স্বপ্ন ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জয়: হাসপাতালের বেড থেকে মাদারীপুরের তাইজুল এখন বিচারকের আসনে
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৯ পিএম
নাজমুল হাসান, মাদারীপুর:
পিতৃহীন শৈশব, অভাবের নির্মম কষাঘাত, আর দুটি কিডনিই অকেজো হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনযুদ্ধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এস এম তাইজুল ইসলাম। জীবনের কঠিন সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে অবশেষে মায়ের পরম আকুলতা ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জয় হলো। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সারা দেশে ১২০তম স্থান অর্জন করে সহকারী জাজ (সিভিল জাজ) হিসেবে নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব আলীপুর গ্রামের এই অদম্য তরুণ।
মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারান তাইজুল। স্বামীহারা মা হাওয়া বেগম তিন সন্তান নিয়ে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। অভাবের সংসারে একদিকে খাবারের সংকট, অন্যদিকে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানো—সবকিছুর মাঝেও মা হাওয়া বেগমের একটিই স্বপ্ন ছিল, ছেলেকে একদিন বিচারকের আসনে দেখবেন। মায়ের সেই বিশ্বাস আর নিজের অধ্যবসায়ের জোরেই আজ মাদারীপুরের মুখ উজ্জ্বল করেছেন তাইজুল।
জীবনের প্রতিটি ধাপেই মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন এস এম তাইজুল ইসলাম। ২০০৮ সালে আলীপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস পান তিনি। এরপর রাজধানী ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকেও (এইচএসসি) জিপিএ-৫ অর্জন করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৫৮তম স্থান অর্জন করে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে ২০১৫ সালে এলএলবি (সম্মান) এবং ২০১৮ সালে এলএলএম সম্পন্ন করেন।
তবে সাফল্যের এই সোজা পথে হঠাৎ করেই নেমে আসে ঘন অন্ধকার। ২০১৩ সাল থেকেই শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তাইজুল। ২০১৫ সালে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, তাঁর দুটি কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত ডায়ালাইসিস আর দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
চিকিৎসার খরচ ধরা হয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে এত বিপুল অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা পরিবারটির পক্ষে অবাস্তব এক কল্পনার মতোই ছিল। তবে হাল ছাড়েননি স্বজনেরা। চিকিৎসকের বেডে শুয়ে যখন জীবনের জন্য লড়াই করছিলেন তাইজুল, তখন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন তাঁর বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও অজস্র শুভাকাঙ্ক্ষী। মা হাওয়া বেগমও ছেলের প্রাণ রক্ষায় নিজের সামর্থ্যের শেষবিন্দু দিয়ে লড়াই করেন। সর্বস্তরের মানুষের সহমর্মিতায় অবশেষে চিকিৎসার অর্থ সংস্থান হয়। ২০১৭ সালে ভারতে সফলভাবে তাইজুলের কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করা হয়।
দীর্ঘ শারীরিক ক্লান্তি, নিয়মিত ওষুধ সেবন আর হাসপাতালের জীবন পেরিয়ে তাইজুল ফেরেন তাঁর স্বপ্নের পড়াশোনায়। শেষ পর্যন্ত ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিচারক হিসেবে উত্তীর্ণ হন।
তাইজুলের এই অভাবনীয় সাফল্যে আবেগাপ্লুত পুরো কালকিনি। তাঁর চাচাতো ভাই মনির বলেন, "তাইজুলের এই সফলতা আমাদের পরিবারের কাছে এক অলৌকিক আনন্দের মতো। ও যেভাবে লড়াই করে আজ এই জায়গায় পৌঁছেছে, তা ভাবলেই চোখে জল আসে।"
এলাকার বয়োবৃদ্ধ রহিম খান বলেন, "একসময় যে ছেলেটি বাঁচবে কি না তা নিয়েই আমরা শঙ্কায় ছিলাম, আজ সেই তাইজুল শুধু তাঁর পরিবার নয়, আমাদের পুরো গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছে।"
ছেলের এই জয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মা হাওয়া বেগম বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর এই সন্তানদের মানুষ করতে যে কতটা কষ্ট করেছি, তা শুধু ওপরওয়ালাই জানেন। আমার জীবনের একটাই সাধ ছিল—আমার ছেলে একদিন জজ হবে। আজ আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, আমার সব কষ্ট সার্থক।”
নিজের এই দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করে নবনিযুক্ত বিচারক এস এম তাইজুল ইসলাম বলেন, “একদিকে বেঁচে থাকার আকুতি, অন্যদিকে ক্যারিয়ার ধসে পড়ার ভয়—সবকিছু যেন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি কখনো মনের জোর হারাইনি, হাল ছাড়িনি। মা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসায় আমি জীবনের নতুন আলো পেয়েছি।”
হাসপাতালের ডায়ালাইসিস বেড থেকে যে তরুণের একমাত্র আকুতি ছিল—“আমি বাঁচতে চাই”, কঠিন সেই সংগ্রাম জয় করে তিনি আজ সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বে। অভাব, রোগ আর মৃত্যুকে জয় করা তাইজুলের এই জীবনের গল্প যেন তরুণ প্রজন্মের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা—যা প্রমাণ করে, স্বপ্নের পেছনে সততা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতা হার মানতে বাধ্য।