রাষ্ট্র সংস্কারের শুরু হোক পরিবার থেকে
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১২ পিএম
পরিবার মানুষের জীবনের প্রথম প্রতিষ্ঠান, প্রথম আশ্রয় এবং প্রথম শিক্ষালয়। একটি শিশু পৃথিবীতে এসে প্রথম যে মানুষগুলোর কাছ থেকে ভাষা, আচরণ, ভালোবাসা, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ শেখে, তারা তার পরিবারের সদস্য। সে শুধু কথা বলা কিংবা সামাজিক আচরণ শেখে না; পরিবার থেকেই তার মধ্যে তৈরি হয় ন্যায়-অন্যায়ের বোধ, দায়িত্বশীলতা, সহমর্মিতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতা। অর্থাৎ একজন মানুষের চরিত্র গঠনের ভিত্তি নির্মিত হয় পরিবারেই।
সেই অর্থে পরিবারকে কেবল সমাজের ক্ষুদ্রতম একক হিসেবে দেখলে এর গুরুত্বকে খাটো করা হয়। পরিবার আসলে একটি জাতির নৈতিক ও মানবিক ভিত্তি নির্মাণের প্রথম কারখানা। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তায় পরিবার থেকে বৃহত্তর সামাজিক সংগঠন এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রের বিকাশের ধারণা পাওয়া যায়। ফলে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রশ্নে পরিবারের ভূমিকা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আমরা রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে কথা বলি। রাজনৈতিক সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার, বিচারব্যবস্থার সংস্কার কিংবা নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে বিস্তর আলোচনা করি। কিন্তু এসব সংস্কারের পেছনে যে মানুষগুলো কাজ করবেন, তাদের নৈতিক ভিত্তি কোথায় তৈরি হবে—এই মৌলিক প্রশ্নটি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন মানুষ। সেই মানুষের মূল্যবোধ, বিবেক, দায়িত্ববোধ ও ন্যায়বোধের প্রথম পাঠ শুরু হয় পরিবারে।
একটি পরিবারে যদি ন্যায়, সমতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার চর্চা থাকে, তার প্রভাব সন্তানের ব্যক্তিত্বে দীর্ঘস্থায়ীভাবে পড়ে। বিপরীতে পরিবারে যদি বৈষম্য, পক্ষপাত, সহিংসতা, অসততা ও কর্তৃত্বপরায়ণতার চর্চা থাকে, শিশুর মনোজগতে তারও গভীর ছাপ পড়ে। পরবর্তী জীবনে সেই ব্যক্তি যখন সমাজ, প্রশাসন কিংবা রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বে আসেন, তখন তার আচরণে শৈশবে অর্জিত মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটতে পারে।
এ কারণেই রাষ্ট্রের বড় বড় সংকটের শিকড় কখনো কখনো সমাজের আরও গভীরে, ব্যক্তিমানুষের চরিত্র ও পারিবারিক শিক্ষার মধ্যে খুঁজে দেখা প্রয়োজন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসহিষ্ণুতা কিংবা অন্যায়ের প্রতি নীরব সমর্থন—এসব কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল নয়; এগুলোর পেছনে ব্যক্তির নৈতিক গঠনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে যে পরিবারের মধ্যে যোগ্যতার চেয়ে পক্ষপাতের মূল্য বেশি, সত্যের চেয়ে সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ, কিংবা শক্তিশালী সদস্যের অন্যায়কে প্রশ্ন করা যাবে না—তাহলে তার মধ্যে ন্যায়বোধ কীভাবে শক্তিশালী হবে? আবার যে পরিবারে শিশু তার মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়, ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ পায় এবং অন্যের মতকে সম্মান করতে শেখে, সেখানে গণতান্ত্রিক মানসিকতার বিকাশের সম্ভাবনাও বেশি।
তাই গণতন্ত্রের শিক্ষা শুধু সংসদ, নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের প্রথম অনুশীলন হতে পারে একটি পরিবারে। সন্তানকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া, তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করা, ভাই-বোনের মধ্যে ন্যায়সংগত আচরণ করা—এসবই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রাথমিক অনুশীলন।
পরিবারের ভেতরে যদি ন্যায়বিচারের চর্চা না থাকে, বৃহত্তর সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ রাষ্ট্র কোনো বিচ্ছিন্ন যন্ত্র নয়; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে মানুষের আচরণ, মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র—এই ধারাবাহিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করে টেকসই রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব নয়।
এখানে উরি ব্রনফেনব্রেনারের পরিবেশগত সিস্টেম তত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর বিকাশে পরিবারের মতো ঘনিষ্ঠ পরিবেশের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। পরিবার শিশুর মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর একটি। ফলে পারিবারিক পরিবেশ যেমন শিশুকে প্রভাবিত করে, তেমনি পরবর্তী সময়ে সেই শিশুর আচরণ সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।
অর্থাৎ পরিবার ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক একমুখী নয়। রাষ্ট্রের নীতি পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলে, আবার পরিবারের ভেতরে গড়ে ওঠা নাগরিকরাই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তাই রাষ্ট্রের সুস্থতার জন্য পরিবারকে সুস্থ রাখা এবং পরিবারের সুস্থতার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বেকারত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, পারিবারিক সময়ের সংকট এবং নানা ধরনের সামাজিক অস্থিরতা পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে সন্তান ও অভিভাবকের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে; কোথাও আবার শাসনের নামে কঠোরতা, ভালোবাসার পরিবর্তে অবহেলা কিংবা মূল্যবোধের জায়গায় ভোগবাদ প্রাধান্য পাচ্ছে।
