বাব আল-মান্দাবে নতুন উত্তেজনা: বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কার শঙ্কা
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৮ এএম
বিশেষ প্রতিনিধি সঞ্জয় মজুমদার
ইয়েমেনের কৌশলগত মোচা বন্দর হুথি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর লাল সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও দ্রুত বেড়েছে; ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
মোচা বন্দরটি বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মান্দাব লাল সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে কাজ করে। ফলে এই এলাকায় সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, পরিবহন ব্যয় এবং পণ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য বিকল্প রুটের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক হামলা ও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ১০ সেপ্টেম্বর তেলের দাম ৬ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। জ্বালানি পরিবহনে ঝুঁকি বাড়লে জাহাজের বিমা, নিরাপত্তা ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পরোক্ষ চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ অনুভব করতে পারে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে আঞ্চলিক রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথি হামলা এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। পাকিস্তানও ইরানকে হুথিদের হামলা বন্ধে প্রভাব খাটানোর আহ্বান জানিয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাব আল-মান্দাব কি আবারও দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হবে, নাকি কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে? মোচা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ এবং লাল সাগর উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি করিডোরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যও বিষয়টি নজরদারির দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে আমদানি ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে। তাই ইয়েমেনের সামরিক পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; এর পরিণতি বিশ্ববাজার হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ ভোক্তার জীবনেও পৌঁছাতে পারে।বর্তমান পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজার—এই তিনটি সূচক আগামী দিনগুলোর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি বোঝার প্রধান নির্দেশক হয়ে উঠতে পারে।