‎কুবি শিক্ষার্থী ফারজানার মরদেহ উদ্ধার, স্বামীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম

কুবি প্রতিনিধি:

‎নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ভাড়া বাসা থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলামের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্বামী নাজমুল আলমসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তাঁর বাবা। 

‎সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিষয়টি নিশ্চিত করেন ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজী সুমন মাহতাব।

‎মামলায় অভিযুক্ত অন্যরা হলেন-আব্দুর রহিম (৫০), আফরোজা বেগম (৪৫), সায়মা আক্তার (২৫), রাসেল (৪২), সাইফুল আলম (৩৬) ও রোকেয়া বেগম (৬৮)। তাঁদের সবার বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার নূরপুরের তালুকদার বাড়ি এলাকায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

‎মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে নাজমুল আলমের সঙ্গে ফারজানার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে নাজমুল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ফারজানার কাছে যৌতুক দাবি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর বাবা। এ নিয়ে পারিবারিকভাবে সমঝোতার চেষ্টা করেও সাড়া না পেয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে একটি সিআর মামলা করেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে ফারজানা আবার স্বামীর সঙ্গে সংসার শুরু করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

‎এজাহারে আরও বলা হয়, গত ২০ অক্টোবর ফারজানা স্বামীর ফতুল্লার ভাড়া বাসায় যান। ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দাম্পত্য বিষয় ও আগের মামলা নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় বলে বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়া ও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারেন তাঁর বাবা। এ সময় নাজমুল তাঁকে কটূক্তি করেন এবং সংসার করতে ভালো না লাগলে আত্মহত্যা করে মারা যেতে বলেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।

‎এজাহার অনুযায়ী, ওই দিন রাত ৯টার দিকে ফারজানার স্বামীর ভগ্নিপতি আব্দুর রহিম ফোন করে তাঁকে জানান, ফারজানা শয়নকক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে শাড়ি পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছেন। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বাসায় গিয়ে তাঁর মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

‎ফারজানার বাবা এজাহারে আরও দাবি করেন, স্বামীর নির্যাতন ও প্ররোচনায় তাঁর মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এজাহারে ফারজানার হাতে লেখা একটি চিরকুটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

‎ফারজানা ইসলামের লেখা একটি চিরকুট প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এতে লেখা রয়েছে, ‘আমার মাকে তার কল না দেওয়া দোষের না, কিন্তু তার মাকে আমার কল না দেওয়া দোষের। উঠতে বসতে আমাকে খাবারের কোটা দেয়। আজকে সে আমাকে ফকিন্নি বললো, কারণ আমি তার টাকায় খাই। এর চেয়ে বেশি সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না। তার মায়ের বিচার যাতে আল্লাহ করে, যে দুইদিন পর পর আমার সংসারে ঝামেলা লাগাইছে। আর তার বড় বোন, ২য় বোন, ৩য় ভাইয়ের বিচার আল্লাহ যেন তাদের মেয়েদের মাধ্যমে করায়। আমাকে যাতে আমার বাড়িতে দাফন করা হয় এবং নাজমুল আলম যাতে আমার লাশ না ধরে। আব্বু, আম্মু, ভাই, ফয়সাল মাফ করে দিও আমাকে।’ যদিও ফারজানার ভাই আরিফুল ইসলামের দাবি এই চিঠিটা আড়াই মাসেরও বেশি আগের। নাজমুল যখন ফারজানার পরিবারের সাথে সমঝোতা করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসতে গিয়েছিলো তখনও এই চিঠিটাই দেখিয়েছিলো। 

‎ফারজানার পরিবারের অভিযোগ, মামলা করার ক্ষেত্রে পুলিশ তাঁদের সহযোগিতা করেনি। ফারজানা ইসলামের বড় ভাই আরিফুল ইসলাম বলেন, “মামলা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ আমাদের অসহযোগিতা করেছে। প্রথমে তারা মামলা নিতে চায়নি। পরে এসপির সঙ্গে কথা বলার পর মামলা নিতে রাজি হয়। শুরুতে তারা ছেলেপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী এজাহার লিখে ফেলছিল। আমি গিয়ে বলি, ‘আমাদের কথা না শুনে আপনারা কীভাবে মামলা করেন?’ পরে একজন পুলিশ আমাদের বলে এটাই এজহারের কথা কোন পরিবর্তন করতে পারবেন না৷ পরে এজাহারের প্রথম অংশ পরিবর্তন করতে পারলেও নিচের অংশ পরিবর্তন করা যাবে না বলে জানায় আনোয়ার নামের এক পুলিশ। লাশ বাড়িতে নেওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ির মধ্যে থাকায় এজাহারের বিষয়টি আমরা আর খেয়াল করতে পারিনি। তবে আমার মনে হয়, নিচের অংশটুকু ছেলেপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে লেখা হয়েছে। আমাদের সন্দেহ, ছেলেপক্ষের সঙ্গে পুলিশের বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে।”

‎ফারজানার পাশে পাওয়া চিরকুটের বিষয়ে আরিফুল ইসলাম বলেন, “চিঠিটি আড়াই মাসেরও অনেক আগের লেখা। নাজমুল যখন ফারজানাকে সমঝোতার মাধ্যমে সংসারে ফিরিয়ে নিতে এসেছিল, তখন সে আমাকে চিঠিটি দেখিয়েছিল। তখন নাজমুল বলেছিলো চিঠিটা আরও অনেক আগের। প্রথমে আমরা লাশের পাশে কোনো চিঠি পাইনি। পুলিশকেও চিঠি উদ্ধার করতে দেখিনি। পরে আরিফুলের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের সঙ্গে বসার কিছুক্ষণ পর পুলিশ জানায়, ফারজানার পাশে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে।”

‎এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও উক্ত মামলা তদন্ত কর্মকর্তা গাজী সুমন মাহতাব বলেন, “৩০৬ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা হয়েছে। আমরা প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। তদন্তে আরও কোনো আসামির নাম উঠে এলে তাঁদেরও গ্রেপ্তার করব। আমরা প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা মনে করছি। যদি এটি পরিকল্পিত হত্যা হয়ে থাকে, তাহলে ময়নাতদন্তে তা উঠে এলে আবার মামলা হবে।”

‎মামলা নিতে অসহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “এটা তাদের ভুল ধারণা। উল্টো আমি তাদের ফোন করে পাচ্ছি না। ফোন দিয়ে আমরা তাদের থানায় আনতে পারছিলাম না, এখন বলছে আমরা মামলা নিচ্ছি না। পাবলিক অনেক কথা বলে, কিছু করার নেই। তাদের অনেকগুলো ফোন দেওয়ার পরও দুই ঘণ্টা পর আসে।”

‎উল্লেখ্য, গত ২৪ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় স্বামীর ভাড়া বাসা থেকে ফারজানা ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।

‎

‎

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com