এ অবস্থায় পরিবারকে শুধু ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। পরিবারের সুস্থতা একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ও বটে। কারণ আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, আইনপ্রণেতা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। তার চরিত্র ও মূল্যবোধের ভিত্তি দুর্বল হলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ওপরও তার প্রভাব পড়বে।
সুতরাং রাষ্ট্র সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিতে পারিবারিক শিক্ষা ও অভিভাবকত্বকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অভিভাবকদের জন্য ‘পারিবারিক মূল্যবোধ ও ইতিবাচক অভিভাবকত্ব’ বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা চালু করা যেতে পারে। সন্তানকে কীভাবে শাসন করতে হবে, কীভাবে তার মানসিক বিকাশে সহায়তা করতে হবে, কীভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদেরও নিয়মিত শিক্ষা প্রয়োজন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্র পরিবারের অভ্যন্তরীণ জীবনে অযাচিত হস্তক্ষেপ করবে। বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে পরিবারকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, সহায়তা, নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিবেশ দেওয়া, যাতে পরিবার তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে। একটি শিশুর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করা যেমন পরিবারের দায়িত্ব, তেমনি সেই পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভালো পরিবার মানেই নিখুঁত পরিবার নয়। ভুল, মতভেদ ও সংকট সব পরিবারেই থাকতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ পরিবার হলো সেই পরিবার, যেখানে ভুল স্বীকারের সুযোগ আছে, আলোচনার সুযোগ আছে, ভালোবাসা আছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়ার সাহস আছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কেবল আইন পরিবর্তন করে মানুষের আচরণ পরিবর্তন করা যায় না। নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই নৈতিকতা তৈরি হয় না। টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন মানুষের মানসিকতা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের প্রথম ক্ষেত্র হলো পরিবার।
তাই রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা শুধু ক্ষমতার কাঠামো, প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কেমন নাগরিক তৈরি করছি? আমাদের পরিবারে সন্তান কী শিখছে? সে কি অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে শিখছে? ভিন্নমতকে সহ্য করতে শিখছে? অন্যায় সুবিধা প্রত্যাখ্যান করতে শিখছে? দায়িত্ব পালনের মূল্য বুঝছে? নাকি কেবল নিজের স্বার্থ অর্জনের কৌশল শিখছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করবে।
রাষ্ট্রের বড় পরিবর্তন অনেক সময় ছোট ছোট জায়গা থেকেই শুরু হয়। একটি পরিবারে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, একটি শিশুকে সত্য কথা বলার সাহস দেওয়া, ভাই-বোনের মধ্যে সমান আচরণ করা, ভিন্নমতকে সম্মান করা কিংবা অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখানো—এসব হয়তো খুব ছোট কাজ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার পরিবারে একই চর্চা তৈরি হলে তার সম্মিলিত প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রে পড়বেই।
আমাদের প্রয়োজন তাই পরিবার ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি নতুন মানবিক সম্পর্কের ধারণা। পরিবার হবে মূল্যবোধ, মানবিকতা, ন্যায় ও দায়িত্ববোধের প্রথম পাঠশালা; আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে সেই পরিবারের নিরাপত্তা, মর্যাদা, শিক্ষা ও বিকাশের অনুকূল পরিবেশ।
রাষ্ট্র সংস্কার কোনো একদিনের প্রকল্প নয়। এটি একটি দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়া। এর সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নতুন আইন বা নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির ওপর নয়, বরং সেই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনাকারী মানুষের নৈতিক মানের ওপর। আর সেই নৈতিক মানুষ তৈরির কাজ শুরু হয় জন্মের পর থেকেই—নিজের ঘরে, নিজের পরিবারে।
তাই একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন যদি সত্যিই আমাদের থাকে, তবে রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তোলার পাশাপাশি নিজেদের ঘরের দিকেও তাকাতে হবে। পরিবর্তনের দাবি তোলার আগে নিজেদের আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। সন্তানকে যে মূল্যবোধ শেখাতে চাই, তা আগে নিজেদের জীবনাচরণে ধারণ করতে হবে।
রাষ্ট্রের সংস্কারের বীজ কোনো মন্ত্রণালয়ের ফাইলে নয়, কোনো রাজনৈতিক স্লোগানেও নয়—তার প্রথম বীজ বোনা হয় পরিবারের মাটিতে।
সেই পরিবার যদি হয় ন্যায়, মানবিকতা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার ক্ষেত্র, তবে সেখান থেকেই তৈরি হবে দায়িত্বশীল নাগরিক, সৎ নেতৃত্ব এবং মানবিক রাষ্ট্রের ভিত্তি।
অতএব, রাষ্ট্র বদলানোর দীর্ঘ যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ হোক নিজের ঘর থেকে। পরিবারকে বদলাতে পারলেই বদলাবে মানুষ; মানুষ বদলালেই বদলাবে সমাজ; আর সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাতেই গড়ে উঠবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।