বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়; ওরা শালুক বিক্রি করে জীবিকার তাগিদে
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম
সোহেল রানা খন্দকার, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি | ০৮ অক্টোবর ২০২৬
ঘিওর হাটে শালুকের স্তূপ নিয়ে বসেছেন মালা বিশ্বাস, মায়া বিশ্বাস ও উর্মিলা বিশ্বাস । প্রতিজনের সামনে স্তুপ করে রাখা শালুক আর দাড়িপাল্লা নিয়ে বসে আছেন তারা । তিনজনের কাছেই চটের বস্তার ভিতরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কেজি করে শালুক রয়েছে । ৪/৫ দিন ধরে খাল-বিল, নালা ও জলাশয়ে ঘুরে ঘুরে কুড়িয়ে আনা এসব শালুক বিক্রি করেই সংসারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছেন তারা । প্রতি কেজি শালুক বিক্রি করছেন ১০০ টাকা থেকে দেড়শ টাকা করে । এমনি সাধারণ শালুক ১০০ টাকা কেজি দরে । আর সিন্ধি শালুক দেড়শ টাকা কেজি দরে । সিন্ধি শালুক খেতে বেশি সুস্বাদু হওয়ায় তাই এর দাম একটু বেশি । শালুকের এই বিক্রি তাই তাদের কাছে বড় কোনো ব্যবসা নয়—বরং স্বল্প আয়ের সংসারে টিকে থাকার মৌসুমি একটি অবলম্বন ।
বুধবার মানিকগঞ্জের অন্যতম পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাটে শালুক বিক্রি করছিলেন ঘিওর উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের তেরশ্রী-সিধুনগরের এই তিন নারী । সিধুনগরে দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর বসবাস করে আসছে যুগযুগ ধরে । ঘিওর সদর ইউনিয়নের গোলাপনগর-কুঠিবাড়ি এলাকাতেও তাঁদের বসতি রয়েছে । এ ছাড়াও উপজেলার আরও কয়েকটি এলাকায় ছোট ছোট পরিসরে এই সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে ।
বর্ষার শেষের দিকে শুরু হয় শালুক সংগ্রহ । বুধবারের হাট সামনে রেখে ৪/৫ দিন ধরে বানিয়াজুরী ইউনিয়নের ক্যানাল এলাকা, নালী ইউনিয়নের বিভিন্ন জলাশয়ে এবং পাশের দৌলতপুর উপজেলার বরুরিয়া-বড়বিলাসহ বিভিন্ন জলাশয়, খাল ও বিলে ঘুরে শালুক সংগ্রহ করেন তারা ।
প্রতিজন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কেজি করে শালুক নিয়ে এসেছেন । জলাশয়ে নেমে শালুক তোলা, বাছাই করা, বহন করে হাটে আনা—সব মিলিয়ে এর পেছনে রয়েছে কয়েক দিনের শ্রম ।
মালা বিশ্বাস বলেন, ‘শালুক বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসারের প্রয়োজন মেটাই । আমাদের জন্য এটা ব্যবসা নয়, বেঁচে থাকার চেষ্টা ।’
এক হাট থেকে আরেক হাটে
ঘিওর হাটে বুধবার বিক্রির পর বৃহস্পতিবার তাদের যেতে হয় বরংগাইল হাটে । সেখানে বৃহস্পতিবার ও সোমবার—সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে । এ ছাড়াও ঘিওর বাসস্ট্যান্ড, বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ড এবং মানিকগঞ্জ জেলা শহরের বাসস্ট্যান্ড ও কাঁচাবাজারেও শালুক নিয়ে বসেন তারা ।
ঘিওর ও আশপাশের বিভিন্ন বিল, ডোবা, পুকুর ও জলাশয় থেকে বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে শালুক সংগ্রহ শুরু হয় ।
শালুক সংগ্রহকারীরা জানান, সাধারণত দুই থেকে তিন মাস চলে এই মৌসুম । ভোর কিংবা দিনের শুরুতেই কেউ কেউ জলাশয়ে নামেন । শালুক সংগ্রহের পাশাপাশি কুঁচো মাছ ধরার কাজও করেন অনেকে । পরে সেসব নিয়ে ছুটতে হয় হাট-বাজারে ।
তারা আরও জানান, শালুক সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশরাই আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর । তাদের কারও নিজস্ব জমি নেই । কেউ খাসজমিতে, কেউ অন্যের আশ্রয়ে বসবাস করেন ।
শালুকের মৌসুম শেষ হলে জীবিকার ধরনও বদলে যায় ।কেউ কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন । কেউ অফিস-আদালত বা বাসাবাড়িতে শ্রম দেন । আবার কেউ গরু, ছাগল বা ভেড়া চরিয়ে বাড়তি আয় করেন ।
*দুই/তিন মাসের আয়, বছরের প্রয়োজন*
শালুক সংগ্রহের দুই-তিন মাস কিছু পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের একটি সুযোগ তৈরি করে । এই আয় দিয়ে দৈনন্দিন খাবার, পোশাক কিংবা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন তারা ।
