ভূমি সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধ ও বাস্তবতা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম

জমি শুধু মাটির একটি টুকরো নয়। বাংলাদেশের পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জমি অনেক সময় উত্তরাধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তাই একটি জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ কখনো শুধু কাগজপত্রের বিরোধ থাকে না; তা ধীরে ধীরে ভাই-বোনের সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধন, প্রতিবেশীসুলভ সৌহার্দ্য এমনকি একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের শান্তিও নষ্ট করতে পারে।

দেশের প্রায় প্রতিটি সমাজেই কম-বেশি ভূমি বিরোধের চিত্র দেখা যায়। বিশেষ করে পিতা-মাতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি বণ্টন, ওয়ারিশের অংশ নির্ধারণ, নামজারি, পুরোনো দলিল, খতিয়ান, দখল, সীমানা কিংবা জমি বিক্রির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের একজন সদস্য অন্যদের না জানিয়ে জমি নিজের নামে নামজারি করেন, কেউ উত্তরাধিকারীদের অংশ অস্বীকার করেন, আবার কেউ দীর্ঘদিনের দখলকে মালিকানার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে দাবি করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ কাগজপত্র, জাল দলিল কিংবা পারিবারিক অবিশ্বাস।

ফলে যে জমি একসময় পরিবারের ঐক্যের প্রতীক ছিল, সেটিই কখনো কখনো বিভেদের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

ভূমি আইন একটিমাত্র নয়

বাংলাদেশে ভূমি-সংক্রান্ত বিষয় একটি মাত্র আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। জমির মালিকানা, হস্তান্তর, নিবন্ধন, রেকর্ড, জরিপ, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, অধিগ্রহণ, দখল ও ভূমি অপরাধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিভিন্ন আইন ও বিধি প্রযোজ্য।

এর মধ্যে State Acquisition and Tenancy Act, 1950, Transfer of Property Act, 1882, Registration Act, 1908, Limitation Act, 1908, Partition Act, 1893, Specific Relief Act, 1877, Survey Act, 1875, Non-Agricultural Tenancy Act, 1949, স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭, ভূমি সংস্কার আইন, ২০২৩ এবং ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩সহ বিভিন্ন আইন ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি আইনভান্ডারেও ২০২৩ সালের ভূমি সংস্কার আইন ও ২০১৭ সালের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইনসহ বিভিন্ন আইন তালিকাভুক্ত রয়েছে।

অর্থাৎ, কোনো জমি নিয়ে বিরোধ হলেই একটি নির্দিষ্ট আইন বা একটি নির্দিষ্ট আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যায়—বিষয়টি এত সরল নয়। বিরোধের প্রকৃতি, দলিলপত্র, দখল, রেকর্ড, উত্তরাধিকার এবং দাবির ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত আইনি পথ নির্ধারণ করতে হয়।

 

উত্তরাধিকারীর অধিকার অস্বীকারের ঝুঁকি

পারিবারিক ভূমি বিরোধের অন্যতম বড় ক্ষেত্র হলো উত্তরাধিকার। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে কার কতটুকু অধিকার সৃষ্টি হবে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার আইন ও অন্যান্য প্রযোজ্য বিধানের আলোকে নির্ধারিত হয়।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কোনো কোনো পরিবারে একজন উত্তরাধিকারী অন্যদের বাদ দিয়ে পুরো সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। কখনো ওয়ারিশদের তথ্য গোপন করে, কখনো মিথ্যা তথ্য দিয়ে, আবার কখনো দলিলের অপব্যবহার করে জমি হস্তান্তরের চেষ্টা করা হয়।

এ ধরনের ঘটনায় শুধু পারিবারিক নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফৌজদারি আইনের প্রশ্নও তৈরি হতে পারে।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ধারা ৪-এ অন্যের মালিকানাধীন ভূমিকে নিজের মালিকানাধীন হিসেবে প্রচার, তথ্য গোপন করে ভূমি হস্তান্তর, অনুমতি ছাড়া অন্যের ভূমি হস্তান্তর এবং কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা তথ্য দেওয়াসহ বিভিন্ন কার্যকে ভূমি প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধারার অপরাধের জন্য অনধিক সাত বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

