BRICS কি সত্যিই পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হতে পারবে?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০০ এএম
বিশেষ প্রতিনিধি: সঞ্জয় মজুমদার
ভারতের নয়াদিল্লিতে ১২–১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া BRICS শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। ১১ সদস্যের সম্প্রসারিত BRICS একদিকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও Global South-এর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি করছে, অন্যদিকে সদস্যদের ভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ, চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জোটটির ঐক্য ও কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
BRICS-এর বর্তমান উত্থানকে বুঝতে হলে এর জন্মের ইতিহাসে ফিরে তাকাতে হয়। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে শুরু হওয়া BRIC পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হওয়ার পর BRICS-এ পরিণত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জোটটির পরিধি আরও বেড়েছে। ফলে এটি এখন কেবল কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং Global South-এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অর্থনৈতিক শক্তি। ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা PPP হিসেবে BRICS দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক তাদের আওতায় পড়ে। তবে এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, মুদ্রা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক নীতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
তবু BRICS-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় ডলারের ওপর অতিনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা। ২০২৫ সালের রিও ডি জেনেইরো ঘোষণায় সদস্যরা স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন এবং আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেছিল। BRICS Cross-Border Payments Initiative নিয়েও কাজ এগিয়েছে। এর লক্ষ্য কোনো একটি নতুন মুদ্রা দিয়ে রাতারাতি ডলারকে প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত, কম খরচের এবং অধিক কার্যকর অর্থপ্রবাহের ব্যবস্থা তৈরি করা।
এই প্রক্রিয়ায় New Development Bank (NDB) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের লক্ষ্য BRICS ও অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতিতে অবকাঠামো এবং টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা। ব্যাংকটি স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন বাড়ানো, অর্থের উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং Global South-এর উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে এখানেই BRICS-এর সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা—বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা আর বিদ্যমান পশ্চিমা ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করা এক বিষয় নয়। IMF, World Bank, SWIFT এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংযোগ, ডলারের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা এবং উন্নত আর্থিক অবকাঠামো পশ্চিমা ব্যবস্থাকে এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। ফলে BRICS-এর জন্য একটি সম্পূর্ণ বিকল্প বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত জটিল কাজ।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো BRICS-এর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। চীন ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে; আবার রাশিয়া, ইরান ও অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্কের ধরনও এক নয়। ভারতের মতো দেশ একই সঙ্গে BRICS-এর ভেতরে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে। ফলে BRICS-কে একটি ঐক্যবদ্ধ ‘পশ্চিমবিরোধী জোট’ হিসেবে দেখা বাস্তবতার অতিসরলীকরণ হবে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও সদস্যদের ভিন্ন স্বার্থ ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে জোটটির প্রধান সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এবারের নয়াদিল্লি সম্মেলনে সেই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইরানের ভূমিকা, জ্বালানি সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর সম্পর্ক BRICS-এর অভিন্ন অবস্থান তৈরিকে কঠিন করে তুলছে। একই সময়ে BRICS-এর অর্থমন্ত্রীরা IMF ও World Bank-এর মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি তুলেছেন এবং আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন।
তবে BRICS-এর প্রভাব কেবল অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারেও জোটটি নিজেদের ভূমিকা বাড়াতে চাইছে। ২০২৫ সালের রিও সম্মেলনে বৈশ্বিক শাসন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, AI ও জলবায়ুসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১২৬টি অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশসহ Global South-এর দেশগুলোর জন্য BRICS-এর এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শক্তিশালী BRICS উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিকল্প বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো অর্থায়ন এবং কূটনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়াতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে জোটটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব যদি বাড়ে, তাহলে বড় অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও BRICS একটি সমন্বিত বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হতে বাধার মুখে পড়বে।
তাহলে কি BRICS পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হতে পারবে? স্বল্পমেয়াদে সম্পূর্ণ বিকল্প হওয়ার সম্ভাবনা কম; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বব্যবস্থাকে আরও বহুমেরু করে তোলার ক্ষমতা BRICS-এর রয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি সম্ভবত ‘পশ্চিমকে সরিয়ে BRICS আসবে কি না’—এখানে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রকৃত পরিবর্তন হতে পারে এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার দিকে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের পাশাপাশি চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল এবং অন্যান্য Global South শক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি প্রভাব রাখবে।
নয়াদিল্লির সম্মেলনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই কোনো নতুন মুদ্রা ঘোষণা করা বা পশ্চিমকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা নয়। পরীক্ষা হলো—ভিন্ন স্বার্থের ১১টি দেশ কতটা কার্যকরভাবে একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কর্মসূচিতে এগোতে পারে। যদি BRICS স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে পারে, তবে এটি পশ্চিমা ব্যবস্থার সরাসরি বিকল্প না হয়েও বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে শক্তিশালী দ্বিতীয় স্তরের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত BRICS-এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তার সদস্যসংখ্যা নয়, বাস্তব প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সক্ষমতা, পারস্পরিক আস্থা এবং অভিন্ন স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়। যদি সেই সমন্বয় সফল হয়, তাহলে আগামী দশকের বিশ্ব হয়তো আর এককেন্দ্রিক থাকবে না; বরং ক্রমেই আরও প্রতিযোগিতামূলক ও বহুমেরু হয়ে উঠবে।