সাত মাসের হিসাব: রাষ্ট্র কোন পথে?

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

কোনো সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাসের মধ্যেই একটি দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট পুরোপুরি দূর করে ফেলবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব ঘাটতি, কর্মসংস্থানের সংকট কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রাতারাতি সমাধানযোগ্য নয়। তবে সাত মাস যথেষ্ট সময়—সরকার কোন পথে হাঁটতে চায়, তার অগ্রাধিকার কী এবং সংকট মোকাবিলায় সুস্পষ্ট রোডম্যাপ আছে কি না, তা বোঝার জন্য।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তাই প্রশ্ন শুধু ‘কী অর্জিত হলো’ নয়; বরং আগামী কয়েক বছরের জন্য রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে কোন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হচ্ছে?

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর মূল্যায়নে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি কমা, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে, যা ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়ে বেশি। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।

 

অর্থনীতি: সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়?

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান—এসবকে আলাদা আলাদা করে দেখলে চলবে না।

ব্যাংক সংস্কার মানে শুধু খেলাপি ঋণ আদায়ের ঘোষণা নয়। ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষা—সবকিছুকে একই কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। বিশ্বব্যাংকও ব্যাংক পুনর্গঠন, আমানত সুরক্ষা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

রাজস্ব ব্যবস্থায়ও কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। করের আওতা না বাড়িয়ে কেবল বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ডিজিটাল করব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় অডিট ও কর ফাঁকি শনাক্তকরণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

 

মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান: মানুষের বাস্তব সংকট

সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান সূচক হলো বাজারদর। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস, ওষুধ ও পরিবহন ব্যয় যখন আয় বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তখন জিডিপির পরিসংখ্যান মানুষের জীবনযাত্রার চাপ পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না।

তাই মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি নীতি, শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং বাজার প্রতিযোগিতা—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।

একই সঙ্গে কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বড় সম্পদ। শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, পর্যটন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই শক্তিকে উৎপাদনশীলতায় রূপ দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অর্থায়নে স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা জরুরি।

 

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান: যোগ্যতা ও জবাবদিহিই ভিত্তি

একটি কার্যকর রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তার সবচেয়ে কার্যকর জবাব হলো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, যোগ্যতার মানদণ্ড এবং সিদ্ধান্তের যুক্তি প্রকাশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা রাষ্ট্রীয় করপোরেশন—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নির্ভর করে নেতৃত্বের পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহির ওপর।

 

পররাষ্ট্রনীতি: ভারসাম্যই কৌশলগত সম্পদ

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি এখন গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল। রপ্তানি, রেমিট্যান্স, জ্বালানি আমদানি, শ্রমবাজার ও বিদেশি বিনিয়োগ—সবকিছুর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সরাসরি যুক্ত।

৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র Reciprocal Trade Agreement স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিতে শুল্ক, বাজার প্রবেশাধিকার ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাধা নিয়ে পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

এই চুক্তির সুফল-ঝুঁকি মূল্যায়নে দেখা দরকার—বাংলাদেশের রপ্তানি কতটা লাভবান হবে, স্থানীয় শিল্পের ওপর প্রভাব কী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সক্ষমতা কতটা বাড়বে।

অন্যদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ৭ আগস্ট ২০২৬ মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। বাংলাদেশকে এতে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এমন কোনো নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার আগে এর আইনি দায়, সামরিক প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা বাস্তব প্রয়োজন। তাই পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো একমুখী নির্ভরতার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রতিরক্ষা ব্যয় বনাম মানবিক নিরাপত্তা

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা শুধু যুদ্ধবিমান বা সামরিক সরঞ্জামে সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পানি, সাইবার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।

বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ক্ষেত্রে তাই কৌশলগত প্রয়োজন, অর্থায়ন, কিস্তির চাপ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতার ওপর প্রভাব—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

 

এখন প্রয়োজন লিখিত ও পরিমাপযোগ্য রোডম্যাপ

সরকারের কাছে জনগণের যৌক্তিক প্রত্যাশা হতে পারে একটি সময়সীমাবদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা। সেখানে থাকতে পারে—

১. মূল্যস্ফীতি কমানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্য;

২. ব্যাংকিং খাত সংস্কারের সময়সীমা;

৩. খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছ কাঠামো;

৪. রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পরিকল্পনা;

৫. শিল্প ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য;

৬. তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান কর্মসূচি;

৭. জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা;

৮. স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পরিমাপযোগ্য সংস্কার;

৯. সরকারি নিয়োগ ও ক্রয়ে স্বচ্ছতা;

১০. জাতীয় স্বার্থভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কৌশল।

 

শেষ কথা

সাত মাস কোনো সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত বিচার করার সময় নয়। কিন্তু সাত মাস যথেষ্ট সময়—একটি সরকার কোন ধরনের রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চায়, তার অগ্রাধিকার কী এবং সংকট মোকাবিলায় তার নীতিগত দিকনির্দেশনা কোন পথে যাচ্ছে, তা বোঝার জন্য।

বাংলাদেশের সংকটের সমাধান কোনো একক প্রকল্প, চুক্তি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নেই। প্রয়োজন অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির সমন্বিত কাঠামো।

রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতায় নয়; শক্তিশালী অর্থনীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ এবং নাগরিকের আস্থাই তার স্থায়ী ভিত্তি।

তাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশকে কোন পথে এগিয়ে নেওয়া হবে, এবং সেই পথের লিখিত, বাস্তবসম্মত ও পরিমাপযোগ্য নকশাটি কোথায়?

জনগণ সাত মাসে সব সমস্যার সমাধান আশা করে না। তারা শুধু জানতে চায়—সমাধানের পথটি কোথায়, আর সেই পথে রাষ্ট্র কতটা এগোচ্ছে?

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com