জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধের দাবিতে মোংলায় তীব্র প্রতিবাদ
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম
ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে মোংলায় পশুর নদীর তীরে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক নতুন প্রকল্প বন্ধ এবং রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন পরিবেশ আন্দোলনকারীরা।
শুক্রবার সকালে মোংলা উপজেলার কানাইনগরে পশুর নদীর তীরে আয়োজিত এক মানববন্ধনে দেশের জ্বালানি নীতি ও পরিবেশগত সংকটের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), পশুর রিভার ওয়াটারকিপার ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি পালিত হয়, যা মূলত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী চলমান জলবায়ু ন্যায়বিচার আন্দোলনেরই একটি অংশ। আয়োজিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর বোধোদয় ঘটানো, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক সব ধরনের নতুন প্রকল্প এবং সেগুলোর অর্থায়ন অবিলম্বে চিরতরে বন্ধ করা হয়। পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মানববন্ধনে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীরা কঠোর ভাষায় বলেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের এই চরম মুহূর্তে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত রাখা কেবল আত্মঘাতীই নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক ধরণের অপরাধমূলক অবহেলা। তারা অভিযোগ করেন, দেশের নীতিনির্ধারকরা বারবার পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি পাশ কাটিয়ে মুনাফাকেন্দ্রিক জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন, যা দেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও সামগ্রিক জলবায়ুকে এক মারাত্মক ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পশুর নদীর তীরবর্তী এই এলাকায় দাঁড়িয়ে বক্তারা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন যে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম আর সহ্য করা হবে না এবং অবিলম্বে এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষ ও পরিবেশকর্মীরা তাদের বক্তব্যে সুন্দরবনসংলগ্ন রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সৃষ্ট বহুমুখী পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। ধরা’র নেত্রী অসীমা মন্ডল ও বৃষ্টি সরকার তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পর থেকেই মোংলা ও এর আশেপাশের এলাকার জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য এবং সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পশুর রিভার ওয়াটারকিপারের সংগঠক রেশমা খাতুন এবং জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ হাওলাদার অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, কয়লাভিত্তিক এই প্রকল্পের বর্জ্য ও দূষণের কারণে পশুর নদীর পানির স্বাভাবিক গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে নদীর মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়েছে এবং ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার জেলের জীবন ও জীবিকা আজ চরম অনিশ্চয়তার আবর্তে পড়েছে। ওয়াটারকিপার বাংলাদেশের মেহেদী হাসানসহ অন্যান্য বক্তারা তাদের বক্তব্যে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে জর্জরিত এই উপকূলীয় অঞ্চলে কোনোভাবেই রামপাল বা এ ধরনের কোনো ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প টিকিয়ে রাখা যাবে না। সাধারণ মানুষের এই ন্যায্য দাবির মুখ বন্ধ রাখতে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হলেও ভুক্তভোগী ও পরিবেশকর্মীরা তাদের জীবন-জীবিকা ও সুন্দরবন রক্ষায় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও এই ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা এবং মুনাফালোভী সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণেই আজ সুন্দরবন ও উপকূলীয় জনপদের কোটি মানুষ এক নীরব বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন।
এই তীব্র সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষোভের মুখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও উত্তপ্ত করে তুলছে। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র লোক দেখানো আশ্বাসে বা কাগজে-কলমে প্রতিশ্রুত নীতিমালায় কাজ হবে না, বরং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অবিলম্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সুনির্দিষ্ট ও বড় অংকের বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি খাতের এই আমূল পরিবর্তন বা ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর ছাড়া দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সার্বভৌমত্ব কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এবং সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিভাগ যদি অবিলম্বে এই দাবিগুলো আমলে না নেয়, তবে দেশের সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে আরও কঠোর ও বিস্তৃত আন্দোলন গড়ে তোলার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন বক্তারা। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যখন কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে বিশ্বনেতারা নানা উচ্চবাচ্য করছেন, তখন দেশের ভেতর এ ধরনের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবিনাশী প্রকল্প চালু রাখা জাতীয় স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাই অনতিবিলম্বে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সকল জীবাশ্ম জ্বালানির প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করে একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য জোরালো দাবি জানানো হয় এই সমাপনী বক্তব্যে।
মোংলার কানাইনগরে অনুষ্ঠিত এই প্রতিবাদী মানববন্ধনের মাধ্যমে মূলত দেশের পুরো জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্রই পুনরায় উন্মোচিত হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির মরণফাঁদ থেকে দেশকে মুক্ত করে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতি প্রণয়ন না করলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই ধরনের জনসম্পৃক্ত আন্দোলন যদি সময়মতো নীতিনির্ধারকদের বোধোদয় ঘটাতে ব্যর্থ হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যখাতে এক অপূরণীয় ও সুদূরপ্রসারী বিপর্যয় ডেকে আনবে। পরিশেষে, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার স্বার্থে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পের চিরতরে ইতি ঘটিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া ছাড়া রাষ্ট্রের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।