সংকটের বিশ্বে আস্থা ফেরানোর ডাক, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ বিতর্ক শুরু
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১১ এএম
বিশেষ প্রতিনিধি সঞ্জয় মজুমদার, নিউইয়র্ক:
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্যেই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই সাধারণ বিতর্ক ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এবং ২৮ সেপ্টেম্বর আবার বসবে; জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এতে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছেন।
এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—“Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all”, অর্থাৎ ‘আস্থা পুনরুদ্ধার ও পরিবর্তন পরিচালনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই প্রতিপাদ্যের অধীনে বিশ্বনেতারা পরস্পর-সম্পর্কিত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করছেন।
সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী পর্যায়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদন A/81/1 উপস্থাপন করেন। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালের ২০ জুলাই প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে সংস্থাটির কার্যক্রমের বার্ষিক পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে।
এবারের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে শুধু সাধারণ বিতর্ক নয়, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২৩ সেপ্টেম্বর উন্নয়নের অধিকারবিষয়ক ঘোষণার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে বৈঠক রয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে আলোচনা এবং ২৫ সেপ্টেম্বর মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও মোকাবিলা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর ডারবান ঘোষণা ও কর্মসূচির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষেও বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে।
এই কর্মসূচির বিস্তৃতি থেকেই স্পষ্ট যে এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনের আলোচনায় নিরাপত্তা ও যুদ্ধের পাশাপাশি জলবায়ু, উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাচ্ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে আলাদা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ুজনিত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রযুক্তিগত রূপান্তরও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, তথ্যব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল সবার কাছে পৌঁছানো এবং এর ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা জাতিসংঘের বৃহত্তর বহুপাক্ষিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সভাপতিত্বে এবারের অধিবেশনের লক্ষ্য বৈশ্বিক সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে নতুন গতি তৈরি করা এবং শান্তি, মর্যাদা ও সমতার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ জোরদার করা।
তবে নিউইয়র্কের এই কূটনৈতিক আয়োজনের তাৎপর্য শুধু বক্তব্য ও ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যচাপ, জলবায়ু দুর্যোগ এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি—এসব বাস্তব সমস্যা আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সাধারণ পরিষদের আলোচনায় এসব বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপের যে দিকনির্দেশনা উঠে আসবে, তা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন নীতি ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগে প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্ক মূলত এমন একটি কূটনৈতিক মঞ্চ, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা নিজেদের জাতীয় অগ্রাধিকার তুলে ধরার পাশাপাশি বৈশ্বিক ইস্যুতে অবস্থান প্রকাশ করেন। এবারের অধিবেশনে তাই একদিকে চলমান সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক বিভাজন, অন্যদিকে জলবায়ু, উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতো আন্তঃসম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ—সবকিছুর মধ্যে সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
আগামী কয়েক দিনের আলোচনায় বিশ্বনেতাদের বক্তব্য, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক এবং উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অগ্রাধিকার আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা। শেষ পর্যন্ত এই অধিবেশনের বাস্তব গুরুত্ব নির্ভর করবে আলোচনার বাইরে গিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলো কতটা কার্যকরভাবে শান্তি, উন্নয়ন, জলবায়ু মোকাবিলা ও বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারে তার ওপর।