অপরাধ দমনের পাশাপাশি প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব

শান্তি শুধু পুলিশের হাতে নয়; জনসাধারণও দায়বদ্ধ

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১২ পিএম

একটি সামান্য বিরোধ, কয়েক হাজার টাকা, অপমানজনক একটি কথা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্ট—কখনো কখনো এসবের পরিণতি হচ্ছে প্রাণহানি। মানুষের জীবনের মূল্য কি তবে এতটাই কমে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক নানা ঘটনা সেই প্রশ্নই সামনে আনছে। কিশোর অপরাধ, মাদকের বিস্তার, নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা, অনলাইনে উসকানি, পারিবারিক নির্যাতন এবং বিচার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা—সব মিলিয়ে স্পষ্ট, সংকটটি কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়; এর শিকড় সমাজের গভীরে।

অপরাধ ঘটার পর পুলিশ, আদালত ও কারাগারের দিকে তাকিয়ে থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অপরাধ দমন জরুরি, কিন্তু তার চেয়েও কার্যকর হলো অপরাধের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে না দেওয়া। এ দায়িত্ব কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

 

কিশোর অপরাধ: অপরাধীর আগে একজন মানুষকে দেখতে হবে

কিশোর অপরাধকে আমরা প্রায়ই কিছু ‘বখে যাওয়া ছেলের’ সমস্যা হিসেবে দেখি। ফলে সমস্যার গভীরতা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। যে কিশোর আজ ছিনতাই, মারামারি কিংবা দলবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তার পেছনে থাকতে পারে পারিবারিক অবহেলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া, মাদকের প্রভাব, কর্মসংস্থান ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভাব কিংবা অপরাধী চক্রের প্ররোচনা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সহিংসতায় অন্তত ১৯৫ শিশুর মৃত্যুর কথা প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের তথ্য শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা, সামাজিক পরিবেশ ও আচরণগত বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে অপরাধে জড়িত কিশোরকে শুধু শাস্তির চোখে দেখলে চলবে না; তার অপরাধের কারণ চিহ্নিত করে সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগও তৈরি করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো কিংবা দামি মোবাইল কিনে দেওয়াই অভিভাবকের দায়িত্বের শেষ কথা নয়। তার বন্ধু কারা, কোথায় সময় কাটায়, আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এসেছে কি না, হঠাৎ অর্থের উৎস কী—এসব বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে।

তবে নজরদারি যেন কেবল শাসন বা সন্দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সন্তানকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, তার সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ভয় দেখিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়; কিন্তু বিশ্বাস তৈরি না হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা কঠিন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আচরণ, মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক বিকাশের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত কাউন্সেলিং, মাদকবিরোধী সচেতনতা, সহপাঠী সহায়তা এবং ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাকে শুধু বহিষ্কার বা বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে পরিবার, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সমন্বয়ে সংশোধনের পথ খুঁজতে হবে।

 

মাদক: অপরাধের পেছনের শক্তিকে চিহ্নিত করতে হবে

 

মাদক ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবারে অশান্তি, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে। মাদককে কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাই কিংবা অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

মাদকবিরোধী অভিযান প্রয়োজন, কিন্তু গ্রেপ্তার ও জব্দের পরিসংখ্যানই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। মাদকের সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের প্রবাহ এবং এর পেছনে সক্রিয় সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: মাদক ব্যবসায় জড়িত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—দুটি ভিন্ন প্রয়োজন। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে সমস্যার একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে এলেও অন্য অংশটি থেকেই যেতে পারে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জরুরি

 

ডিজিটাল যোগাযোগ মানুষের মতপ্রকাশ, তথ্যপ্রাপ্তি ও পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে। কিন্তু এর অপব্যবহার নতুন ধরনের সংঘাত ও সহিংসতার ঝুঁকিও তৈরি করছে। গুজব, অপমানজনক পোস্ট, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইন হুমকি কিংবা দলবদ্ধ উসকানি বাস্তব জীবনের বিরোধকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

শিশু-কিশোরদের শুধু মোবাইল কম ব্যবহার করতে বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কোন তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করা উচিত নয়, অনলাইনে কাউকে অপমান করা কেন ক্ষতিকর, ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হয় এবং হয়রানির শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হয়—এসব বিষয়ে তাদের শিক্ষা দিতে হবে।

অভিভাবকদেরও ডিজিটাল জগতের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অযথা লঙ্ঘন করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি গোপনীয়তার অজুহাতে সব ঝুঁকি উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

অনলাইন অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। তবে অপরাধ দমনের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা কিংবা নির্বিচার হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আইন প্রয়োগে প্রয়োজন স্পষ্টতা, জবাবদিহি ও যথাযথ প্রক্রিয়া।

 

নারী ও শিশু: নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে ঘর থেকেও

 

নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। রাস্তাঘাটে পুলিশি টহল বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ কিংবা শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে তা একা যথেষ্ট নয়।

‘পরিবারের সম্মান’ রক্ষার নামে নির্যাতনের ঘটনা চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো নারী বা শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে পাশে দাঁড়ানো এবং নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ করে দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে। তারা কোনো অভিযোগ জানালে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশে কথা বলার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌর পর্যায়ে নারী ও শিশুর জন্য সহজ অভিযোগব্যবস্থা, দ্রুত সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা থাকা দরকার। ভুক্তভোগী যেন অভিযোগ জানাতে গিয়ে নতুন করে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

 

বিচারব্যবস্থা: বিলম্ব ন্যায়বিচারের আস্থাকে দুর্বল করে

 

ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও মানুষের আস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে ভুক্তভোগী আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন। সাক্ষীরা আগ্রহ হারাতে পারেন, প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হতে পারে।

২০২৬ সালের মার্চের শেষে দেশের আদালতগুলোতে ৪৬ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের বিপুল মামলাজট বিচারপ্রক্রিয়াকে গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। তবে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমানোই একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না; ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো মামলা নিষ্পত্তিতে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, তদন্তের মানোন্নয়ন, প্রসিকিউশনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সাক্ষ্যপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, সাক্ষীর সুরক্ষা এবং তদন্তের পেশাদারত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্রুত বিচার মানে তাড়াহুড়ো করে বিচার নয়। বরং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমিয়ে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।

 

পুলিশ: অপরাধ দমনের পাশাপাশি প্রতিরোধেও জোর দিতে হবে

 

অপরাধ দমন পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু কার্যকর পুলিশিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। কিশোর গ্যাং, মাদকচক্র কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু ঘটনার পর গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক ভিত্তি ও সংগঠকদের শনাক্ত করাও জরুরি।

অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে তথ্যভিত্তিক নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের ক্ষেত্রে অযথা হয়রানি এড়িয়ে প্রকৃত অপরাধী ও অপরাধে প্ররোচনাকারীদের শনাক্ত করতে হবে। থানায় সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়াও হতে হবে সহজ, সংবেদনশীল ও জবাবদিহিমূলক।

একজন ভুক্তভোগী যেন অভিযোগ জানাতে গিয়ে দ্বিতীয়বার হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দায়িত্বেরই অংশ। পুলিশের কার্যকারিতা শুধু অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা মামলার সংখ্যায় নয়; সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ বোধ করছেন এবং অপরাধ প্রতিরোধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে, তা দিয়েও মূল্যায়ন করতে হবে।

 

স্থানীয় সমাজ: প্রথম প্রতিরোধ গড়ে উঠুক পাড়া-মহল্লায়

 

সব সমস্যার সমাধান সরকারের হাতে ছেড়ে দিলে নাগরিক দায়িত্বের জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি, কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা নিয়মিত সহিংসতা চললে স্থানীয় মানুষের পক্ষে তার কোনো লক্ষণই না জানা অস্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময় ঝামেলায় জড়ানোর আশঙ্কায় মানুষ নীরব থাকেন।

এই নীরবতা ভাঙতে হবে, তবে তা হতে হবে নিরাপদ ও আইনসম্মত উপায়ে। পাড়া-মহল্লায় অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, পাঠচক্র এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মাধ্যমে কিশোরদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

অপরাধের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো নাগরিক দায়িত্ব। কিন্তু সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে অপদস্থ করা, দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সামাজিক প্রতিরোধের ভিত্তি হতে হবে সচেতনতা, মানবিকতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।

 

গণমাধ্যম: অপরাধের বিবরণ নয়, কারণ ও সমাধানও সামনে আসুক

 

অপরাধের সংবাদ প্রকাশ গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু অপরাধকে চমক হিসেবে উপস্থাপন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে অপরাধীর পরিচিতি প্রচার কিংবা সহিংসতার বিবরণকে অতিরঞ্জিত করা জনমনে আতঙ্ক বাড়াতে পারে। শিশু ও যৌন সহিংসতার ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

গণমাধ্যমের কাজ শুধু কী ঘটেছে তা জানানো নয়; কেন ঘটছে, এর সামাজিক প্রভাব কী এবং কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়—এসব প্রশ্নও সামনে আনা। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং কার্যকর প্রতিরোধের উদাহরণ প্রকাশের মাধ্যমে গণমাধ্যম জনসচেতনতা বাড়াতে পারে।

অপরাধের সংবাদে দায়িত্বশীলতা মানে ঘটনা আড়াল করা নয়; বরং জনস্বার্থ রক্ষা করে সত্য, প্রেক্ষাপট ও সমাধানের পথ তুলে ধরা।

 

শেষ কথা: শাস্তির পাশাপাশি প্রতিরোধই হোক অগ্রাধিকার

 

অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে ন্যায়সংগত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে—এ নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। কিন্তু একটি সমাজের সাফল্য শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, কতটি মামলা হলো কিংবা কতজনের সাজা হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সাফল্যের বড় মাপকাঠি হলো, কতটি অপরাধ প্রতিরোধ করা গেল এবং মানুষ কতটা নিরাপদে বসবাস করতে পারছেন।

এ জন্য দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে। পরিবার সন্তানকে সময় দেবে, তার কথা শুনবে এবং বিপদের সংকেত বুঝবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীর আচরণ, মানসিক সুস্থতা ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেবে। পুলিশ অপরাধের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। প্রশাসন স্থানীয় পর্যায়ে সহজ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করবে। বিচারব্যবস্থা মামলাজট কমিয়ে নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে। নাগরিক সমাজ নীরব দর্শক না থেকে আইনসম্মত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। আর গণমাধ্যম অপরাধকে উত্তেজনার বিষয় না বানিয়ে জনস্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরবে।

সবশেষে, সন্তানকে শুধু ভালো ফল করা মানুষ হিসেবে নয়, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও নিতে হবে। কারণ আইন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে; কিন্তু অপরাধের আগেই একজন মানুষকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে পরিবার, শিক্ষা, বিবেক ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশ।

শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব তাই শুধু পুলিশের হাতে তুলে দিলে চলবে না। নিরাপদ সমাজ গড়ার লড়াই শুরু করতে হবে অপরাধের ঘটনাস্থলে নয়, তার অনেক আগে—পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সামাজিক আচরণে এবং নাগরিক মূল্যবোধে।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com