নীরব মহামারি: শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার, নেপথ্য কারণ ও সামাজিক বাস্তবতা

আজ আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বজুড়ে এই দিবসের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হলেও আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার মতো বিষয়গুলো এখনো উপেক্ষিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোর উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে তরুণেরা, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি মানসিক ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং প্রতিনিয়ত আত্মহননের মতো চরম পথ বেছে নিচ্ছেন।

 

বিগত ১ বছরে আত্মহত্যার চিত্র: কতজন ও কারা?

আঁচল ফাউন্ডেশনের হালনাগাদ সমীক্ষাতথ্য অনুযায়ী, বিগত ১ বছরে দেশের ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন (এর আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৫১৩ জন)। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩৩ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর অকালমৃত্যু ঘটছে।

 

এই পরিসংখ্যানকে স্তর ও লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়:

শিক্ষার স্তরভিত্তিক বিন্যাস:

স্কুলগামী শিক্ষার্থী: ১৯০ জন (৪৭.৪%) আত্মহত্যার শীর্ষে রয়েছে কিশোর বয়সী শিক্ষার্থীরা। কলেজ শিক্ষার্থী: ৯২ জন (২২.৮%),বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী: ৭৭ জন (১৯.১%) (যার মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি),মাদ্রাসা শিক্ষার্থী: ৪৪ জন (১০.৭%)

 

লিঙ্গভিত্তিক হার : নারী শিক্ষার্থী: ২৪৯ জন (৬১.৮%),পুরুষ শিক্ষার্থী: ১৫৪ জন (৩৮.২%)

(স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের হার সামান্য বেশি।)

 

বয়সভিত্তিক বিন্যাস: সর্বাধিক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে (প্রায় ৬৬.৫%)।

গবেষণা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী আত্মহত্যার নেপথ্যে প্রধানত নিম্নলিখিত কারণগুলো কাজ করেঃ

১. একাডেমিক চাপ ও পরীক্ষার ফলাফল (পরীক্ষায় ফেল বা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়া): বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরপরই আত্মহত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

২. মানসিক নির্যাতন, অপমান ও সাইবার বুলিং: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া, চুরির অপবাদ দেওয়া কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কটূক্তির শিকার হওয়া।

৩. আবেগীয় সংকট ও সম্পর্কঘটিত টানাপোড়েন: প্রেমঘটিত বিচ্ছেদ, সম্পর্কে প্রতারণা কিংবা অভিমান।

৪. পারিবারিক কলহ ও অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ: অভিভাবক ও সমাজের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, পরিবারের অনাকাঙ্ক্ষিত তুলনা ও পারিবারিক সহিংসতা।

৫. যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল: সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়া এবং বিচারের আশাহীনতা।

৬. আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপ: পরিবারে চরম আর্থিক দৈন্য বা এনজিও ঋণের জাঁতাকলে নাভিশ্বাস ওঠা।

 

এই কারণগুলো কতটা যুক্তিযুক্ত বা সংগত?

মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ‘আত্মহত্যা কোনো যুক্তিযুক্ত সমাধান নয়’—তবে একজন সংকটাপন্ন মানুষের মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি:

 

ব্যর্থতা নাকি ব্যবস্থার ত্রুটি?

শিক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষায় ফেল করে বা কাঙ্ক্ষিত জিপিএ পায় না, তখন তারা মনে করে তাদের জীবনের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এটি তাদের একক ব্যর্থতা নয়; বরং আমাদের একমুখী জিপিএ-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা। সমাজ ও পরিবার সফলতার একটি সংকীর্ণ সংজ্ঞা চাপিয়ে দেয়, যার ফলে শিশুরা হেরে যাওয়াকে সহ্য করতে পারে না।

বয়ঃসন্ধিকালের আবেগপ্রবণতা:

১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সে মস্তিষ্কের গঠনগত ও হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে কিশোর-কিশোরীরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ থাকে। তাদের ‘আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা’ (ঊছ) এবং সংকট মোকাবিলার সহনশীলতা (জবংরষরবহপব) কম থাকে। এ কারণে সাময়িক অপমান, বকাঝকা বা প্রেমঘটিত বিচ্ছেদকে তারা জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় বলে ভুল করে।

সামাজিক লজ্জা ও আশাহীনতা:

বিষণ্নতা বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে আমাদের সমাজে ‘পাগলামি’ বা ‘দূর্বলতা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে একজন ব্যক্তি যখন মানসিক কষ্টে ভোগে, তখন সে কারো সাহায্য চাইতে পারে না। চরম আশাহীনতা (ঐড়ঢ়বষবংংহবংং) থেকে সে মনে করে মৃত্যুই একমাত্র মুক্তি।

সাইবার বুলিং ও সামাজিক বিচার:

অনলাইনে বা সমাজে যখন কাউকে অপবাদ দেওয়া হয় বা হেয় করা হয়, তখন সমাজ তার পাশে দাঁড়ানোর বদলে তাকেই অভিযুক্ত করে। এই বিচারহীনতা ও লোকলজ্জার ভয় মানুষকে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

 

উত্তরণ ও করণীয়:

১. মনোভাবের পরিবর্তন: জিপিএ বা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যই জীবনের শেষ কথা নয়—এই বার্তা শিশু বয়স থেকেই পরিবার ও স্কুলে দিতে হবে।

২. প্যারেন্টাল এডুকেশন: অভিভাবকদের সন্তানদের মানসিক পরিবর্তন বুঝতে হবে। তুচ্ছ কারণে বকাঝকা, তুলনা করা কিংবা বাল্যবিবাহের হুমকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সেলিং: প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট চালু রাখা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করা।

৪. সাইবার সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা: অনলাইনে হেনস্তা বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকারদের দ্রুিক আইনি ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

শিক্ষার্থীরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের জীবন রক্ষা করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র ও সংবেদনশীল সমাজের দায়িত্ব।

লেখক: শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী (শিপন), সাংবাদিক। 

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com