গঙ্গার পানি বণ্টনে নতুন চুক্তির দাবি ঢাকার: ১২ ডিসেম্বরের আগে পানির নিশ্চয়তা মিলবে কি?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার: ঢাকা, ৯ অক্টোবর ২০২৬
গঙ্গার পানি বণ্টনে ভারতের সঙ্গে নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে চায় বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালের চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ১২ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হওয়ার কথা। তবে তার আগেই নতুন চুক্তি হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এনি ৮ অক্টোবর বলেছেন, বাংলাদেশ নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো পানির নিশ্চয়তাসংক্রান্ত ধারা ফিরিয়ে আনতে চায়। যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানান। এসব বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি বা বৈঠকের বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি; প্রতিবেদনে বাসস ও ঢাকা ট্রিবিউনের ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য গঙ্গার ন্যায্য হিস্যা দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের ভাটিতে পদ্মায় শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও নদীনির্ভর জীবিকায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আলোচনায় শুধু মোট পানির পরিমাণ নয়, কোন সময়ে কত পানি পাওয়া যাবে এবং সেই হিস্যা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রভাবের মাত্রা নির্ধারণে সাম্প্রতিক প্রবাহের তথ্য, স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
১৯৯৬ সালের চুক্তির ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এটি স্বাক্ষরের তারিখ থেকে ৩০ বছর কার্যকর থাকার কথা। ২ নম্বর অনুচ্ছেদ ও সংশ্লিষ্ট সারণি অনুযায়ী, প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কায় গঙ্গার পানি নির্ধারিত সূত্র ও দশদিনভিত্তিক সূচি অনুযায়ী ভাগ করা হয়। চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের মতো আলাদা “গ্যারান্টি ক্লজ” আছে কি না, তা নির্ধারণে মূল নথির নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করা প্রয়োজন। সরকারি ও গবেষণামূলক বর্ণনায় বলা হয়, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির প্রথম পাঁচ বছরের নিশ্চয়তাসংক্রান্ত ব্যবস্থা একইভাবে রাখা হয়নি; তবে এ বিষয়ে উৎসভেদে ভাষা ও আইনি ব্যাখ্যা ভিন্ন। ফলে দাবিটি যাচাই-সাপেক্ষ।
১৯৭৭ সালের চুক্তি বলতে ৫ নভেম্বর স্বাক্ষরিত “Agreement on Sharing of the Ganges Waters at Farakka and on Augmenting its Flows” বোঝানো হয়। এর মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর বা ১৯৮২ সালের ৩১ মে পর্যন্ত, যেটি আগে আসে। সরকারি ও গবেষণামূলক নথিতে বলা হয়েছে, এতে বিভিন্ন প্রবাহপরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট ন্যূনতম প্রবাহের ব্যবস্থা ছিল। তবে “নিশ্চয়তা” বলতে কোন অনুচ্ছেদ, সারণি বা প্রবাহমাত্রা বোঝানো হচ্ছে, তা মূল পাঠ ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা মিলিয়ে নিশ্চিত করা দরকার। চুক্তিটি বর্তমানে কার্যকর নয়; এটি ঐতিহাসিক তুলনার ভিত্তি।
৮ অক্টোবর ঢাকায় বিআইআইএসএসের এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের মন্ত্রী এনি বলেন, বাংলাদেশ শুধু পুরোনো চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে নয়, নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে আগ্রহী। তাঁর দাবি, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে প্রথম পাঁচ বছরের নিশ্চয়তাসংক্রান্ত ধারা ছিল, যা ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে বাদ পড়ে। বাংলাদেশ নতুন চুক্তিতে তা ফিরিয়ে আনতে চায়। তিনি ১২ ডিসেম্বরের আগেই চুক্তি সম্পন্নের আশা প্রকাশ করেন। তবে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ পাঠ ও ধারাগুলোর ব্যাখ্যা যাচাই করা হয়নি; তাই এটি মন্ত্রীর মতামত, চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির একই দিন বলেন, পানি বণ্টনের বিরোধ আলোচনা, সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রাসঙ্গিক নীতিগুলো বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ লিখিত পাঠও যাচাই করা যায়নি। কোন আইন বা নীতি প্রযোজ্য হবে, তা নির্দিষ্ট না করে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নতুন চুক্তিতে দুই দেশের পানির চাহিদা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, শুষ্ক মৌসুমের প্রাপ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থও আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হতে পারে। সম্ভাব্য চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে মেয়াদ, বণ্টনসূত্র, ন্যূনতম প্রবাহ, তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তি। ১২ ডিসেম্বরের আগে চুক্তি হবে কি না বা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
প্রবাহ কমলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, মিঠাপানি, মৎস্য, নাব্যতা ও পরিবেশে চাপ বাড়তে পারে; কোথাও সেচব্যয় বা লবণাক্ততাও বাড়তে পারে। তবে প্রভাব নির্ভর করবে প্রকৃত প্রবাহ, স্থানীয় পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ওপর। নির্ভরযোগ্য বণ্টন ও যৌথ পর্যবেক্ষণ থাকলে পানি ব্যবস্থাপনা পূর্বানুমানযোগ্য হতে পারে এবং বন্যা, নদীভাঙন ও দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়তে পারে—তবে এগুলো সম্ভাব্য সুফল, নিশ্চিত ফল নয়।
সব মিলিয়ে, ১২ ডিসেম্বরের সময়সীমা সামনে রেখে গঙ্গার পানি বণ্টন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও পরিবেশগত বিষয়। ঢাকার লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য হিস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা; ১৯৭৭ সালের ব্যবস্থার কোন ধারা ফিরবে, তা আলোচনার ফলের ওপর নির্ভর করবে। শেষ পর্যন্ত চুক্তি হলে তার শর্ত, মেয়াদ, বণ্টনসূত্র ও বাস্তবায়নব্যবস্থা জনসমক্ষে যাচাইযোগ্য হওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।