বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার নেতৃত্ব—নাভি পিল্লাইয়ের স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনল।

নাভি পিল্লাইয়ের হাতে নোবেল শান্তি পুরস্কার: যুদ্ধাপরাধের বিচার ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে বিশ্বকে বার্তা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

বিশেষ প্রতিনিধি সঞ্জয় মজুমদার, ৯ অক্টোবর ২০২৬।

দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী ও সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি তাঁর নাম ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করা, মানবাধিকার রক্ষা এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের পক্ষে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। 

১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্ম নেওয়া নাভি পিল্লাই বর্ণবৈষম্যের সময় থেকেই আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন। তিনি বর্ণবৈষম্যবিরোধী কর্মীদের আইনি সহায়তা দেন এবং পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি দেশটির হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে কাজ করেন। এসব দায়িত্বে তাঁর কাজের কেন্দ্রে ছিল মানবাধিকারের সুরক্ষা, অপরাধের বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। 

নাভি পিল্লাইকে পুরস্কৃত করার মধ্য দিয়ে নোবেল কমিটি এমন একটি বিষয় সামনে এনেছে, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত চলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালত, তদন্ত কমিশন এবং মানবাধিকার সংস্থার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। নোবেল কমিটির মূল্যায়নে, পিল্লাইয়ের কাজ আন্তর্জাতিক আইন ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কমিটির এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য হলো, শান্তি প্রতিষ্ঠাকে শুধু যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অপরাধের জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের সঙ্গেও যুক্ত করা।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কেও পিল্লাইয়ের ভূমিকা রয়েছে। তিনি জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যে কমিশন ২০২৫ সালে গাজায় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে। ইসরায়েল ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত রায়ের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। তবে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং সংঘাতের সময় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে চলমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

পিল্লাইয়ের স্বীকৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা কেবল আইন ও আদালতের ওপর নির্ভর করে না; রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতাও প্রয়োজন। যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করা, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা অনেক সময় রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়ে। ফলে নোবেল শান্তি পুরস্কার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব তুলে ধরলেও এর মাধ্যমে চলমান সংঘাতের সমাধান বা অভিযুক্তদের বিচার নিশ্চিত হয়ে যায় না।

বাংলাদেশের জন্যও এই স্বীকৃতি প্রাসঙ্গিক। রোহিঙ্গা সংকট, মিয়ানমারে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের অভিযোগ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় চলমান কার্যক্রম এসব বিষয়ে জবাবদিহির সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে নাভি পিল্লাইয়ের পুরস্কারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বা কোনো নির্দিষ্ট মামলার নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না। বাস্তব অগ্রগতির জন্য সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ মানবাধিকার ও বিচারিক কর্মজীবনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বরাজনীতিতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: শক্তিশালী রাষ্ট্র হোক বা দুর্বল, আন্তর্জাতিক আইন কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা ধারাবাহিকভাবে মানবাধিকার রক্ষা, অপরাধের বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে তার ওপর।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com