মানুষের মুক্তি, সভ্যতার পুনর্জাগরণ ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার সন্ধান

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম

মানুষের ইতিহাস মূলত মুক্তির ইতিহাস। কখনো মানুষ মুক্তি চেয়েছে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে, কখনো শোষণ-বঞ্চনা থেকে, আবার কখনো অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও চিন্তার দাসত্ব থেকে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—মানুষ কি সত্যিই মুক্ত? রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জনের পরও যদি মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে না পারে, ভিন্নমত প্রকাশের সাহস হারিয়ে ফেলে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিপীড়নের শিকার হয় কিংবা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে সেই স্বাধীনতার পূর্ণতা কোথায়?

প্রকৃত মুক্তি কেবল ভৌগোলিক সীমানা কিংবা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে চিন্তার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। মানুষের ওপর মানুষের অন্যায় আধিপত্যের অবসান ঘটানো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করাই হওয়া উচিত সভ্যতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

মহান চিন্তাবিদ ও সভ্যতা বিশ্লেষক মালেক বিন নবীর সভ্যতাবিষয়ক চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র রয়েছে—মাটি, মানুষ ও সময়ের সমন্বয়ে সভ্যতার বিকাশ ঘটে। এই ধারণার তাৎপর্য গভীর। একটি ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বসবাসকারী মানুষের চিন্তা-চেতনা, যোগ্যতা ও কর্মপ্রচেষ্টা এবং সময়ের যথাযথ ব্যবহারের সমন্বয়েই একটি জাতি উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ সভ্যতা নির্মাণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষ। মানুষের চিন্তার পরিবর্তন ছাড়া সমাজের মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়; ব্যক্তিত্বের বিকাশ ছাড়া রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়নও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

 

রাষ্ট্রের সংকটের মূলে মানুষের চিন্তার সংকট

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তির বিস্তার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির বিকাশ সমানতালে এগোয়নি। আমরা উন্নয়নের কথা বলছি, কিন্তু উন্নত নাগরিক গড়ে তোলার প্রশ্নে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। শিক্ষার বিস্তার ঘটছে, কিন্তু সেই শিক্ষা কতটা চিন্তাশীল, মানবিক, দায়িত্বশীল ও সৃজনশীল মানুষ তৈরি করছে, তা নিয়ে আত্মসমালোচনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এটি শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করতে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে শেখানোর পরিবর্তে মুখস্থনির্ভর প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ রাখে। চাকরি পাওয়াই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ানোয় জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, উদ্ভাবন, মানবিকতা ও নেতৃত্বের বিকাশ প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায় না।

অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ অর্জন কিংবা কর্মসংস্থানের যোগ্যতা তৈরি নয়; এর লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে চিন্তাশীল, ন্যায়পরায়ণ, আত্মনির্ভর ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না, বরং দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র, মানবতা ও বিশ্বসভ্যতার সমস্যাগুলো বুঝতে শিখবে এবং সেগুলোর সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার জনসংখ্যার পরিমাণে নয়; বরং সেই জনগোষ্ঠীর চিন্তাশক্তি, দক্ষতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতায়। বাংলাদেশের বিপুল যুবসমাজ আমাদের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারলে জনসংখ্যাগত সুবিধাই একসময় বেকারত্ব, হতাশা, অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

 

যুবসমাজ: পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি

ইতিহাসের প্রতিটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নতুন চিন্তা, সাহস, সৃজনশীলতা এবং প্রচলিত ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা তরুণদের পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত করে। কিন্তু তাদের কেবল রাজনৈতিক মিছিল, স্লোগান কিংবা ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় ব্যবহারের উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হলে সেই শক্তির অপচয় ঘটে।

তরুণদের প্রয়োজন চিন্তার স্বাধীনতা, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, গবেষণার পরিবেশ, নেতৃত্বের বিকাশ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থবহ অংশগ্রহণের অধিকার। তাদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগানোর জন্য শিক্ষা, শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং গবেষণার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে।

আজকের তরুণেরা বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের অসংগতি, মাদক, প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের উপস্থিতি বাড়লেও সেই উপস্থিতি কতটা জ্ঞাননির্ভর, যুক্তিবাদী ও ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের সহায়ক হচ্ছে, তা ভেবে দেখা জরুরি।

তরুণদের সামনে শুধু সমস্যার তালিকা তুলে ধরলেই হবে না; তাদের সমস্যা বিশ্লেষণ করতে এবং সমাধান খুঁজতে শেখাতে হবে। গড়ে তুলতে হবে গবেষণার অভ্যাস, সমালোচনামূলক চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তরুণদের বোঝাতে হবে—রাজনীতি মানেই ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা নয়। রাজনীতি হচ্ছে মানুষের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যে রাজনীতি মানুষের জীবনমান উন্নত করে না, নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে না এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে না, সে রাজনীতির উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

