ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া-মিসর উত্তেজনায় আফ্রিকান ইউনিয়নের সতর্কতা: সংকটের পরবর্তী ধাপ কী?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৫ এএম
বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার, ৩ অক্টোবর ২০২৬।
আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া ও মিসরের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকায় আফ্রিকান ইউনিয়ন (AU) সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। ১ অক্টোবর দেওয়া এক বিবৃতিতে AU কমিশন তিন দেশকে উত্তেজনা বাড়াতে পারে—এমন পদক্ষেপ ও বক্তব্য থেকে বিরত থেকে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর আহ্বান জানায়।
এই সতর্কবার্তার পেছনে রয়েছে গত কয়েক দিনের দ্রুত কূটনৈতিক অবনতি। ১ অক্টোবর ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়ার রাজধানী আসমারায় তাদের দূতাবাস বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১০ জন ইরিত্রীয় কূটনীতিককে ‘persona non grata’ ঘোষণা করে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। এর জবাবে ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার সঙ্গে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। একই সময়ে ইথিওপিয়া একজন মিসরীয় কূটনীতিককে বহিষ্কার করলে কায়রোও একজন ইথিওপীয় কূটনীতিককে বহিষ্কার করে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে উত্তর ইথিওপিয়ার তিগ্রাই অঞ্চলে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত। রয়টার্সের ২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় বাহিনী ও তাদের মিত্ররা তিগ্রাইয়ের রাজধানী মেকেলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তিগ্রাইয়ের একটি সশস্ত্র জোট মেকেলের কাছাকাছি মিলাজাত দখলের দাবি করেছে। সংঘাতের এই নতুন পর্যায় ২০২০-২০২২ সালের ভয়াবহ যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আদ্দিস আবাবা ইরিত্রিয়া, মিসর ও সুদানের বিরুদ্ধে তিগ্রাইয়ের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটকে সহায়তার অভিযোগ তুলেছে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে তিগ্রাইয়ের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইথিওপিয়া ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে পরিবর্তিত জোট ও স্বার্থের সংঘাত তিগ্রাইয়ের যুদ্ধকে সীমান্তের বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্কের অবনতির পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লোহিত সাগরে ইথিওপিয়ার প্রবেশাধিকার। সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ ও সমুদ্রপথে প্রবেশ নিয়ে আদ্দিস আবাবার আগ্রহ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের উদ্বেগকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। অন্যদিকে ইথিওপিয়া ও মিসরের মধ্যে নীল নদের পানি এবং গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম (GERD) নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। এসব বিষয় তিগ্রাইয়ের নতুন সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আঞ্চলিক কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের বার্তাটি মূলত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের দিকে কেন্দ্রীভূত। AU কমিশন বলেছে, তিন দেশকে প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে কমিশন জানিয়েছে, উত্তেজনা কমানো, সংলাপ এগিয়ে নেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টায় প্রয়োজন হলে তারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
সংকটের পরবর্তী ধাপ অনেকটাই নির্ভর করবে কূটনৈতিক সম্পর্কের এই অবনতির পাশাপাশি তিগ্রাইয়ের যুদ্ধ কতটা বিস্তৃত হয় তার ওপর। ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া সরাসরি উত্তেজনা কমানোর সুযোগ সংকুচিত করতে পারে। একই সঙ্গে মিসরকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে নীল নদের পানি, লোহিত সাগর এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—তিনটি পৃথক বিরোধ একই ভূরাজনৈতিক সংকটে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
এখন পর্যন্ত আফ্রিকান ইউনিয়ন সামরিক সমাধানের বদলে সংলাপ ও যোগাযোগ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে। তবে তিগ্রাইয়ে লড়াই অব্যাহত থাকা এবং ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতার সুযোগ কতটা কার্যকর হয় তার ওপর। এই কারণেই AU-এর সতর্কবার্তা এখন শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি হর্ন অব আফ্রিকার একটি সম্ভাব্য বৃহত্তর সংকট ঠেকাতে দ্রুত সংলাপের আহ্বান হিসেবেও সামনে এসেছে।