গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন:বিনিয়োগ, রাজস্ব ও শর্ত প্রকাশ না করায় বিতর্ক—বন্দর অচলের হুমকি শ্রমিক সংগঠনের

চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা: ডিপি ওয়ার্লডের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে আজ

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫১ এএম

 

চট্রগ্রাম থেকে বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ হাসান:

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে পরিচালনার দায়িত্ব দিতে যাচ্ছে সরকার। এ নিয়ে চূড়ান্ত ‘কনসেশন’ বা পরিচালনার অধিকার চুক্তি আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে চুক্তির আগে বিদেশি অপারেটরকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য বিনিয়োগ, রাজস্ব ভাগাভাগি ও চুক্তির শর্ত প্রকাশ না করায় প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ, বন্দর ব্যবহারকারী ও শ্রমিক নেতারা।

গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার খসড়া চুক্তি অনুমোদন করে। এর আগে দেশি, বহুজাতিক ও বিদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চূড়ান্তভাবে বেছে নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে পরিচালনার অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের আয়োজনে আজকের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা করিমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

তবে চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও বাণিজ্যিক তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ডিপি ওয়ার্ল্ড কত টাকা বিনিয়োগ করবে, কী ধরনের নতুন যন্ত্রপাতি যুক্ত করবে, প্রতি কনটেইনারে বন্দরের আয় কত হবে এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে—এসব বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত জানায়নি।

নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই চুক্তি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী চুক্তির সব তথ্য এখন প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে এনসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিলে দেশের কী লাভ হবে, তারা কত বিনিয়োগ করবে এবং শর্ত ভঙ্গ করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে—এসব তথ্য প্রকাশের দাবি জানান তিনি।

 

আর্থিক প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন

 

ডিপি ওয়ার্ল্ডের খসড়া প্রস্তাবে এনসিটি পরিচালনার জন্য দুই কোটি মার্কিন ডলার ‘কনসেশন ফি’ দেওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি কনটেইনারপ্রতি গড় আয়ের ওপর ভিত্তি করে স্তরভিত্তিক রয়্যালটির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সর্বনিম্ন রেভিনিউ গ্যারান্টি হিসেবে ৫২ মিলিয়ন ডলারের কথাও উল্লেখ ছিল। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এর চেয়ে বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল বলে জানা গেছে।

এ কারণে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কেন বেছে নেওয়া হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

 

বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল এনসিটি

 

চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি চালু কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড় ও আধুনিক। টার্মিনালটি নির্মাণ ও আধুনিকায়নে চট্টগ্রাম বন্দর ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। বন্দরে বছরে হ্যান্ডলিং হওয়া মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

এনসিটি বর্তমানে নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান ড্রাইডকের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। শ্রমিক নেতাদের দাবি, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটির কার্যক্রম গতিশীল হওয়ার পরও কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিতে হবে, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

 

আন্দোলনের হুমকি শ্রমিক সংগঠনের

 

এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে না দেওয়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলো। গত কয়েক মাসে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও মশাল মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘের নেতারাও চুক্তির বিরোধিতা করেছেন। সংগঠনটির নেতারা শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা করে, বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো রেখে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।

জাতীয়তাবাদী ও জামায়াত-সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও চুক্তির বিরোধিতা করে চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকেই বন্দর অচল করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

এ অবস্থায় চুক্তি স্বাক্ষরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। একদিকে আধুনিক ও দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশা, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও শ্রমিকদের স্বার্থ—এই তিনটি প্রশ্নকে ঘিরেই এখন এনসিটি পরিচালনার চুক্তি নিয়ে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com