রোহিঙ্গা সংকট: ক্যাম্প থেকে সীমান্ত, মানবিকতা থেকে ভূরাজনীতি

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৮ এএম

রোহিঙ্গা সংকটকে আমরা দীর্ঘদিন একটি মানবিক সংকট হিসেবে দেখে এসেছি। নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দেওয়া, খাদ্য ও চিকিৎসা দেওয়া, শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা—এসবই ছিল বাংলাদেশের মানবিক দায়িত্বের অংশ। কিন্তু প্রায় এক দশকের বাস্তবতা দেখিয়ে দিয়েছে, সংকটটি আর শুধু মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও মানবপাচার, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বৃহত্তর ভূরাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। দীর্ঘস্থায়ী এই পরিস্থিতিতে ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা, সংঘবদ্ধ অপরাধ, হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ায় শরণার্থীদের মৌলিক সেবাও চাপের মুখে পড়ছে।

অর্থাৎ প্রশ্নটি এখন আর শুধু—‘রোহিঙ্গাদের কীভাবে সহায়তা করা হবে?’—এখানে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন হলো, এই সংকটকে কীভাবে এমন পর্যায়ে যেতে দেওয়া হবে না, যেখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক স্বার্থ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়?

 

মানবিক আশ্রয় থেকে নিরাপত্তার বাস্তবতা

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর আগেও ১৯৯০-এর দশকসহ বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে বর্তমান সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের নাগরিকত্বহীনতা, জাতিগত বৈষম্য, সহিংসতা ও রাজনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস।

বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। কিন্তু অস্থায়ী আশ্রয় যখন বছরের পর বছর স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়, তখন এর সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন নতুন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা।

ক্যাম্পের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রভাব, বাইরে মাদক ও মানবপাচারের নেটওয়ার্ক এবং সীমান্তে গোলাগুলি ও গোলাবর্ষণের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকট এখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য সবসময় মনে রাখতে হবে—রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র বা অপরাধী গোষ্ঠী এক বিষয় নয়। লাখ লাখ সাধারণ শরণার্থীকে কোনো সশস্ত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের দায়ে দায়ী করা যেমন অন্যায়, তেমনি মানবিকতার দোহাই দিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী বা অপরাধী নেটওয়ার্কের তৎপরতা উপেক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।

মানবিকতা ও নিরাপত্তা—দুটিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে একই নীতির দুইটি অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে দেখতে হবে।

 

আরসা-আরএসও: ক্যাম্পের ভেতরের নিরাপত্তা সমীকরণ

রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর নিরাপত্তা মাত্রাগুলোর একটি হলো সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি ও প্রভাব।

ক্যাম্পের তরুণদের একটি অংশকে অর্থ, প্রলোভন, প্রতিশ্রুতি কিংবা ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সংঘাত ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সংঘাতের সঙ্গে ক্যাম্পের কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোগাযোগের অভিযোগ থাকায় বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য আরও উদ্বেগের।

আরসা (ARSA) এবং আরএসও (RSO)-এর মতো গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা তাই শুধু ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মিয়ানমারের চলমান সংঘাতেরও যোগসূত্র রয়েছে।

বাংলাদেশের নীতি এখানে হতে হবে দ্বিমুখী।

একদিকে সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে ক্যাম্পকে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়োগ, অস্ত্র, অর্থায়ন, চাঁদাবাজি কিংবা অপরাধ পরিচালনার নিরাপদ ক্ষেত্র হতে দেওয়া যাবে না।

এ জন্য শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও শরণার্থীদের মধ্যে আস্থাভিত্তিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ।

কারণ সশস্ত্র গোষ্ঠীর শক্তি শুধু অস্ত্র থেকে আসে না; অনেক সময় এর ভিত্তি তৈরি হয় দারিদ্র্য, বেকারত্ব, হতাশা, ভয়, অবৈধ অর্থনীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে।

 

মাদক ও মানবপাচার: সীমান্তের অদৃশ্য যুদ্ধ

রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে মাদক ও মানবপাচারের সম্পর্ককে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চল। রোহিঙ্গা সংকট সেই ঝুঁকির সঙ্গে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের সীমিত কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগের ঘাটতি, চলাচলের বিধিনিষেধ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিতে পারে।

বিশেষ করে মানবপাচারকারী চক্রগুলো শরণার্থীদের দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। সমুদ্রপথে অনিয়মিত যাত্রা, বিদেশে উন্নত জীবনের প্রলোভন এবং পাচারকারীদের প্রতারণা অনেকের জীবনকে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

এখানে বাংলাদেশের জন্য বিপদ শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তবর্তী স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও অপরাধী নেটওয়ার্কে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।

