পাবনায় পূজার মেলা ঘিরে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা: আধুনিকতার ছোঁয়ায় কমেছে মাটির পণ্যের কদর, ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিরলস পরিশ্রম
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩২ এএম
পাবনা প্রতিনিধিঃ
বছর ঘুরে আবারও আসছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। উৎসবকে ঘিরে শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই শুরু হয়েছে নানা আয়োজন। আর দুর্গাপূজার মেলা সামনে রেখে মাটির তৈরি খেলনা ও তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা।
যুগ যুগ ধরে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বসে ঐতিহ্যবাহী পূজার মেলা। বিজয়া দশমীর দিন উপজেলার বড়াল ও গুমানী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। মেলায় মাটির তৈরি আকর্ষণীয় খেলনা, গৃহস্থালি সামগ্রী ও নানা ধরনের তৈজসপত্রের চাহিদা থাকে বেশ।
এ মেলাকে ঘিরেই বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যায় মৃৎশিল্পীদের কর্মব্যস্ততা। কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ ছাঁচে তৈরি করছেন বিভিন্ন সামগ্রী। আবার কেউ তৈরি করা খেলনা শুকিয়ে তাতে রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন বাহারি নকশা। নারী-পুরুষের পাশাপাশি পরিবারের শিশুরাও এ কাজে যুক্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে ভাঙ্গুড়া পৌর শহরের কালীবাড়ি পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীরা মাটির পুতুল, হাতি, ঘোড়া, পাখি, হাঁস-মুরগি, মাটির ব্যাংক, চায়ের কাপ, পিঠা তৈরির ছাঁচ, ফুলদানি, হাঁড়ি-পাতিল, প্রদীপ, কলসসহ নানা ধরনের সামগ্রী তৈরি করছেন। শিশুদের আকৃষ্ট করতে তৈরি করা হচ্ছে হরিণ, গরু, খরগোশ, উটপাখি, বক ও টিয়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর খেলনা। পাশাপাশি নারীদের মসলা রাখার পাত্র ও দেয়ালে ঝোলানো শোপিস তৈরিতেও ব্যস্ততা দেখা গেছে।
মৃৎশিল্পীদের তৈরি এসব পণ্যে ফুটে উঠছে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও বাংলার চিরচেনা সংস্কৃতি। মাটির নিজস্ব গন্ধ আর কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি পণ্যগুলো মেলায় আসা ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সারা বছর তেমন কাজ না থাকলেও দুর্গাপূজার মেলাকে ঘিরে কিছুটা বাড়তি আয়ের আশা করেন তাঁরা।
তবে আধুনিকতার ছোঁয়া, প্লাস্টিক ও স্টিলের পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে মৃৎশিল্পীদের কর্মপরিধি। অনেকেই পেশা পরিবর্তন করলেও বংশপরম্পরায় শেখা কাজের প্রতি ভালোবাসা, ঐতিহ্যের টান ও জীবিকার প্রয়োজনে এখনো এ পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন অনেকে।
ভাঙ্গুড়া পৌর শহরের কালীবাড়ি পালপাড়ার মৃৎশিল্পী শ্রী সাধন চন্দ্র পাল বলেন, “একসময় মৃৎশিল্পীদের বেশ কদর ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন সেই কদর অনেক কমে গেছে। আমাদের আর আগের মতো সমৃদ্ধির আশা নেই। তারপরও পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা কাজের প্রতি ভালোবাসা ও শিকড়ের টানে এ পেশা ধরে রেখেছি। প্রতিবারের মতো এবারও পূজার মেলায় বিক্রির জন্য হরিণ, হাতি, গরু, ঘোড়া, খরগোশ, উটপাখি, হাঁস, বক ও টিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি করছি। প্লাস্টিক ও স্টিলের পণ্যের ভিড়েও মানুষের ভালোবাসায় আমাদের মাটির পণ্য এখনো টিকে আছে।”
কবি, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শেখ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মাটির তৈরি জিনিসের জায়গা দখল করছে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও সিরামিকের পণ্য। ফলে আধুনিক তৈজসপত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মাটির তৈরি অনেক পণ্য হারিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহ্য রক্ষায় মৃৎশিল্পের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা।
মৃৎশিল্পীরা মনে করেন, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এতে একদিকে যেমন বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য টিকে থাকবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।