হরমুজে জাহাজ চলাচল সংকুচিত, বাব আল-মান্দাবে হুথিদের অগ্রযাত্রা, জ্বালানি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সামনে নতুন ঝুঁকি

দুটি সমুদ্রপথ বন্ধ হলে কী হবে? হরমুজ থেকে বাব আল-মান্দাব: বিশ্ববাণিজ্যের ‘চোকপয়েন্ট’ সংকট

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম

বিশেষ প্রতিনিধি: সঞ্জয় মজুমদার

দুবাই/আদেন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবার বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ—হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব—কে একই সংকটের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। হরমুজে বাণিজ্যিক ট্যাংকার চলাচল হামলা ও নিরাপত্তা-ঝুঁকির কারণে ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা বাব আল-মান্দাবের কৌশলগত পেরিম (মায়ুন) দ্বীপে পৌঁছে যাওয়ায় লোহিত সাগরের প্রবেশপথ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর অন্যতম প্রধান পথ। সাম্প্রতিক হামলার পর সেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির পর্যায়ে নেমে এসেছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে সপ্তাহান্তে মাত্র পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছিল, যেখানে আগের সপ্তাহান্তে সংখ্যা ছিল ৩১। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক ট্যাংকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে হরমুজ অতিক্রমের পরামর্শ দিয়েছে, যাতে তাদের জন্য সামরিক আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়।

এই সংকটের দ্বিতীয় প্রান্ত এখন বাব আল-মান্দাব। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার ফলে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোকা এবং কৌশলগত পেরিম দ্বীপ তাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পেরিম দ্বীপটি বাব আল-মান্দাবের মাঝামাঝি অবস্থান করায় এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। এই জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এর মাধ্যমে জাহাজগুলো সুয়েজ খাল হয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাতায়াত করে।

দুটি জলপথের সংকটের গুরুত্ব এখানেই যে, এগুলো শুধু আঞ্চলিক সামুদ্রিক রুট নয়; এগুলো বিশ্বের জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ‘চোকপয়েন্ট’। হরমুজে বাধা সৃষ্টি হলে পারস্য উপসাগরীয় তেল রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা সংকট হলে এশিয়া-ইউরোপের সমুদ্রবাণিজ্যকে দীর্ঘ বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দিতে হতে পারে। ইতোমধ্যে লোহিত সাগরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বহু জাহাজকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলতে হয়েছে, ফলে যাত্রার সময় ও জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে সৌদি আরবের East-West oil pipeline সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া। ১২ সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত ড্রোন হামলার পর নিরাপত্তার কারণে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে। এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌদি তেলকে লোহিত সাগরের দিকে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। রয়টার্সের হিসাবে পাইপলাইনটির সক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় ৪–৫ মিলিয়ন ব্যারেল।

অর্থাৎ, সংকটটি এখন কেবল একটি সমুদ্রপথের নয়। হরমুজে সামুদ্রিক চলাচল সংকুচিত, বাব আল-মান্দাবে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে এবং সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলভিত্তিক বিকল্প তেলপথও সাময়িকভাবে বন্ধ। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহের অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। এই চাপের প্রতিফলন ইতোমধ্যে তেলের বাজারেও দেখা যাচ্ছে; ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে এবং ১১ সেপ্টেম্বর এক পর্যায়ে প্রায় ১০৮ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।

বিশ্লেষকদের বড় উদ্বেগ এখন একটি সম্ভাব্য chain reaction নিয়ে। যদি হরমুজে চলাচল দীর্ঘ সময় সীমিত থাকে এবং একই সময়ে বাব আল-মান্দাবও ব্যাপকভাবে অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তাহলে জ্বালানি পরিবহন থেকে শুরু করে কনটেইনার শিপিং, বিমা ব্যয়, খাদ্য ও শিল্পপণ্যের পরিবহন খরচ—সবকিছুর ওপর চাপ বাড়তে পারে। এশিয়ার তেল আমদানিকারকদের জন্য বিকল্প সমুদ্রপথ দীর্ঘ হওয়ায় অতিরিক্ত সময় ও জ্বালানি ব্যয় যুক্ত হতে পারে।

এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আরও বিস্তৃত হতে পারে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। জাহাজের রুট পরিবর্তিত হলে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের সরবরাহ সময়ও বাড়তে পারে। ফলে একটি আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির সরবরাহ-নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে।

তবে পরিস্থিতিকে এখনই “দুটি সমুদ্রপথ সম্পূর্ণ বন্ধ” হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক হবে না। হরমুজে জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকলেও তা ব্যাপকভাবে কমেছে, আর বাব আল-মান্দাবের ক্ষেত্রেও মূল উদ্বেগ হলো নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য বাধা। হুথিরা নৌ চলাচল নিরাপদ থাকার দাবি করলেও সৌদি জাহাজকে তারা ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করেছে—যা বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনাকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো—বিশ্বের কাছে কি তৃতীয় কোনো কার্যকর বিকল্প আছে? কেপ অব গুড হোপ হয়ে জাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও তা দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। আর স্থলভিত্তিক বিকল্প পাইপলাইনও যদি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের গতিপথ নয়, বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতাও নির্ধারণ করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু দুটি প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নয়—প্রশ্ন হলো, বিশ্বের অর্থনীতি কতটা নির্ভরশীল কয়েকটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথের ওপর। হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব একই সময়ে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে পড়লে একটি আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে তেল, জাহাজ, খাদ্য, শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে ছড়িয়ে পড়ে—তার বড় পরীক্ষা এখন শুরু হয়েছে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com