তাই মাদক ও মানবপাচার দমনে শুধু সীমান্তে টহল বাড়ালে হবে না। প্রয়োজন অর্থের প্রবাহ, দালালচক্র, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, পরিবহনব্যবস্থা এবং অপরাধের অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সীমান্তভিত্তিক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

 

সীমান্ত এখন শুধু একটি সীমারেখা নয়

রাখাইনে সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত তত বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অনুভূত হচ্ছে। সীমান্তে গোলাগুলি, গোলাবর্ষণ কিংবা আকাশসীমা লঙ্ঘনের মতো ঘটনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায়।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সীমান্তনীতি হতে হবে দৃঢ়, কিন্তু পরিমিত।

বাংলাদেশ কোনো পক্ষের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে জড়াবে না। কিন্তু নিজের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা, সীমান্তের অখণ্ডতা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো অস্পষ্টতা রাখার সুযোগও নেই।

সীমান্তে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, ড্রোন ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ, নদীপথ ও দুর্গম এলাকার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে তথ্যসমন্বয় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

সীমান্তে প্রতিরোধের অর্থ যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়; বরং যে কোনো অনুপ্রবেশ, গোলাবর্ষণ, চোরাচালান বা সশস্ত্র তৎপরতার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি করা।

 

আরাকান আর্মি: নতুন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর একটি এখন—রোহিঙ্গারা যখন রাখাইনে ফিরবে, তখন তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে কে?

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত রাখাইনের ক্ষমতার বাস্তব কাঠামো বদলে দিয়েছে। রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় আরাকান আর্মির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব তৈরি হওয়ায় প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি এখন শুধু নেপিডোর সঙ্গে আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।

এখানেই বাংলাদেশের কূটনীতির নতুন পরীক্ষা।

শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব—সেটি নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ প্রত্যাবাসন বাস্তবে রাখাইনের মাটিতে হবে; সেখানে নিরাপত্তা, চলাচল, ভূমি, বসতি, মানবিক সহায়তা ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে যেসব পক্ষ জড়িত, তাদের ভূমিকা উপেক্ষা করা কঠিন।

তবে প্রয়োজনভিত্তিক যোগাযোগের অর্থ কোনো পক্ষকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো—মাঠের বাস্তবতা বুঝে, বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে প্রয়োজনীয় যোগাযোগের পথ খোলা রাখা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী কূটনীতির এ জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

চীন-ভারত-মিয়ানমার: সংকটের আড়ালে বৃহত্তর ভূরাজনীতি

রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু ঢাকা-নেপিডোর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক মাত্রা অদৃশ্য থেকে যায়।

রাখাইন রাজ্য বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে অঞ্চলটি চীন ও ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের কাছে রাখাইন গুরুত্বপূর্ণ গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো এবং ভারত মহাসাগরীয় সংযোগের কারণে। ভারতের কাছেও রাখাইন গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে সিত্তে বন্দর ও কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্পের কারণে।

ফলে মিয়ানমারে দুই বৃহৎ প্রতিবেশী শক্তির স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু তাদের স্বার্থ সবক্ষেত্রে এক নয়।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ এখানেই।

চীনকে বাদ দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কঠিন। ভারতকেও বাদ দেওয়া যায় না। মিয়ানমারকে আলোচনার বাইরে রেখে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘ, পশ্চিমা দেশ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের চাপও প্রয়োজন।

অতএব বাংলাদেশের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ বহুমাত্রিক কূটনীতি—কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নয়।

বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত পরিষ্কার: আমরা কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ নই; আমরা চাই আমাদের ভূখণ্ড ও জনগণের নিরাপত্তা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান।

 

প্রত্যাবাসন: শুধু ফেরত পাঠানো নয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হবে শুধু সংখ্যাকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে দেখা।

এক হাজার, দশ হাজার বা এক লাখ রোহিঙ্গা ফিরে গেল—এটি নিজে কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

প্রশ্ন হলো—তারা কোথায় যাবে?

তাদের নাগরিকত্ব কী হবে?

তাদের ঘরবাড়ি ও জমি কি ফেরত দেওয়া হবে?

তারা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে কি?

তাদের সন্তানরা স্কুলে যেতে পারবে কি?

চিকিৎসা ও জীবিকার সুযোগ থাকবে কি?

তারা আবার সহিংসতার শিকার হলে বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে কি?

