

 

ডিসেম্বরের ঘোষণা, দিল্লির অপেক্ষা

বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার কথাও বলা হয়নি। অর্থাৎ ঢাকার রাজনৈতিক প্রত্যাশার বিপরীতে দিল্লি এখন সময় নিচ্ছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

ভারতের এই অবস্থান কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অস্বাভাবিক নয়। কারণ শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া বা না দেওয়ার প্রশ্নটি কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বাংলাদেশনীতি, নিরাপত্তা-স্বার্থ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের হিসাবও জড়িত।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগ—বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দিল্লির সামনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন—পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতি ও সমীকরণকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, আর পরিবর্তিত বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে সম্পর্ককে কতটা পুনর্গঠন করা হবে?

রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তরটি হওয়া উচিত পরিষ্কার—রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের সমার্থক হতে পারে না।

 

বিচার হবে আইনের পথে

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো বিচার। তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ও মামলা রয়েছে, সেগুলোর বিচার হতে হবে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, প্রমাণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিচার যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতীক হয়ে না ওঠে—এটি নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত।

কারণ শেখ হাসিনার মতো দীর্ঘদিনের একজন রাষ্ট্রনায়কের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে না; আন্তর্জাতিক মহলও এর দিকে তাকিয়ে থাকবে। ফলে বিচার যত বেশি স্বচ্ছ, প্রমাণনির্ভর ও আইনি মানদণ্ডসম্মত হবে, তার গ্রহণযোগ্যতাও তত বেশি হবে।

একইভাবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আবেগের পরিবর্তে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। কোনো রাজনৈতিক দলকে মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি কেবল নিষেধাজ্ঞা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; বরং জনগণের কাছে সেই দলের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা নিশ্চিত করাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথ।

 

শেখ হাসিনা ফিরলে কী হবে?

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয়তার চেষ্টা দেখা দিতে পারে এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, যদি তাঁর প্রত্যাবর্তন দীর্ঘায়িত হয় কিংবা প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি আরও দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তায় থাকে, তাহলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অবিশ্বাস আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অতএব দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন সংযম, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বাস্তববাদ। কোনো পক্ষের আবেগ যেন রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপর প্রাধান্য না পায়—এটাই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।

 

দিল্লির জন্যও নতুন বাস্তবতা

ভারতের জন্যও বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমীকরণের মধ্যে আটকে রাখা দীর্ঘমেয়াদে দিল্লির জন্যও সুবিধাজনক হবে না।

বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। এখানে সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমতা, সার্বভৌমত্ব এবং অভিন্ন স্বার্থ।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাই নতুন করে আস্থা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। সীমান্তে প্রাণহানি, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদীর পানির হিস্যা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা—এসব বিষয়ে পারস্পরিক আস্থা ও সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

 

ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থই হোক ভিত্তি

বাংলাদেশের গুরুত্ব এখন আর কেবল ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, আঞ্চলিক যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত মানচিত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ভারত যেমন বাংলাদেশকে উপেক্ষা করে তার আঞ্চলিক কৌশল বাস্তবায়ন করতে পারবে না, তেমনি বাংলাদেশও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অস্বীকার করে নিজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারবে না। প্রতিবেশীকে এড়িয়ে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তববাদী সম্পর্ক গড়ে তোলাই বাংলাদেশের জন্য অধিক কার্যকর পথ।

এখানেই শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ঘোষণা একটি বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

তিনি দেশে ফিরুন কিংবা না ফিরুন—এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। কিন্তু তাঁর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

আসল প্রশ্ন তাই শুধু—শেখ হাসিনা কবে ফিরবেন?

এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—ঢাকা ও দিল্লি কি এই সংকটকে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের বাইরে নিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একটি নতুন কাঠামোতে পৌঁছাতে পারবে?

বাংলাদেশের জন্য পথটি হওয়া উচিত স্পষ্ট—বিচার হবে আইনের পথে, রাজনীতি হবে জনগণের রায়ে এবং পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।

ভারতের জন্যও বার্তাটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়—বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক টেকসই করা সম্ভব নয়।

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা ফিরুন কিংবা না ফিরুন, একটি বিষয় ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের পুরোনো অধ্যায় আর আগের জায়গায় নেই। সামনে প্রয়োজন এমন একটি নতুন অধ্যায়, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর সম্পর্কের ভিত্তি নির্ভর করবে না; বরং সার্বভৌমত্ব, সমতা, পারস্পরিক স্বার্থ, জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই হবে দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ব্যক্তির রাজনৈতিক উপস্থিতি দিয়ে নয়, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা দিয়েই একটি সময়কে মূল্যায়ন করে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে—বাংলাদেশ ও ভারত সেই অধ্যায় থেকে ভবিষ্যতের জন্য কী শিক্ষা নেয়।

- লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com