একই আইনের ধারা ৫-এ ভূমি-সংক্রান্ত জালিয়াতির বিভিন্ন ধরন—যেমন মিথ্যা দলিল প্রস্তুত বা প্রতারণামূলকভাবে দলিল পরিবর্তন—অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এখানেও অনধিক সাত বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—শুধু নামজারি অন্য কারও নামে হয়ে গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তিনি বৈধ মালিক হয়ে যান না, আবার শুধু কোনো খতিয়ানে নাম থাকলেই সব পরিস্থিতিতে মালিকানার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। মালিকানা নির্ধারণে দলিল, উত্তরাধিকার, পূর্ববর্তী স্বত্ব, রেকর্ড, দখল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচ্য হতে পারে। তাই ভূমি বিরোধে কাগজপত্র যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিপজ্জনক।

 

দখল হারালে কী করবেন?

ভূমি বিরোধে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো দখল। অনেক সময় একজন উত্তরাধিকারী বলেন—“জমি আমার, কিন্তু দখল অন্যের।” অন্যদিকে দখলদার পক্ষ বলতে পারেন—“আমরাই দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে আছি।”

এখানে আবেগ দিয়ে নয়, আইনের পথে এগোনো জরুরি।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ধারা ৭ অনুযায়ী, আইনানুগ মালিকানা বা দখলের অধিকার ছাড়া অন্যের ভূমি নিজের দখলে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে আইনানুগভাবে দখলের অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া উচ্ছেদ বা দখলচ্যুত করাও নিষিদ্ধ। এ বিধান লঙ্ঘনের জন্য অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারা ৮। কেউ যদি আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া তার দখলীয় ভূমি থেকে উচ্ছেদ বা দখলচ্যুত হন, তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন করতে পারেন। আইন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় তদন্ত ও উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের পর উপযুক্ত ক্ষেত্রে পূর্বদখল পুনর্বহালের আদেশ দেওয়া যেতে পারে। আবেদন পাওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধানও রাখা হয়েছে।

তবে একই বিষয়ে দেওয়ানি আদালতে দখল পুনরুদ্ধারের মামলা বিচারাধীন থাকলে ধারা ৮-এর অধীনে একই সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনে বিশেষ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই মামলা করার আগে অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে উপযুক্ত ফোরাম নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

জাল দলিল হলে বিষয়টি আরও গুরুতর

জমি নিয়ে বিরোধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় হলো জাল দলিল বা প্রতারণামূলক দলিলের ব্যবহার। কারণ একটি মিথ্যা দলিলের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে নামজারি, বিক্রি, দখল কিংবা অন্য কোনো লেনদেনের চেষ্টা করা হলে বিরোধ আরও জটিল হয়ে ওঠে।

আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি অপরাধ। আর ধারা ১৯ অনুযায়ী ধারা ৪ ও ৫-এর অপরাধ অ-জামিনযোগ্য; আইনের অন্যান্য অপরাধ জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য। এসব অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হয় এবং আইন অনুযায়ী মামলা পাওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে।

তবে ফৌজদারি মামলা করলেই যে দেওয়ানি মালিকানা-বিরোধের সবকিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। কোনো দলিল বাতিল, স্বত্ব ঘোষণা, বাটোয়ারা বা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মতো প্রতিকারের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ারও বিবেচনায় নিতে হয়।

 

নামজারি মানেই মালিকানার শেষ কথা নয়

ভূমি বিরোধে “নামজারি” শব্দটি প্রায়ই ভুলভাবে ব্যবহৃত হয়। কেউ নামজারি করলেই তিনি সব পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত মালিক হয়ে গেলেন—এমন ধারণা আইনগতভাবে সরলীকৃত।

নামজারি মূলত ভূমি রেকর্ডে মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। উত্তরাধিকার, ক্রয়, দান বা অন্যান্য বৈধ হস্তান্তরের পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় নামজারি করা গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি মন্ত্রণালয় ই-নামজারি ব্যবস্থাও পরিচালনা করছে।

তাই কোনো পরিবারের জমি নিয়ে বিরোধ হলে প্রথমেই দেখতে হবে—সর্বশেষ খতিয়ান কী বলছে, পূর্ববর্তী খতিয়ানগুলো কী ছিল, মূল দলিল কোথায়, উত্তরাধিকার কারা, কোনো বণ্টন বা হস্তান্তর হয়েছে কি না, ভূমি উন্নয়ন কর কে দিয়েছেন এবং বাস্তব দখল কার।