তবে এই মৌসুমি আয় দিয়ে সারা বছরের প্রয়োজন মেটানো কঠিন । শালুকের মৌসুম শেষ হলে অন্য কাজের ওপর নির্ভর করতে হয় । ফলে জলাশয় থেকে শালুক সংগ্রহ তাঁদের জীবিকার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং সীমিত আয়ের মধ্যে সাময়িক একটি সহায়তা ।
শালুক কুড়ানোর দলে অনেকেই রয়েছেন যাদের বয়স ৬০ থেকে ৭০ বছর বা তারও বেশি । বয়সের ভারেও শালুক সংগ্রহের কাজ শারীরিকভাবে পরিশ্রমসাধ্য । পানিতে নেমে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয় । আর পানির কামড়ে অনেকের হাত-পা সহ সারা শরীরে চুলকানি, চর্ম রোগ ও এলার্জি দেখা দেয় ।
স্থানীয় সংগ্রহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বয়স বেশি হলেও পরিবারের প্রয়োজনের কারণে কেউ কেউ এখনও মাঠ-ঘাট ও জলাশয়ে কাজ করেন শুধু পেটের দায়ে ।
কয়েকজন শালুক সংগ্রহকারী জানান, তাদের পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শাপলা-শালুক সংগ্রহ ও বিক্রি করে আসছে । জলাশয় থেকে খাবার সংগ্রহ এবং তা বিক্রি করে আয় করার এই পদ্ধতি এখনও তাদের কয়েকটি পরিবারের জীবিকার অংশ । তবে আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সরকারি সহায়তার ওপরও তাদের প্রত্যাশা রয়েছে ।
কয়েকজনের অভিযোগ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে তারা সব সময় যথেষ্ট তথ্য পান না । ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ সুবিধার বাইরে থেকে যান ।
তাদের দাবি, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা নিয়মিত খোঁজ নিলে এবং যাচাই-বাছাই করে যোগ্য ব্যক্তিদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নিলে জীবনযাপনের চাপ কিছুটা কমতে পারে ।
শালুক শুধু খাবার নয়; এটি
গ্রামবাংলার পরিচিত জলজ উদ্ভিদ শাপলার কন্দ বা রাইজোমজাতীয় অংশ শালুক নামে পরিচিত । বাংলাদেশে সাদা ও লাল শাপলার শালুক বেশি দেখা যায় । কিছু এলাকায় নীল শাপলার শালুকও পাওয়া যায় । স্বাদ ও জনপ্রিয়তার কারণে সাদা শাপলার শালুকের চাহিদা রয়েছে ।
শালুক কাঁচা, সিদ্ধ কিংবা পুড়িয়ে খাওয়া যায় । খোসা ছাড়িয়ে মাছ, শুঁটকি বা অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে রান্না করেও খাওয়া হয় । গ্রামীণ এলাকায় অনেকে এটি আলু বা মিষ্টি আলুর বিকল্প হিসেবেও খেয়ে থাকেন । পুষ্টির দিক থেকেও শালুকে শর্করা, প্রোটিন, আঁশ ও ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে । ফলে এটি শুধু মৌসুমি খাবার নয়, পুষ্টিকর খাদ্যের একটি স্থানীয় উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
*বিনা চাষের পণ্য, বিনা শ্রমের নয়*
শালুকের জন্য আলাদা করে জমিতে চাষ করতে হয় না । জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শালুক সংগ্রহ করেই বাজারজাত করা হয় । ফলে পুঁজিহীন মানুষের জন্য এটি মৌসুমি আয়ের একটি সুযোগ তৈরি করে । তবে এর পেছনে শারীরিক পরিশ্রম । জলাশয় খুঁজে বের করা, পানিতে নেমে শালুক সংগ্রহ, পরিষ্কার ও বাছাই করা, বহন করে হাটে আনা এবং বিক্রি—প্রতিটি ধাপেই সময় ও শারীরিক পরিশ্রম লাগে ।
মৌসুম, মান ও বাজারভেদে শালুকের দামও ওঠানামা করে । ফলে বিক্রি থেকে পাওয়া আয় সব সময় শ্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না । তারপরও মালা, মায়া ও উর্মিলাদের কাছে এই আয় গুরুত্বপূর্ণ ।
ঘিওর হাটে শালুকের স্তূপের সামনে তাই কেবল একটি মৌসুমি খাবারের বাজারচিত্র দেখা যায় না । এর সঙ্গে মিশে আছে কয়েক দিন ধরে খাল-বিল ও জলাশয়ে ঘুরে ঘুরে শালুক সংগ্রহের শ্রম, এক হাট থেকে আরেক হাটে ছুটে বেড়ানোর বাস্তবতা এবং সংসারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা ।
শাপলা-শালুক তাদের কাছে বড় কোনো বাণিজ্যের পণ্য নয়—জীবিকার সংকটে কয়েক মাসের জন্য পাওয়া একটি ছোট্ট অবলম্বন ।