বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তার অর্থসংকট: যুদ্ধ বাড়ছে, কমছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তা
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৬ এএম
বিশেষ প্রতিনিধিঃ সঞ্জয় মজুমদার, ১ অক্টোবর ২০২৬।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি অব্যাহত থাকলেও মানবিক সহায়তার অর্থায়ন দ্রুত কমে যাওয়ায় এ বছর ৮৩ লাখ শরণার্থী, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ও রাষ্ট্রহীন মানুষের জন্য জরুরি সুরক্ষা ও সহায়তা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR সতর্ক করেছে, অর্থের ঘাটতি ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় বাস্তুচ্যুতি সংকটে সুরক্ষা কাঠামো দুর্বল করে দিচ্ছে।
UNHCR-এর তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির আয় ২০২৪ সালের ৫.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ২০২৫ সালে কমে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ২০২৬ সালের প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৩২ শতাংশ জুলাইয়ের শেষ নাগাদ পাওয়া গেছে। একই সময়ে বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে রয়েছে। UNHCR-এর ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, শুধু শরণার্থীর সংখ্যাই ছিল ৪ কোটি ১৬ লাখ।
UNHCR-এর বহির্বিষয়ক সম্পর্ক বিভাগের পরিচালক ডমিনিক হাইড ২৯ সেপ্টেম্বর জেনেভায় বলেন, অর্থসংকটের কারণে কিছু এলাকায় পুরো সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাদে ৩ লাখ ১৯ হাজার শরণার্থীর নিবন্ধন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইথিওপিয়ায় প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার শিশু শিশু সুরক্ষা সেবা হারাতে পারে এবং প্রায় ২ লাখ নারী ও কিশোরী নিরাপদ স্থান ও সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অর্থের ঘাটতি শুধু খাদ্য বা আশ্রয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে না। বাস্তুচ্যুত মানুষ নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর পর তাদের পরিচয়পত্র, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন সদস্যদের খোঁজ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মানসিক সহায়তা, কর্মসংস্থান এবং সহিংসতা থেকে সুরক্ষার প্রয়োজন হয়। এসব ব্যবস্থা দুর্বল হলে নিরাপদ এলাকায় পৌঁছানোর পরও মানুষ নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই অর্থসংকটের গুরুত্ব আরও বেশি। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে UNHCR-এর হাইকমিশনার বারহাম সালেহ বলেন, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় পরিবেশ বর্তমানে নেই। তিনি আরও বলেন, মানবিক সহায়তার সম্পদ কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকটের প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে সীমার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে এই অর্থসংকটের প্রভাব বোঝা যায় ২০২৬ সালের রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা থেকেও। জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থাগুলো চলতি বছরের জন্য ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবেদন করেছে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। এই অর্থ কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সহায়তার আওতায় রাখার কথা বলেছে।
কক্সবাজারে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল কারণ সেখানে এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে এবং খাদ্য, পানি, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে তারা ব্যাপকভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। UNHCR বলছে, ক্যাম্পগুলোর ঘনবসতি এবং ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও এই জনগোষ্ঠীর দুর্বলতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থসংকটের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি সমস্যা হলো নতুন সংঘাত দেখা দিলে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাওয়া। UNHCR জানিয়েছে, গত বছর সংস্থাটি কর্মীসংখ্যা ৩৩ শতাংশ কমিয়েছে এবং ১৪০টি কার্যালয় বন্ধ করেছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য বাঁধা অর্থের অংশ বেড়েছে। সংস্থাটির মতে, নমনীয় অর্থায়ন কমে গেলে নতুন কোনো সংকট হঠাৎ তীব্র হওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত অর্থ ও কর্মী সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এর প্রভাব প্রত্যাবাসনেও পড়তে পারে। UNHCR জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এক মিলিয়নের বেশি আফগান দেশে ফিরেছেন বা ফেরত পাঠানো হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাবাসন সহায়তার পরিমাণ কমেছে। সংস্থাটির বক্তব্য, প্রত্যাবাসনের পর প্রাথমিক সহায়তা না থাকলে মানুষ নতুন করে অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন সামনে রয়েছে। মিয়ানমারে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বৃহৎ পরিসরে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা সীমিত। এর মধ্যে যদি আন্তর্জাতিক সহায়তা আরও কমে যায়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের ওপর আর্থিক ও সামাজিক চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও সুরক্ষা কর্মসূচি সংকুচিত হলে ক্যাম্পের ভেতরে ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। UNHCR-এর ভাষায়, মানবিক সহায়তার অর্থ কমে গেলেও মানুষের প্রয়োজন কমে যায় না।
বিশ্বজুড়ে তাই মানবিক সংকটের একটি নতুন বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে—যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি অব্যাহত থাকলেও সেই সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক অর্থ কমছে। ২০২৬ সালের বাকি সময়ে অর্থায়ন বাড়ানো না গেলে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে আরও কঠিন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হতে পারে। আর বাংলাদেশসহ যেসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে আসছে, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার ধারাবাহিকতা এখন মানবিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি একটি বড় কূটনৈতিক ও আর্থিক প্রশ্ন হয়ে উঠছে।