ইসরাতের বিয়েতে আমরা ১৩ জন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়,মেলেনি মারামারির দেখা!

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম

নোবিপ্রবি প্রতিনিধি:

ক্যাম্পাস জীবন মানেই তো ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, টিউটোরিয়াল আর ল্যাবের জটিল সমীকরণে বন্দি এক ব্যস্ত দুনিয়া। কিন্তু এই যান্ত্রিকতার মাঝেও বন্ধুদের যেকোনো উৎসব বা আনন্দের উপলক্ষ পেলে আমরা সব ব্যস্ততা একপাশে সরিয়ে রেখে মেতে উঠি উদযাপনে। আমরা নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী। সম্প্রতি আমাদের বিভাগেরই প্রিয় সহপাঠী ইসরাত জাহানের শুভ পরিণয় উপলক্ষে আমাদের ঝুলিতে যুক্ত হলো জীবন খাতার অন্যতম সেরা ও রোমাঞ্চকর এক স্মৃতি।

ঘটনাটি গত ২৫ সেপ্টেম্বরের। ইসরাতের বর সাব্বির হোসাইন। ভালোবাসার মানুষটির সাথে ইসরাতের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে—এমন এক বিশেষ মুহূর্তে সহপাঠী হিসেবে পাশে না থাকলে কি চলে? তাই আমরা বিভাগের ১৩ জন সহপাঠী মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেতেই হবে। পরিকল্পনা মাফিক নোয়াখালী থেকে একটি মাইক্রোবাস রিজার্ভ করা হলো।

অভিযাত্রার শুরুতেই বাঁধল মজার ঝামেলা—মাইক্রোবাসে কে কোন সিটে বসবে! কে উইন্ডো সিটে বসে বাইরের দৃশ্য দেখবে, কে পেছনের সিটে রাজত্ব করবে—তা নিয়ে চলল ধুম মিষ্টি কেড়াকাড়ি ও রসিকতা। কেউ একজন রসিকতা করে বলেই বসল, "আজকে যে উইন্ডো সিট ছাড়বে, সে কালকে ক্লাসের সব অ্যাসাইনমেন্ট একাই জমা দেবে!" এমন নানা খুনসুটিতেই যাত্রা শুরু হলো।

নোয়াখালী থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দূরত্ব নেহাত কম নয়; প্রায় পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ পথচলা। পথিমধ্যে ভাদ্রের প্রখর রোদ আর গুমোট গরমের দাপটে কিছুটা হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হলেও বন্ধুদের চিরচেনা আড্ডা আর হাসির তোড়ে সেই ক্লান্তি নিমেষেই উবে গেল। মাইক্রোবাসের চার দেয়ালে জমে উঠল একের পর এক গান, স্মৃতিচারণ আর নানামুখী রসিকতা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম শুনলেই সচরাচর নানা কথা শোনা যায়, তাই যাত্রাপথে রসিকতা করে আমাদের মাঝ থেকেই কেউ একজন বলে উঠল—“আরে, এত দূর থেকে এত কষ্ট করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসলাম, অথচ এখানকার বিখ্যাত মারামারিটাই তো দেখা হলো না!”মুহূর্তেই পুরো মাইক্রোবাস জুড়ে হা-হা করে হাসির রোল উঠল। এমন সব ঠাট্টা-তামাশায় যেন ভ্রমণের সব ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।

অবশেষে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছালাম। ঘড়ির কাটায় তখন জুম্মার নামাজের সময়। আমরা সব বন্ধুরা মিলে স্থানীয় এক মসজিদে পবিত্র জুম্মার নামাজ আদায় করে নিলাম। নামাজ শেষে সোজা চলে গেলাম শুভ পরিণয়ের মূল ভেন্যু—শহরের অত্যন্ত সুপরিচিত ও আড়ম্বরপূর্ণ ‘পালকি কমিউনিটি সেন্টার’-এ।