 

রাজনীতি হোক মানবকল্যাণের মাধ্যম

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বড় সংকট ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা, ভিন্নমতকে অবজ্ঞা করা, দলীয় আনুগত্যকে যোগ্যতার ওপরে স্থান দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা গণতান্ত্রিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমে সামাজিক সম্পর্কেও ছড়িয়ে পড়ে, দুর্বল হয় পারস্পরিক আস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে নাগরিকের পরিচয় প্রথমত একজন মানুষ এবং অধিকারসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় সদস্য হিসেবে। তার রাজনৈতিক মত, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণে রাষ্ট্রীয় অধিকার খর্ব হতে পারে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহি এবং মানবাধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ নয়; এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে রেখে আইনের ভিত্তিতে পরিচালনা করা, প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন নয়; গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে আইনের সমতা, নাগরিকের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মধ্যে।

নতুন প্রজন্মকে এমন রাজনৈতিক দর্শনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, যেখানে প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতা, আধিপত্যের পরিবর্তে অংশগ্রহণ, ব্যক্তিস্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থ এবং ক্ষমতার পরিবর্তে দায়িত্ববোধ প্রাধান্য পাবে। রাজনীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষ; ক্ষমতা হবে জনসেবার দায়িত্ব, ব্যক্তিগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার নয়।

 

আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার পুনর্জাগরণ

বিশ্বায়নের যুগে কোনো জাতি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বেঁচে থাকতে পারে না। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান অনিবার্য। কিন্তু বিশ্বায়নের অর্থ নিজের ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বিসর্জন দেওয়া নয়। বরং নিজস্ব পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত থেকেই বিশ্বসভ্যতার সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি অন্যের জ্ঞান গ্রহণ করে, কিন্তু অন্ধ অনুকরণ করে না। নিজের ঐতিহ্যকে ধারণ করে, কিন্তু কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতাকে আঁকড়ে থাকে না। ঐতিহ্যের ইতিবাচক দিকগুলো সংরক্ষণ এবং ক্ষতিকর সামাজিক চর্চাগুলো পরিহারের মধ্য দিয়েই একটি সমাজ এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, লোকজ সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক সামাজিক সহাবস্থান এবং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহ্য আমাদের আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবিক মূল্যবোধ ও যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে।

বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে নৈতিকতা, আখলাক, আত্মসংযম, সহমর্মিতা ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো জরুরি। কারণ জ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু নৈতিকতার অভাব সেই শক্তিকে ধ্বংসের হাতিয়ারে পরিণত করতে পারে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা যদি মানবিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে বৈষম্য, প্রতারণা, বিদ্বেষ ও নিয়ন্ত্রণের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

প্রকৃত সভ্যতার পরিচয় কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; বরং মানুষ কতটা ন্যায়পরায়ণ, সহনশীল, দায়িত্বশীল এবং অন্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, তার মধ্যেও নিহিত রয়েছে। পৃথিবীকে শুধু ভোগের বস্তু হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের আমানত হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

 

বিশ্বব্যবস্থার বৈষম্য ও নতুন সভ্যতার প্রয়োজন

বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার অসম বণ্টন একটি বড় বাস্তবতা। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক আধিপত্য, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সংকুচিত করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের কথা বলা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৌশলগত স্বার্থ ও ক্ষমতার হিসাব প্রাধান্য পায়।

ফিলিস্তিনের দীর্ঘস্থায়ী সংকট, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নে অসংগতির অভিযোগ বিশ্বব্যবস্থার নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একইভাবে যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্য মানবসভ্যতার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে।

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও এর সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। উন্নত প্রযুক্তি, পুঁজি, জ্বালানি, তথ্য ও জ্ঞানসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ যাদের বেশি, তারা বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে অধিক প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। ফলে বৈশ্বিক বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ন্যায়সংগত ব্যবহারের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ পরিস্থিতিতে কোনো একক জাতি, রাষ্ট্র কিংবা সভ্যতার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয়; বরং ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সম্মান, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চিন্তা জরুরি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত শক্তির প্রদর্শন নয়, ন্যায়সংগত সহযোগিতা; প্রতিযোগিতার নামে শোষণ নয়, পারস্পরিক উন্নয়ন।

