পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হইবার বিবরণ: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম

নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ প্রশ্নঃ- এই সকল নামাজ হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর কখন হইতে ফরজ হইয়াছে? 

উত্তরঃ- এই বিষয় নানা প্রকার মতভেদ রহিয়াছে। (১) রদ্দুল মোহতার কিতাবে কোন কোন ওলামার রেওয়ায়েত হইতে বর্ণিত আছে, আঁ হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হিজরতের দেড় বৎসর পূর্বে রমজান মাসের ১৭ তারিখ শনিবার রাত্রে তাঁহার প্রতি এই নামাজ ফরজ হয়। 

(২) হাশিয়ায়ে তাহতাবী কিতাবে লিখিত আছে, কেহ কেহ বলিয়াছেন, রজব মাসে মে'রাজের সময় এই নামাজ তাঁহার প্রতি ফরজ হইয়াছে। এই কথার প্রতিই অধিকাংশের বিশ্বাস। 

(৩) শামী কিতাবে লিখিত আছে যে, কাহারও মতে রজব মাসের ২৭শে তারিখ মে'রাজে র রাত্রে এই নামাজ ফরজ হইয়াছে। কেহ কেহ বলেন,রবিউল আউয়াল চাঁদে এই নামাজ ফরজ হইয়াছে। 

প্রশ্নঃ- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হইবার পূর্বে হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তদীয় সাহাবাগণ অন্য কোনও নামাজ পড়িতেন কি না?

উত্তরঃ- হ্যাঁ, হাশিয়ায়ে তাহতাবী কিতাবে লিখিত আছে যে, সূর্য উদয়ের পূর্বে ও অস্ত যাইবার পূর্বে তাঁহারা দুই ওয়াক্ত নামাজ ফরজের ন্যায় পড়িতেন।

প্রশ্নঃ- মে'রাজের রাত্রে হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হইয়াছিল, উহা পাঁচ ওয়াক্তে পরিণত হইল কি প্রকারে?

উত্তরঃ- আনিছুল ওয়ায়েজীন নামক এক কিতাবের মর্মে জানা যায় যে, মে'রাজের রাত্রিতে হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাত হইতে প্রত্যাবর্তনকালে হযরত মুসা আলাইহিসসালাম -এর রূহ-মোবারকের সহিত মোলাকাত হইল। পবিত্র রূহ হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি আল্লাহ তায়ালার দরবার হইতে কি আনিয়াছেন? আঁ হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর করিলেন,আল্লাহ তায়ালা আমাকে এবং আমার উম্মতগণকে দিবারাত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ পড়িবার আদেশ দিয়াছেন। ইহা শ্রবণে হযরত মুসা আলাইহিসসালাম -এর রূহ বলিলেন, আপনার উম্মত দুর্বল হইবে, তাঁহার সাংসারিক কার্য করিয়া দিবারাত্রে পঞ্চাশবার নামাজ আদায় করিতে সমর্থ হইবেনা। আপনি আল্লাহ তায়ালার নিকট হইতে কিছু কমাইয়া আনুন। আঁ হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই উপদেশ মতে খোদা তায়ালার দরবারে হাজির হইলেন, তিনি তাঁহার প্রার্থনা অনুসারে দশ ওয়াক্ত নামাজ মাফ করতঃ দিবারাত্রি চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করিয়া দিলেন। সেখান হইতে প্রত্যাবর্তনকালে, পুনরায় হযরত মুসা আলাইহিসসালাম -এর রূহ বলিলেন, আপনার উম্মত ইহাও পারিবে না। তৎপর হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় আল্লাহর দরবারে হাজির হইলেন এবং এবারেও আল্লাহ তায়ালা কয়েক ওয়াক্ত নামাজ মাফ করিলেন। এরূপ কয়েকবার যাতায়াতে শেষ পর্যন্ত দশ ওয়াক্ত নামাজ স্থির হইল এবং হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরিয়া চলিলেন। হযরত মুসা আলাইহিসসালাম এর রূহ এবারও বলিলেন যে, আপনার উম্মত এই দশ ওয়াক্ত নামাজ ও আদায় করিতে সমর্থ হইবে না। হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই পুনরায় আল্লাহ তায়ালার দরবারে যাইয়া আরজ করিলেন যে, হে খোদা! আমার উম্মতগণ এই দশ ওয়াক্ত নামাজ ও আদায় করিতে পারিবে না। আপনি মেহেরবানী করিয়া আরও ক্ষমা করিয়া দেন। আল্লাহ তায়ালা বলিলেন, হে দোস্ত! আপনার খাতিরে ও আপনার উম্মতগণের উপর দয়া করিয়া দিবারাত্রে মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করিলাম। হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরিয়া চলিলেন। হযরত মুসা আলাইহিসসালাম এর রূহ এবারও বলিলেন, না। খোদার নিকট হইতে আরও কমাইয়া আনুন। হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিলেন, না! খোদার নিকট পুনরায় আর এ বিষয়ে প্রার্থনা করিতে লজ্জা বোধ হইতেছে। এই বলিয়া খোদা তায়ালার দরবারে না যাইয়া অতি নিরস বদনে কাঁদিয়া ফিরিতেছিলেন। তখন আল্লাহ তায়ালার তরফ হইতে আওয়াজ আসিল, আয় আমার হাবিব! দোস্তের সাক্ষাৎ লাভ করিলে দোস্ত হাস্য মুখে ফিরিয়া যায়, আপনি কি জন্য কাঁদিতেছেন? তখন হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিলেন, আপনি মেহেরবানী করিয়া আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করিয়াছিলেন। আমি প্রার্থনা করিয়া মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের অনুমতি লাভ করিয়াছি। কিন্তু আমার বড়ই দুঃখ হইতেছে যে, আমার উম্মতগণ পঁয়তাল্লিশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব হইতে বঞ্চিত হইবে, তজ্জন্যই কাঁদিতেছি।