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, ভূমি ও ঘরবাড়ি, মৌলিক সেবা এবং বিচার ও জবাবদিহির বিষয়গুলো তাই কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।

রোহিঙ্গাদের বড় অংশ যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে ফিরতে অনাগ্রহী হয়, সেটিকে শুধু ‘ফিরতে চায় না’ বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং এটি প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা ও অধিকার কাঠামোর দাবি হিসেবেও দেখা উচিত।

প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই। সংখ্যার চেয়ে এই চারটি শর্ত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

বাংলাদেশের করণীয়

প্রথমত, রোহিঙ্গা সংকটকে জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সমন্বিত অগ্রাধিকার হিসেবে পরিচালনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ক্যাম্প নিরাপত্তায় ‘সব রোহিঙ্গা অপরাধী’—এমন কোনো সাধারণীকরণ করা যাবে না। সুনির্দিষ্ট অপরাধী, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

তৃতীয়ত, মাদক ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ, আরাকান আর্মি এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পক্ষগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।

পঞ্চমত, চীন ও ভারতের সঙ্গে পৃথকভাবে উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত আলোচনা চালাতে হবে। মিয়ানমারে তাদের যে প্রভাব রয়েছে, তা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও রাখাইনের স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজে লাগানোর জন্য ধারাবাহিক কূটনীতি প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের বক্তব্য আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার—ত্রাণের অর্থ দিয়ে সংকটকে অনির্দিষ্টকাল টিকিয়ে রাখা নয়; সংকটের মূল কারণ দূর করতে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

সপ্তমত, ক্যাম্পের তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রিত জীবিকার সুযোগ বাড়াতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব, হতাশা ও অনিশ্চয়তা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অষ্টমত, প্রত্যাবাসনের আগে একটি আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। শুধু মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর না করে প্রত্যাবাসনের পরও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

নবমত, প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার এবং মৌলিক মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

 

সবচেয়ে বড় বিপদ—সময়

রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় শত্রু সম্ভবত সময়।

আজ যে শিশু ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে, কয়েক বছর পর সে তরুণ হবে। তার সামনে যদি শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান কিংবা নিরাপদ ভবিষ্যতের কোনো বাস্তব পথ না থাকে, তাহলে হতাশা, অপরাধী চক্র, মানবপাচার কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অন্যদিকে রাখাইনে যদি রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি, জমি ও বসতির অস্তিত্ব ক্রমেই পরিবর্তিত হয়, তাহলে প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা আরও জটিল হয়ে উঠবে।

অতএব সময় যত গড়াবে, সমাধানের রাজনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত খরচ তত বাড়বে।

রোহিঙ্গা সংকট তাই ‘অপেক্ষা করে দেখার’ কোনো বিষয় নয়। প্রতিটি বছর সমাধানকে সহজ করার বদলে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

 

শেষ কথা: বাংলাদেশকে শুধু আশ্রয়দাতা নয়, সমাধানের পক্ষ হতে হবে

বাংলাদেশ মানবিকতার জায়গা থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। এই ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু মানবিক দায়িত্ব পালনের অর্থ এই নয় যে, একটি রাষ্ট্র অনির্দিষ্টকাল অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের আশ্রয়ের বোঝা বহন করবে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অবশ্যই হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই। কিন্তু প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু কাগজে-কলমে চুক্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তব নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, ভূমি ও সম্পত্তির নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ রোহিঙ্গা সংকট এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কক্সবাজারের একটি ক্যাম্পের নিরাপত্তা আর শুধু কক্সবাজারের বিষয় নয়; তা সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদকপাচার, মানবপাচার, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, রাখাইনের সংঘাত এবং বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত।

আরাকান আর্মির উত্থান, মিয়ানমারের সামরিক সংঘাত, চীন-ভারতের কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সীমিত কার্যকর চাপ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে সহজ কোনো পথ নেই।

তবু পথ আছে।

সেটি হলো—মানবিকতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য; ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় কঠোর কিন্তু ন্যায়সংগত আইন প্রয়োগ; সীমান্তে কার্যকর প্রতিরোধ; আরসা-আরএসওসহ সশস্ত্র ও অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা; মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ; এবং একই সঙ্গে চীন, ভারত, মিয়ানমার, ASEAN, জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত না রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল এখানে আটকে রাখা, না নিরাপত্তাহীন অবস্থায় তাড়াহুড়ো করে ফিরিয়ে দেওয়া।

লক্ষ্য একটাই—

যে দেশে রোহিঙ্গাদের জন্ম ও নাগরিক অস্তিত্বের দাবি, সেই মিয়ানমারেই তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, অধিকারসম্মত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ তৈরি করা।

কারণ রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কক্সবাজারে নয়—

রাখাইনেই।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com