প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকানের রাজনৈতিক ও সভ্যতাবিষয়ক চিন্তায় বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আধিপত্যমূলক কাঠামোর বিপরীতে বিকল্প অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার ধারণা গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর চিন্তার আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—মানুষ ও রাষ্ট্র কি প্রচলিত ব্যবস্থার বৈষম্যকে অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেবে, নাকি ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বিকল্প পথ অনুসন্ধান করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন চিন্তার স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা এবং বাস্তবতাকে যুক্তির আলোকে মূল্যায়ন করার সক্ষমতা। কোনো ব্যবস্থাকে শুধু দীর্ঘদিনের প্রচলনের কারণে ন্যায়সংগত বলে মেনে নেওয়া যায় না। আবার বিকল্প ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও হতে হবে বাস্তবসম্মত, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক।

ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণের আলোচনাও এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এর অর্থ অন্য কোনো সভ্যতার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা অতীতের কোনো ব্যবস্থাকে অপরিবর্তিতভাবে ফিরিয়ে আনা নয়। বরং জ্ঞানচর্চা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঐতিহ্যকে আধুনিক বাস্তবতায় কার্যকর করে তোলাই হওয়া উচিত এর মূল লক্ষ্য।

ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞানচর্চা, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, তার ইতিবাচক শিক্ষা গ্রহণ করে সমকালীন সমাজে বিজ্ঞান, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও মানবকল্যাণের চর্চাকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। সভ্যতার পুনর্জাগরণ কখনো কেবল আবেগ, স্লোগান কিংবা অতীতের গৌরব স্মরণের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা, উৎপাদনশীল অর্থনীতি, নৈতিক নেতৃত্ব এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা।

ডি-৮-এর মতো সহযোগিতামূলক উদ্যোগকে শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা যেতে পারে। উন্নয়নশীল ও মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের বিনিময় বাড়ানো গেলে তা তাদের সম্মিলিত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা, পারস্পরিক আস্থা, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ওপর।

 

মুক্তির সূচনা ব্যক্তি থেকে, বিস্তার রাষ্ট্র ও বিশ্বে

মানুষের মুক্তি এবং রাষ্ট্রের মুক্তি পরস্পরের পরিপূরক। ব্যক্তির চিন্তার স্বাধীনতা ছাড়া রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্থবহ হয় না। আবার শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া নাগরিকের অধিকারও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকে না। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; এদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই সভ্যতার অগ্রগতি নির্ধারিত হয়।

পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে ব্যক্তি থেকে, পরিবার থেকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবং সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে। পরিবারে সহনশীলতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তচিন্তা, সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে। তরুণদের হাতে তুলে দিতে হবে জ্ঞানের আলো, চিন্তার স্বাধীনতা, নৈতিকতার শক্তি ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের শিক্ষা।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় এবং অন্যায়ের প্রতিকার চাইতে পারে। ব্যক্তির দায়িত্বশীলতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের জবাবদিহিও অপরিহার্য।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পৃথিবী পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার আগে নিজের চিন্তা ও কর্মকে পরিবর্তন করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার নৈতিক সাহস, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা এবং জনকল্যাণে কাজ করার প্রবণতা থেকেই বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হয়।

একটি ফুল দিয়ে যেমন বসন্ত হয় না, তেমনি একজন মানুষের প্রচেষ্টায় রাতারাতি সভ্যতার পরিবর্তন ঘটে না। কিন্তু প্রতিটি বসন্তের সূচনা হয় একটি ফুলের মধ্য দিয়েই। তেমনি প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে থাকে কিছু মানুষের চিন্তার সাহস, নৈতিক অবস্থান এবং অবিচল কর্মপ্রচেষ্টা। সেই প্রথম ফুল হয়ে ওঠার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।

আমরা যদি চিন্তার দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারি, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, যুবসমাজকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার শক্তিতে গড়ে তুলতে পারি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সম্মানের নীতিকে গুরুত্ব দিতে পারি, তাহলে একটি নতুন সভ্যতার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সভ্যতার সংকটের সমাধান আরও বেশি ক্ষমতা কিংবা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মধ্যে নেই; বরং মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্যেই রয়েছে। মুক্তির লড়াই কোনো জাতি, ধর্ম কিংবা ভূখণ্ডের একক লড়াই নয়—এটি সমগ্র মানবতার লড়াই। এই লড়াইয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষ মানুষের প্রভু নয়, সহযোগী; যেখানে শক্তির চেয়ে ন্যায় বড়, আধিপত্যের চেয়ে মানবিকতা বড় এবং বিভাজনের চেয়ে মানুষের মর্যাদা বড়।

কারণ মানুষের প্রকৃত মুক্তি ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না, কোনো সভ্যতার অগ্রগতি টেকসই হয় না, আর কোনো বিশ্বব্যবস্থাই ন্যায়সংগত হয়ে উঠতে পারে না।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com