হিমাগারে আটকে ৬৮ শতাংশ, প্রতি বস্তায় কৃষকের ঘাটতি

জয়পুরহাটে বাম্পার ফলনেও আলুতে লোকসান

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম

জয়পুরহাট প্রতিনিধি: আব্দুল কাদর

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় টানা তিন বছর ধরে আলুর বাম্পার ফলন হলেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন থেকে শুরু করে আলু তোলা, বাছাই, বস্তাবন্দি, পরিবহন ও হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত ৬০ কেজির এক বস্তা আলুতে কৃষকের খরচ পড়ছে প্রায় ১ হাজার ৪১০ টাকা। অথচ বর্তমানে হিমাগার গেটে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮৬০ থেকে ৮৭০ টাকায়। এতে প্রতি বস্তায় কৃষকের ঘাটতি থাকছে প্রায় ৫৪০ থেকে ৫৫০ টাকা।

অনুসন্ধানে কৃষকদের সঙ্গে কথা বললে কৃষকেরা বলেন, একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে বাজারে আলুর দাম কমে যাওয়ায় তাঁরা চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু বাজারে তুলতে গেলেও কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। ফলে অনেকে আলু বিক্রি না করে হিমাগারেই রেখে দিচ্ছেন। এতে একদিকে সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সামনে নতুন আলু ওঠার সময় পুরোনো আলু নিয়ে আরও বড় সংকট তৈরির আশঙ্কা করছেন হিমাগার সংশ্লিষ্টরা। প্রতি বস্তায় ৩৬০ টাকা সংরক্ষণ ভাড়া৷ 

কৃষকদের অভিযোগ, আলুর বাজারদর কমলেও হিমাগারে সংরক্ষণের ভাড়া কমেনি। বর্তমানে কেজিপ্রতি ৬ টাকা হিসাবে ৬০ কেজির এক বস্তা আলুর জন্য হিমাগারে সংরক্ষণ ভাড়া দিতে হচ্ছে ৩৬০ টাকা। তাঁদের মতে, আলুর বাজারদরের ওঠানামার পুরো ঝুঁকি কৃষককে বহন করতে হলেও হিমাগারের নির্ধারিত সংরক্ষণ ভাড়া নিশ্চিতভাবেই পরিশোধ করতে হচ্ছে।

তবে হিমাগার মালিকদের দাবি, কেজিপ্রতি ৬ টাকা সংরক্ষণ ভাড়ার পুরোটাই তাঁদের লাভ নয়। হিমাগার পরিচালনায় বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটরের জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় রয়েছে। এসব ব্যয় মেটাতেই সংরক্ষণ ভাড়া নির্ধারণ করা হয় বলে তাঁদের ভাষ্য। হিমাগারে পড়ে আছে দেড় লাখ টনের বেশি আলু৷ 

ক্ষেতলাল উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ২ লাখ ৭৩ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। উপজেলার ০৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার টন আলু। তবে বাজারে দাম কম থাকায় হিমাগার থেকে আলু উত্তোলনের গতি অনেকটাই কমে গেছে। এখন পর্যন্ত সংরক্ষিত আলুর মাত্র ৩২ শতাংশ উত্তোলন হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৬৮ শতাংশ আলু এখনো হিমাগারে আটকে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় আলুর দাম কমে গেছে। এ অবস্থায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লোকসানে আলু বিক্রি করতে অনাগ্রহী। ফলে হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর পরিমাণও কমছে ধীরগতিতে।

উৎপাদন বেশি, চাহিদা কম৷  

স্থানীয় আলু রপ্তানিকারক আজাদুল ইসলাম বলেন, আলুর বাজারে এখন প্রধান সংকট হচ্ছে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। এবার বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদিত হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় বড় একটি অংশ হিমাগারে মজুত রয়েছে।

তিনি বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকায় কৃষককে বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচও উঠছে না। কৃষকদের এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে জরুরি ভিত্তিতে আলু রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন , দ্রুত বাজার সম্প্রসারণ করা না গেলে হিমাগারে মজুত আলু নিয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আরও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে নতুন মৌসুমের আলু বাজারে আসার আগে বর্তমান মজুত আলু বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা জরুরি।

আলুর বাম্পার ফলনই এখন দুশ্চিন্তার কারণ

ক্ষেতলালে বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে আলুর উৎপাদন ভালো হওয়ায় তাঁরা আগের তুলনায় বেশি জমিতে আলু চাষ করেছেন। ফলনও হয়েছে আশানুরূপ। কিন্তু বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় উৎপাদনের সেই সাফল্য এখন তাঁদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, আলু উত্তোলন, বাছাই, বস্তাবন্দি, পরিবহন ও হিমাগারে সংরক্ষণ প্রতিটি পর্যায়েই ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদিত আলুর বিক্রয়মূল্য সেই তুলনায় বাড়েনি। ফলে মাঠে ভালো ফলন হলেও শেষ পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের।

কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় রপ্তানি বাড়ানো, সরকারি উদ্যোগে বাজার সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের জন্য কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ক্ষেতলালে বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদন হওয়া কৃষি অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনার বিষয় হলেও বাজার ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে সেই উৎপাদনই কৃষকের জন্য লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই হিমাগারে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ আলু দ্রুত বাজারজাত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে উৎপাদন ও বাজার চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করা জরুরি।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com