ব্যাথানাশক যখন প্রাণনাশক হয়ে উঠে তখন আমাদের করণীয় কি?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

মোঃ মিলন শাহ, বিশেষ প্রতিনিধি পত্নীতলা, নওগাঁ:

জীবন বাঁচানো কিংবা অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্যতম হাতিয়ার হলো ঔষধ। কিন্তু সেই ঔষধই যখন নেশার প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা কেবল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাতপই বিপদ সংকেত নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক অশনিসংকেত । সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এমনই এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে ব্যথানাশক ঔষধ ‘ট্যাপেন্টাডল’ (Tapentadol)।

ট্যাপেন্টাডল (Tapentadol) বড়ি বা ট্যাবলেটের প্রধান সক্রিয় উপাদান হলো ট্যাপেন্টাডল হাইড্রোক্লোরাইড । এটি একটি কৃত্রিম বা সিন্থেটিক ওপিওয়েড জাতীয় উপাদান, যা তীব্র ও মাঝারি ধরনের ব্যথা উপশমে ব্যবহৃত হয়।একটি বাণিজ্যিক ট্যাপেন্টাডল বড়িতে দুই ধরনের উপাদান থাকে: 

 

 সক্রিয় উপাদান

ট্যাপেন্টাডল হাইড্রোক্লোরাইড: এটি সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কাজ করে ব্যথার অনুভূতি কমিয়ে দেয়। ব্যাথা ও বয়সের উপর নির্ভর করে বাজারে ৫০ mg, ৭৫ mg এবং ১০০ mg শক্তির ট্যাবলেট পাওয়া যায়। 

 

 নিষ্ক্রিয় উপাদান

বড়িটি তৈরি, জমাট বাঁধা এবং শরীরে সহজে শোষিত হওয়ার জন্য সক্রিয় উপাদানের সাথে কিছু নিষ্ক্রিয় রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয়। যেমন: 

মাইক্রোক্রিস্টালাইন সেলুলোজ, ল্যাকটোজ মনোহাইড্রেট, 

ক্রোসকারমেলোজ সোডিয়াম, পোভিডোন, ম্যাগনেসিয়াম স্টিয়ারেট এবং ওপাড্রি (ট্যাবলেটের ওপরের পাতলা রঙিন প্রলেপ )।

♦ ট্যাপেন্টাডল বড়িটি মাদক জাতীয় আসক্তি তৈরি করে, যা হিরোইন বা মরফিনের সমতুল্য। এটি মস্তিষ্কের "রিওয়ার্ড সিস্টেম" বা আনন্দ কেন্দ্রে কৃত্রিম উদ্দীপনা তৈরি করে।

♦ এই বড়ি সেবনে মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর ফলে সাময়িক তীব্র আনন্দ, শিথিলতা এবং এক ধরণের অবাস্তব সুখের অনুভূতি তৈরি হয়। মাদকসেবীরা বারবার এই কৃত্রিম সুখের অনুভূতি পাওয়ার জন্য ওষুধটি সেবন করতে থাকে।

♦ নিয়মিত সেবনের ফলে এক সময় শরীরের ওপর আগের মাত্রার ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়।তাই প্রথমে ৫০ mg দিয়ে শুরু করলেও পরে তা ৩০০ mg তে ঠেকে।

♦ দীর্ঘদিন সেবনের পর হঠাৎ এই ওষুধ বন্ধ করে দিলে শরীরে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফলে প্রচণ্ড শরীর ব্যথা, অনিদ্রা, বমি ভাব, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত ঘাম, অস্থিরতা এবং তীব্র মানসিক অবসাদ দেখা দেয়। এই কষ্ট থেকে বাঁচতে আসক্ত ব্যক্তি বাধ্য হয়ে আবার ওষুধটি গ্রহনের জন্য মরিয়া হয়ে পড়ে ।

♦ এই নেশা করার ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে থাকে। লিভার ও কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অতিরিক্ত ডোজে শ্বাসকষ্ট হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

♦ ইয়াবা বা অন্যান্য নিষিদ্ধ মাদকের বিকল্প হিসেবে এই ক্ষতিকর পেইনকিলারের সহজলভ্যতা তরুণ সমাজকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

♦ ​ট্যাপেন্টাডলের মূল আকর্ষণ হলো এর ‘সহজলভ্যতা’ ও ‘নিরাপদ ছদ্মবেশ’। ফার্মেসিগুলোতে কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই খোলামেলাভাবে এটি বিক্রি হয়। উপরন্তু, পুলিশের চোখ এড়িয়ে এটি বহন করা বা পকেটে রাখা অত্যন্ত সহজ। ইয়াবার চড়া দাম ও কঠোর নজরদারির বিপরীতে এই সস্তা ও সহজেই পাওয়া যাওয়া ট্যাবলেটটি হয়ে ওঠেছে আসক্তদের প্রধান পছন্দ।

♦ পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বাংলাদেশ সরকার ট্যাপেন্টাডলকে 'ক' শ্রেণীর মাদকদ্রব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এর উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আইনগতভাবে এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও জরুরি পদক্ষেপ ।​ তবে যেকোনো ঔষধ যখন নিষিদ্ধ হয়, তখন যদি এর পেছনের মূল কারণ—যেমন ওষুধের যথেচ্ছ বিক্রি, অবৈধ চোরাচালান এবং ফার্মেসিগুলোর অসাধু মানসিকতা বন্ধ না করা যায়—তবে আসক্তরা নতুন কোনো বিকল্প হিসেবে এটিকে বেছে নেয়। ট্যাপেন্টাডল নিষিদ্ধ হওয়ার পর বাজার থেকে হয়তো এটি অনেকটাই দূর হয়েছে, তবে অন্যান্য প্রেসক্রিপশন ড্রাগ (যেমন- ট্রামাডল বা অন্যান্য সিডেটিভ) একই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে ।

​এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ :

​ফার্মেসীগুলোতে চিকিৎসকের সিলযুক্ত ও নিবন্ধিত প্রেসক্রিপশন ছাড়া যেকোনো ধরণের ব্যথানাশক বা সিডেটিভ ঔষধ বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। 'নো প্রেসক্রিপশন, নো ড্রাগ' নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

পরিবারকে লক্ষ্য রাখতে হবে সন্তানের চলাফেরা ও আচরণের ওপর। হুট করে ওষুধে আসক্ত হয়ে পড়া তরুণদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো ধরে ফেলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

 কেবল ট্যাপেন্টাডল নয়, ঔষধের ছদ্মবেশে বাজারে থাকা সব ধরনের ক্ষতিকর ড্রাগের ওপর নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বড় দায়িত্ব।

 ​ট্যাপেন্টাডল কেবল একটি ঔষধের নাম নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্যে ও ওষুধ বিপণন ব্যবস্থার ফাঁকফোকরের এক জীবন্ত উদাহরণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদকে যাতে কেউ অভিশাপে পরিণত করতে না পারে, সেজন্য কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতাই হতে পারে একমাত্র কার্যকর প্রতিষেধক।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com