 

কাগজপত্র সংরক্ষণই প্রথম প্রতিরক্ষা

ভূমি বিরোধে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো কাগজপত্রের অনুপস্থিতি। অনেক পরিবারে বছরের পর বছর জমি ভোগদখলে থাকলেও দলিল, খতিয়ান, নামজারি, দাখিলা কিংবা উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত কাগজপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।

একজন সচেতন ভূমিমালিকের উচিত—

প্রথমত, মূল দলিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিরাপদে রাখা।

দ্বিতীয়ত, CS, SA, RS, BS/BRS বা প্রযোজ্য সর্বশেষ খতিয়ানের তথ্য যাচাই করা।

তৃতীয়ত, জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, মৌজা, জমির পরিমাণ ও শ্রেণি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা।

চতুর্থত, উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেলে ওয়ারিশান সনদ, মৃত্যু সনদ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজপত্র সংরক্ষণ করা।

পঞ্চমত, নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা সংরক্ষণ করা।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাপনা অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে এবং ভূমিসেবার বিভিন্ন অংশ—মিউটেশন, ভূমি উন্নয়ন কর, রেকর্ড ও ম্যাপসহ—ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।

 

মামলা নয়, সমাধানও ভাবতে হবে

ভূমি বিরোধ দেখা দিলেই প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়—“মামলা করব।” কিন্তু মামলা করার আগে একটি প্রশ্ন করা দরকার—এই বিরোধ কি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব?

পারিবারিক জমির বিরোধে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আদালতের রায় একজনকে স্বত্ব দিতে পারে, কিন্তু ভেঙে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্ক সবসময় ফিরিয়ে দিতে পারে না।

দুই ভাইয়ের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ হলো। মামলা চলল পাঁচ বছর, দশ বছর। এ সময়ের মধ্যে দুই পরিবার পরস্পরের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করল। সন্তানদের মধ্যেও সম্পর্ক নষ্ট হলো। আইনজীবীর ফি, আদালতে যাতায়াত, সময় এবং মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে বিরোধের মূল্য জমির বাজারমূল্যের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়াল।

অথচ শুরুতেই যদি উভয় পক্ষ বসে দলিলপত্র সামনে রাখতেন, একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা নিতেন এবং আইনসম্মত সমাধানে সম্মত হতেন, তাহলে হয়তো দীর্ঘ সংঘাতের প্রয়োজন হতো না।

মধ্যস্থতার মূল শক্তি এখানেই—এটি পক্ষগুলোকে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার এবং নিজেদের সম্মতিতে সমাধানে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়। তবে মধ্যস্থতা সব ধরনের বিরোধে বা সব পর্যায়ে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। যেখানে জালিয়াতি, অপরাধ, জোরপূর্বক দখল বা জটিল স্বত্বের প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রতিকার গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।

 

আপস মানে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়

আমাদের সমাজে আপস শব্দটি অনেক সময় ভুলভাবে বোঝা হয়। কেউ মনে করেন, আপস মানেই নিজের অধিকার ছেড়ে দেওয়া। আসলে আইনসম্মত মধ্যস্থতা বা সমঝোতার উদ্দেশ্য হলো—বিরোধকে এমনভাবে নিষ্পত্তি করা, যাতে পক্ষগুলোর আইনসম্মত স্বার্থ যতটা সম্ভব রক্ষা পায়।

তবে কোনো পক্ষকে ভয় দেখিয়ে, চাপ দিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে আপসে বাধ্য করা কখনোই গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়।

বিশেষ করে উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে বণ্টন বা সমঝোতা করার আগে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর আইনগত অংশ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে আইনজীবী, ভূমি বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া উচিত।

 

কোথায় যাবেন—তা জানা জরুরি

ভূমি বিরোধে একটি বড় ভুল হলো সব সমস্যার জন্য একই জায়গায় ছুটে যাওয়া।

কোনো বিষয় নামজারি বা রেকর্ড সংশোধনসংক্রান্ত হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হতে পারে। দখলচ্যুতির নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ধারা ৮ অনুযায়ী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। আবার স্বত্ব ঘোষণা, দলিল বাতিল, বাটোয়ারা, স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বা অন্যান্য দেওয়ানি প্রতিকারের জন্য দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার বিবেচনা করতে হয়। অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ থাকলে ফৌজদারি আইনের প্রতিকারও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

