হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা–দিল্লি টানাপোড়েন: প্রত্যর্পণ ইস্যুতে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৫ এএম

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার, ৮ অক্টোবর ২০২৬।

 সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির অবস্থানে এখনও পার্থক্য রয়েছে। ৭ অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও জানিয়েছে, হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি আইনি বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশ দ্রুত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে আছে। 

বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারত ইতোমধ্যে পেয়েছে এবং জুলাই থেকেই নয়াদিল্লি বলে আসছে যে আবেদনটি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ৭ অক্টোবর বলেন, “প্রত্যর্পণের বিষয়টি একটি আইনি বিষয়”—তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাসিনার বিচারসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি পাঠিয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।

অন্যদিকে ঢাকার বক্তব্য হলো, শুধু আইনি প্রক্রিয়া যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন। ৪ অক্টোবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, হাসিনার প্রত্যর্পণে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। তিনি জানান, বাংলাদেশ বিদ্যমান ভারত–বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা করছে। 

ভারতের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয় ৩ অক্টোবর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কোনো সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ বিষয়টি আদালত-সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তনের পর হাসিনা ভারতে পৌঁছালে নয়াদিল্লি প্রতিবেশী হিসেবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে প্রত্যর্পণ আবেদনের বিষয়টি আলাদা আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হচ্ছে। 

হাসিনার ভারতে অবস্থান শুরু হয় ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে, যখন তাঁর সরকারের পতনের পর তিনি বাংলাদেশ ছাড়েন। এরপর তাঁর প্রত্যর্পণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম আলোচিত দাবিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারও হয়েছে এবং তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি এবং নয়াদিল্লি বারবার বিষয়টিকে আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে। 

এখানেই ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ চাইছে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি, আর ভারত বিষয়টিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছে। ফলে রাজনৈতিক বক্তব্য যতই কঠোর হোক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত আইনি পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট নথি এবং দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর। একই সঙ্গে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের কারণে দুই দেশকে বৃহত্তর সম্পর্কও সামলে চলতে হচ্ছে। 

আগামী দিনে এই ইস্যুতে দুই ধরনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ভারত যদি আইনি পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করে, তাহলে প্রত্যর্পণ নিয়ে নতুন কূটনৈতিক অগ্রগতি হতে পারে। আবার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের ওপর চাপ আরও বাড়াতে পারে। ৭ অক্টোবরের ভারতের বক্তব্যে তাৎক্ষণিক কোনো সময়সীমা না আসায় আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকছে—আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে নয়াদিল্লি শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যায়।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com