তখন আল্লাহ তায়ালা বলিলেন, না! না! আপনি কাঁদিবেন না। আপনার উম্মতগণ যদি যথা নিয়মে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তবে আমি এই পাঁচ ওয়াক্তেই পঞ্চাশ ওয়াক্তের নামাজের সওয়াব দিব। এখন চিন্তা করিয়া দেখুন, আমাদের সৌভাগ্য, আমরা মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়িয়া ও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব পাইতে থাকিব। অতএব এই নামাজ যাহাতে কোন প্রকারে নষ্ট না হয় এবং স্ত্রী- পুত্র নির্বিশেষে সকলেই যেন এই নামাজ আদায় করে, তজ্জন্য চেষ্টা করা প্রত্যেকেরই একান্ত কর্তব্য। 

প্রশ্নঃ- হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পূর্ববর্তী নবীগণের কাহারও উপর কোনও নামাজ ফরজ ছিল কি না?

উত্তরঃ- আনিছুল-ওয়ায়েজীন কিতাবের মর্মে জানা যায়, পূর্ববর্তী নবীগণের কাহারও উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত, কাহারও উপর চল্লিশ ওয়াক্ত, কাহারও উপর বিশ ওয়াক্ত, কাহারও উপর দশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ ছিল। এমন কোনও নবী ছিলেন না, যাহার উপর পঞ্চাশের বেশি ও দশ ওয়াক্তের কম নামাজ ফরজ ছিল।

প্রশ্নঃ- শুধু বালেগা স্ত্রী ও বালেগ পুরুষের প্রতি নামাজ আদায় করা ফরজ হইলে বালক বালিকাদের প্রতি নামাজ পড়ার আদেশ দেওয়া হয় কেন?

উত্তরঃ- হাশিয়ায়ে-তাহতাবী কিতাবে লিখিত আছে, যদিও না-বালেগের প্রতি নামাজ রোজা ফরজ নহে, কিন্ত পিতা-মাতার ওয়াজিব যে, সাত বৎসর বয়স্ক বালক-বালিকাকে নামাজ রোজা ইত্যাদি শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন। হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন, ছেলে-মেয়েদের বয়স সাত বৎসর হইলেই নামাজের জন্য আদেশ করা পিতা-মাতার কর্তব্য। যখন তাহারা দশ বৎসরে পৌঁছিবে তখন তাহারা নামাজ না পড়িলে হাত দ্বারা শাসন করিবে, লাঠি দ্বারা মারিবে না। শামী ও হাশিয়ায়ে তাহতাবী কিতাবে লিখিত আছে, উহাদের ভালাইর জন্য তিনবার আঘাত করিবে। শামী কিতাবে লিখিত আছে যে, হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন, ওস্তাদও তিনবার শাসন করিবেন। অতিরিক্ত শাসন করিলে আল্লাহ তায়ালা কেছাছ লইবেন। হাশিয়ায়ে তাহতাবীতে লিখিত আছে, ওস্তাদ তিনবার মধ্যম রকমে প্রহার করিবেন। শামী ও হাশিয়ায়ে তাহতাবী কিতাবে আছে, আল্লাহ ও রসূলের নির্দেশিত সকল কাজের জন্যই এইরূপ শাসনের ব্যবস্হা।

প্রশ্নঃ- অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়েদের শাসন সম্পর্কে জ্ঞাত হইলাম, যদি বালেগ স্ত্রী পুরুষ নামাজ ও রোজা তরক করে, তাহাদিগের প্রতি কি হুকুম? 

উত্তরঃ- শামী কিতাবে লিখিত আছে, যে ব্যক্তি তুচ্ছ করিয়া নামাজ না পড়িবে, সে কাফের হইবে। ক্ষমতা থাকিলে ঐ কাফেরকে বন্দী করিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তওবা না করিবে ও নামাজ রোযা আদায় না করিবে, ততদিন কয়েদ রাখিবার বিধান আছে। কেহ কেহ বলিয়াছেন যে,এরূপ শাস্তি দিবে যেন শরীর হইতে রক্ত বাহির হয়। হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেন, তোমরা যাহাকে ফাছেক দেখিতে পাইবে, ক্ষমতা থাকিলে তাহাকে হাত দ্বারা শাসন করিবে, না পারিলে মুখ দ্বারা উপদেশ দাও, যদি ইহাও সম্ভব না হয়, তবে অন্তরে অন্তরে তাহার প্রতি বেজার থাকিয়া তাহার সংশ্রব ত্যাগ করিবে।

ইয়া আল্লাহ আমার এই শ্রম গুলো জান্নাতের ঝরিয়া হিসেবে কবুল করুন মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নামাজের বিষয় গুলো জানার তাওফিক দান করুন আল্লাহুম্মা আমিন।

 

লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম সিলেট। সাবেক ইমাম ও খতীব: সিলেট নগরীর কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ রহ. মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল: হযরত শাহজালাল রহ. ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা উপশহর সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক: হযরত শাহজালাল রহ. লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা দক্ষিণ সুরমা সিলেট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com