ভেন্যুতে পৌঁছে বর ও কনে দুই পক্ষের মানুষজনের আন্তরিকতায় আমরা সত্যিই আপ্লুত হলাম। ইসরাতের বিয়ে হয়েছে এলাকার অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও সুপরিচিত 'মাস্টার বাড়ি' পরিবারে। পরিবারটির নাম যেমন চমৎকার, তাঁদের পরিচিতিও তেমনই সম্মানের। বর সাব্বির হোসাইনের বাবা (আমাদের ইসরাতের শ্বশুর), চাচা শ্বশুর থেকে শুরু করে খালা শাশুড়ি—পরিবারের মুরুব্বিদের প্রায় সকলেই শিক্ষানুরাগী এবং মহৎ শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত।

পালকি কমিউনিটি সেন্টারে আমরা প্রবেশ করতেই পরম স্নেহে আমাদের বরণ করে নেওয়া হলো। বিশেষ করে ইসরাতের বাবা ও শ্বশুড়সহ পরিবারের অন্যান্য মুরুব্বিরা নিজ থেকে আমাদের কাছে এসে পরিচিত হলেন, পরম ভালোবাসায় কুশল বিনিময় করলেন এবং আমাদের নোবিপ্রবির পড়াশোনার খোঁজখবর নিলেন। এত বড় একটা আয়োজনের ব্যস্ততার মাঝেও তাঁদের এই সৌজন্যতা ও আপন করে নেওয়ার মনোভাব এক মুহূর্তের জন্য আমাদের কাউকে পর মনে হতে দেয়নি। পরিচিতি পর্ব শেষে চমৎকার সুসজ্জিত পরিবেশে শুরু হলো রাজকীয় আপ্যায়ন। সুস্বাদু ও মুখরোচক খাবারের ভূরিভোজ আমরা সবাই তৃপ্তি সহকারে উপভোগ করলাম।

খাবার-দাবার পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো আনন্দের মূল আকর্ষণ—ছবি তোলার ধুম। নবদম্পতি সাব্বির ও ইসরাতের সাথে স্মৃতি ধরে রাখতে চলল রকমারি পোজের ফটোসেশন, ক্যাটওয়াক আর হাস্যরসে ভরা আড্ডা। কনে সাজে বন্ধু ইসরাতকে আর বর সাজে সাব্বিরকে দারুণ মানিয়েছিল। শুভকামনার ফুলঝুরি আর হাসি-ঠাট্টায় দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার কাছাকাছি চলে এলো।

বিকেলের সোনাঝরা আলো ম্লান হয়ে আসতেই বিদায়ের সুর বেজে উঠল। আনন্দময় এই সফরের ইতি টেনে প্রিয় সহপাঠী ও তাঁর জীবনসঙ্গীকে একবুক শুভকামনা জানিয়ে আমরা আবারও নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে ফিরতি পথ ধরলাম। ফিরতি পথে রাত নামার সাথে সাথে যাত্রাপথে ক্লান্তি ভর করলেও সবার মুখে ছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। দীর্ঘ রাতের পথ পেরিয়ে ঠিক রাত ১২টায় আমরা নিরাপদে নোয়াখালী ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছালাম।

পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ সফর, সিট নিয়ে খুনসুটি, ভাদ্রের গরমের ক্লান্তি আর জম্পেশ আড্ডা—সবকিছু মিলিয়ে দিনটি ছিল মূলত আমাদের সহপাঠীদের সুদৃঢ় বন্ধন ও নিখাদ বন্ধুত্বের এক অনন্য দলিল। প্রিয় বন্ধু ইসরাত জাহান ও সাব্বির হোসাইনের দাম্পত্য জীবন যেন ভালোবাসা, বোঝাপড়া আর অনাবিল সুখে ভরে থাকে—নোবিপ্রবি ফলিত গণিত পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য রইল শুভকামনা ও নিরন্তর ভালোবাসা।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com