অর্থাৎ, একটি জমির জন্য একাধিক আইনি প্রশ্ন থাকতে পারে; আর প্রতিটি প্রশ্নের প্রতিকারও এক নয়।

 

আইনের পাশাপাশি প্রয়োজন পারিবারিক বিবেক

ভূমি বিরোধের সবচেয়ে করুণ দিক হলো—অনেক সময় সম্পত্তি থেকে যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, বিরোধের কারণে সেই সম্পত্তিই পরিবারের জন্য আর্থিক বোঝা হয়ে ওঠে।

ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বোন বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেন। চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়। বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানদের বিরোধে অসহায় হয়ে পড়েন। সন্তানরা উত্তরাধিকার হিসেবে যে সম্পদ পাওয়ার কথা, সেই সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে তাদের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

একসময় প্রশ্ন জাগে—জমি কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ জমির জন্য?

অধিকার অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। অন্যায় দখল, জালিয়াতি, প্রতারণা বা জবরদখল কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু অধিকার রক্ষার অর্থ প্রতিটি বিরোধকে শত্রুতায় পরিণত করা নয়। আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিবেক, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

 

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

ভূমি নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ার পর দৌড়ানোর চেয়ে বিরোধ যাতে তৈরি না হয়, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পিতা-মাতা জীবিত থাকতেই সম্পত্তির কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা, উত্তরাধিকারীদের অধিকার সম্পর্কে পরিবারকে অবহিত করা, প্রয়োজনীয় বণ্টন বা হস্তান্তর আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করা, দলিল রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি যথাযথভাবে করা এবং জমির রেকর্ড নিয়মিত যাচাই করা—এসব ছোট ছোট সচেতনতা ভবিষ্যতের বড় বিরোধ ঠেকাতে পারে।

আর বিরোধ তৈরি হলে আবেগের বদলে প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। হুমকি বা সংঘর্ষের বদলে আইনজীবীর পরামর্শ নিতে হবে। জোর করে দখল নেওয়ার বদলে আইনানুগ প্রতিকার চাইতে হবে। কারণ নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে শক্তিশালী পথ হলো আইনকে হাতে তুলে না নিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর উদ্দেশ্যের মধ্যেই ভূমি-সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধ, অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং ভূমি বিরোধ দ্রুত নিরসনের বিষয়টি রয়েছে। ২০২৪ সালে এ আইনের অধীনে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিধিমালা, ২০২৪ জারি হয়েছে, ফলে আইনের প্রয়োগের জন্য একটি বিধিবদ্ধ কাঠামোও তৈরি হয়েছে।

 

শেষ কথা

জমি নিয়ে বিরোধ একটি পরিবারের ভেতরের বিষয় হলেও এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যায়। একটি মামলা শুধু দুই ব্যক্তিকে নয়, দুই পরিবারকে আলাদা করে দিতে পারে। আবার একটি সুষ্ঠু সমঝোতা শুধু একটি জমির বিরোধ মেটায় না—রক্ষা করতে পারে একটি পরিবারের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক স্থিতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

তাই ভূমি বিরোধে প্রথম প্রয়োজন সঠিক তথ্য, দ্বিতীয় প্রয়োজন সঠিক কাগজপত্র, তৃতীয় প্রয়োজন সঠিক আইনি পরামর্শ এবং চতুর্থ প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক ফোরামে প্রতিকার চাওয়া।

অন্যায় হলে নীরব থাকা নয়; আবার অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে সংঘাতে জড়ানোও নয়।

আইনকে জানতে হবে, প্রমাণকে সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হতে হবে।

কারণ জমির সীমানা কাগজে আঁকা যায়, কিন্তু একটি পরিবারের ভাঙা সম্পর্কের সীমানা সবসময় কাগজে মেরামত করা যায় না।

সুতরাং ভূমি বিরোধের প্রকৃত সমাধান শুধু জমি কে পেলেন—এ প্রশ্নে নয়; বরং ন্যায়সংগত অধিকার কীভাবে রক্ষা করা গেল এবং পারিবারিক সম্পর্ক যতটা সম্ভব কীভাবে অক্ষুণ্ন রাখা গেল—সেই প্রশ্নের উত্তরেই নিহিত।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান,সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com