জাতিসংঘের মঞ্চে ১৯৩ দেশ, কিন্তু সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কার হাতে?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ এএম
বিশেষ প্রতিনিধি সঞ্জয় মজুমদার: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে বিশ্বের ১৯৩টি দেশ যখন যুদ্ধ, শান্তি, জলবায়ু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে, তখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে ফিরে এসেছে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন—বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সমান ভোটাধিকার থাকলেও সংকটের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রকৃত ক্ষমতা কতটা সবার হাতে? সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রত্যেকটির একটি করে ভোট থাকলেও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, যেখানে পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—বিশেষ ভেটো ক্ষমতা ধরে রেখেছে।
এটাই জাতিসংঘের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোর সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। সাধারণ পরিষদ হলো জাতিসংঘের প্রধান প্রতিনিধিত্বশীল ও নীতিনির্ধারণী আলোচনার মঞ্চ; ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রই সেখানে সমান ভোট পায়। কিন্তু সাধারণ পরিষদের অধিকাংশ প্রস্তাব রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাধারণত সুপারিশমূলক। বিপরীতে নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব পালন করে এবং এর সিদ্ধান্ত সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ওপর বাধ্যতামূলক হতে পারে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জাতিসংঘের দুটি ভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বিভক্ত।
নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোতে ১৫টি আসন রয়েছে—১০টি অস্থায়ী এবং পাঁচটি স্থায়ী। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্তত নয়টি ভোট প্রয়োজন এবং স্থায়ী পাঁচ সদস্যের যেকোনো একটি নেতিবাচক ভোট প্রস্তাব আটকে দিতে পারে। জাতিসংঘের নিজস্ব ব্যাখ্যায় এই ভেটো ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোয় প্রধান শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কিন্তু ১৯৪৫ সালের বিশ্ব আর ২০২৬ সালের বিশ্ব এক নয়—এই পরিবর্তনই এখন সংস্কার বিতর্কের অন্যতম ভিত্তি।
৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সেই বিতর্ক নতুন গতি পেয়েছে। আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকা নিয়ে সমালোচনা আবারও জোরালো হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও আফ্রিকার নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়টিকে অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আফ্রিকা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক অংশগ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছে।
সংস্কার প্রশ্নে অবশ্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একক মত নেই। ২৪ সেপ্টেম্বর ‘Uniting for Consensus’ জোটের ১২টি দেশ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের পক্ষে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। ইতালি, পাকিস্তান, তুরস্ক, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেনসহ জোটটির সদস্যরা বলেছে, সংস্কার প্রক্রিয়ায় সদস্যরাষ্ট্রনির্ভর আন্তঃসরকারি আলোচনা—Intergovernmental Negotiations বা IGN—হওয়া উচিত মূল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম। তারা নিরাপত্তা পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ভেটো নিয়েও মতপার্থক্য স্পষ্ট। ‘Uniting for Consensus’ জোট ভেটো বিলোপের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে এবং অন্তত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে ভেটো সীমিত করার উদ্যোগের কথা বলেছে। অন্যদিকে রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে নতুন স্থায়ী সদস্য যুক্ত করার বিষয়ে সমর্থন জানালেও বর্তমান স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সংস্কারের সীমা ও প্রকৃতি নিয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে মতৈক্য এখনো তৈরি হয়নি।
এখানে ‘১৯৩ বনাম ৫’ কোনো সরল সংখ্যার লড়াই নয়; বরং এটি জাতিসংঘের দুই ধরনের বৈধতার প্রশ্ন। একদিকে সাধারণ পরিষদে রয়েছে সর্বজনীন প্রতিনিধিত্ব—প্রতিটি রাষ্ট্রের সমান ভোট। অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের বিশেষ ক্ষমতা এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শক্তির কাঠামো থেকে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা বদলে যাওয়ার সঙ্গে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামোও কি একই গতিতে পরিবর্তিত হওয়া উচিত?
এই প্রশ্নের সঙ্গে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব সরাসরি যুক্ত। বিশ্বের ৫৪টি রাষ্ট্রের মহাদেশ আফ্রিকা নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ থেকে এখনও বাইরে। এ কারণে আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোর দাবি শুধু আসনসংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা এমন একটি কাঠামো চায় যেখানে বৈশ্বিক দক্ষিণের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রেও প্রতিফলিত হবে। ৮১তম অধিবেশনে এ দাবি নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেয়েছে।
তবে জাতিসংঘ সংস্কারের পথ সহজ নয়। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তন করতে জাতিসংঘ সনদ সংশোধনের প্রয়োজন হয়, আর সনদ সংশোধনের বিষয়টি নিজেই অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এ কারণেই নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার নিয়ে আন্তঃসরকারি আলোচনা বছরের পর বছর ধরে চলছে। সাধারণ পরিষদ ইতোমধ্যে বিভিন্ন অধিবেশনে এই আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ৮১তম অধিবেশনেও বিষয়টি এজেন্ডায় রয়েছে।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জাতিসংঘের কার্যকারিতা কেবল ভোটের কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পারমাণবিক ঝুঁকি, মহামারি ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকটের মতো আন্তঃসীমান্ত সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে; ২৫ সেপ্টেম্বরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের অন্যতম বিষয় মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা। অর্থাৎ জাতিসংঘের সামনে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের পাশাপাশি বহুপাক্ষিক সহযোগিতার কার্যকারিতাও বড় পরীক্ষা।
এ কারণেই এবারের অধিবেশনে সংস্কারের প্রশ্নটি শুধু কূটনীতিকদের আলোচনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, যুদ্ধ বন্ধের সক্ষমতা, মানবিক সহায়তা, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতাও জড়িয়ে আছে। নিরাপত্তা পরিষদে কোনো সংকট নিয়ে ঐকমত্য না হলে তার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শরণার্থী সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামো তাই শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন নয়—এটি আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার প্রশ্নও।
সবশেষে ৮১তম সাধারণ পরিষদে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সম্ভবত ‘কার হাতে ক্ষমতা’—এখানে থেমে থাকছে না; বরং ‘কীভাবে ক্ষমতার কাঠামোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর করা যায়’—সেটিই সামনে আসছে। ১৯৩টি দেশের সমান ভোটাধিকার জাতিসংঘকে বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত বহুপাক্ষিক রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করেছে, আর পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো নিরাপত্তা পরিষদে ক্ষমতার একটি বিশেষ ভারসাম্য তৈরি করেছে। এখন সেই দুই বাস্তবতার মধ্যে নতুন সমঝোতা তৈরি করা সম্ভব কি না, বিশেষ করে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব, ভেটো ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এবং নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণের প্রশ্নে—তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের জাতিসংঘ কতটা পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।