কবে পূর্ণতা পাবে বেরোবির স্বাধীনতা স্মারক?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২১ এএম
রুশাইদ আহমেদ, বেরোবি :
চলতি বছরের ১২ অক্টোবর দেড় যুগে পদার্পণ করতে চলেছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। এসময়ের ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে তিনটি একাডেমিক ভবন, বিস্তীর্ণ প্রশাসনিক ভবন, তিনতলা বিশিষ্ট ক্যাফেটেরিয়া, দুটি ছাত্র হল এবং একটি ছাত্রী হল গড়ে উঠেছে। নির্মাণাধীন রয়েছে রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও বেগম খালেদা জিয়া ছাত্রী হলও। তবু, প্রতিষ্ঠার পর এত বছর কেটে গেলেও ক্যাম্পাসটির একমাত্র মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নির্মাণাধীন ভাস্কর্য স্বাধীনতা স্মারক আজও পূর্ণতা পায়নি।
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে প্রতিষ্ঠিত হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে গত দেড় যুগে আলাদা আলাদা পাঁচজন ভিসি এসেছেন, গেছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বদলেছে সরকারও। এরপরও সৌভাগ্য ধরা দেয়নি এই ভাস্কর্যটির। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও, এখনও কঙ্কালসার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনাটি।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে জনতা ব্যাংকের অনুদানে স্থপতি মুনাওয়ার হাবীব তুহিনের নকশা অনুযায়ী দেবদারু ও কৃষ্ণচূড়া সড়কের মাঝে ১১ হাজার ৬৯৬ বর্গফুট বেদীর ওপরে তিন স্তম্ভবিশিষ্ট স্মারকটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বেরোবির দ্বিতীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল জলিল মিয়ার প্রশাসন। রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ছাত্রী হলসহ স্মারকটির নির্মাণ কাজের জন্য একটি মেগা প্রকল্প প্রণয়ন করা হয় সেসময়। প্রকল্পটির আওতায়, স্মারকটির তিনটি স্তম্ভকে ভূমি হতে ২০ ফুট উচ্চতায় একটি ছাদের মাধ্যমে একত্রিত করার পরিকল্পনা করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মুক্তিযুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার স্ফূরণকে প্রতীকায়িত করে তোলাই এর উদ্দেশ্য। সঙ্গে পাথর দ্বারা নির্মিত স্তম্ভগুলোর গায়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংবলিত কারুকার্য করার কথাও ভাবা হয়েছিল। এছাড়া, স্তম্ভের পেছনে দিকে ঢালু অংশে বিভিন্ন মুরাল রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল নকশাটিতে।
পরের বছরের, অর্থাৎ ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ.কে.এম. নূর-উন-নবী। তবে, কিছুদিন পরই সীমিত অর্থের কারণে স্মারকটির কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
এরই ধারাবাহিকতায়, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ এসে স্মারকটির নির্মাণ ব্যয় ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকায় উন্নীত করেন। যা নিয়ে বেশ বিতর্ক দেখা দেয়। ফলে, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে স্মারকসহ একই প্রকল্পের আওতায় থাকা নির্মাণাধীন রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ছাত্রী হলের কাজ বন্ধ রেখে তদন্তের নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এরপর থেকেই দুটি অপূর্ণ স্তম্ভ নিয়ে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনাটি।
২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বেরোবির উপাচার্যের দায়িত্বে আসেন। বর্তমান শওকাত আলী প্রশাসনের আমলে প্রকল্পটির আওতায় রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ছাত্রী হলের কাজ পুনরায় শুরু হলেও স্বাধীনতা স্মারকের বিষয়ে এখনও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি কর্তৃপক্ষকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য, ইনস্টিটিউট ও হলের কাজ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে ইউজিসির বাজেট অনুমোদন পাওয়ার সাপেক্ষে স্মারকের কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। এমতাবস্থায়, ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজ সত্বর চালুর দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।
বেরোবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী রূপা চক্রবর্তী বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর দেড় যুগ পার হয়েছে। তবুও আমাদের স্বাধীনতা স্মারকটা পূর্ণতা পায়নি। মেগা প্রকল্পের জন্য নতুন বাজেট পাওয়ার ভিত্তিতে সত্বর স্থাপনাটির নির্মাণ কাজ শুরুর দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব মিজানুর রহমান মিনার বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় নানা সংকট ও চড়াই-উৎরাই পার করে আসছে। এখানে পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা নেই, রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কাজও শেষ হয়নি৷ স্বাধীনতা স্মারকের নির্মাণ কাজও দুর্নীতির কারণে বহুদিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে৷ আমরা চাই, আমাদের স্বাধীনতা স্মারকের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরুর পাশাপাশি কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হোক।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, “(স্বাধীনতা স্মারক, ছাত্রী হল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের) স্পেশাল প্রজেক্টটি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ আগে থেকেই ছিল। আমরা সেটি নিষ্পত্তিতে কাজ করছি। এরই মধ্যে ছাত্রী হল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিয়েছে। তাই, সেটার কাজই এখন চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে স্বাধীনতা স্মারকটি এখনও (অপূর্ণভাবে) পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। (প্রকল্পে) হল ও ইনস্টিটিউট ভবনের ভিত ১০ তলা দেওয়া থাকলেও পাঁচ তলা পর্যন্ত হয়েছে। ভবন দুটির বাকি পাঁচ-পাঁচ ১০ তলার সঙ্গে স্বাধীনতা স্মারকের কাজ শুরুর জন্য ইউজিসি আমাদেরকে নতুন করে প্রস্তাবনা দিতে বলেছে। সেটি নিয়ে আমরা কাজ করছি।”