নিরাপদ সড়ক: স্লোগানের বাইরে চাই কার্যকর আইন ও জবাবদিহি
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩২ এএম
‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬-এর এই প্রতিপাদ্য কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, জননিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি প্রত্যাশা। সেতু, মহাসড়ক, উড়ালসড়ক কিংবা দ্রুতগতির যান চলাচল উন্নয়নের দৃশ্যমান নিদর্শন হতে পারে। কিন্তু যে সড়কে প্রতিদিন মানুষের প্রাণহানি ঘটে, পরিবারে নেমে আসে স্থায়ী শোক, সেই উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না। প্রকৃত সমৃদ্ধির অন্যতম মাপকাঠি হলো—মানুষ কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে।
প্রতিবছর ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের পেছনে রয়েছে বেদনাবিধুর ইতিহাস। ১৯৯৩ সালের এই দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন নিহত হন। ব্যক্তিগত শোককে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে তিনি নিরাপদ সড়কের দাবিতে কাজ শুরু করেন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের স্বীকৃতি পায়। দীর্ঘদিনের প্রচার, আলোচনা ও নানা উদ্যোগের পরও সড়কে মৃত্যুর ঝুঁকি রয়ে গেছে। তাই এখন প্রশ্ন—দিবস পালন ও প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তব পরিবর্তন কতটা ঘটেছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই বছরের সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৪ জন, আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মডেলভিত্তিক অনুমান প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক অনুমানের এই ব্যবধান তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা ও হিসাবপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। উল্লেখ্য, এগুলো ২০২১ সালের তথ্য; ২০২৬ সালের বর্তমান মৃত্যুসংখ্যা নয়। তবে এই ব্যবধানই একটি নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত জাতীয় দুর্ঘটনা তথ্যভান্ডার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক দেশীয় পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। আপনার সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, বিআরটিএর হিসাবে আগস্ট ২০২৬-এ ৪১৭টি দুর্ঘটনায় ৪১৮ জন নিহত ও ৪৭৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে একই মাসে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত ও ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। ফাউন্ডেশনের হিসাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৬ জন, যা ওই মাসের মোট প্রাণহানির প্রায় ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ। দুই প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও উভয় হিসাবই সড়ক নিরাপত্তার নাজুক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। এসব তথ্যের তুলনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের হিসাবপদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহের আওতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সড়ক দুর্ঘটনাকে কেবল চালকের ভুল কিংবা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, চালকের ক্লান্তি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ অবকাঠামোর অভাব—সবকিছু মিলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিবহন মালিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে আইন প্রয়োগ যেন বড় দুর্ঘটনার পর কয়েক দিনের অভিযানেই সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরিবহন মালিক কিংবা সাধারণ চালক—সবার ক্ষেত্রে আইন সমানভাবে কার্যকর হতে হবে। একই সঙ্গে আইনের নামে হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধেও নজরদারি প্রয়োজন।
বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি সময়োপযোগী, সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন ও প্রয়োজনীয় বিধিবিধানের ঘাটতি পর্যালোচনা করা দরকার। আইন ও বিধিমালায় সড়ক নির্মাণের নিরাপত্তামান, যানবাহনের কারিগরি পরীক্ষা, চালকের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা, গতিসীমা, পথচারীর অধিকার, দুর্ঘটনার তদন্ত, জরুরি চিকিৎসা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব সুস্পষ্ট থাকতে হবে। তবে নতুন আইন প্রণয়নের অজুহাতে বর্তমান আইনের প্রয়োগ থামিয়ে রাখা যাবে না। আইন তৈরি যেমন জরুরি, তেমনি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, বাজেট, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
সড়ক নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নিয়মিত মনিটরিং ও জবাবদিহি। বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, ফায়ার সার্ভিস ও স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন সংস্থা কী দায়িত্ব পালন করবে, কাজের অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়িত হবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা স্পষ্ট থাকতে হবে। শুধু অভিযান বা জরিমানার সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করা যাবে না; দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমেছে কি না, সেটিই হবে মূল বিবেচ্য।
নিরাপদ সড়কের জন্য অবকাঠামো ও জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত কম গতিসীমা কার্যকর করতে হবে। ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, সড়কবাতি, নির্দেশক চিহ্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় এবং জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। পাশাপাশি পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য সমন্বয় করে জাতীয় দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
জনসচেতনতা ও ব্যক্তিগত দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। চালককে গতিসীমা মানতে হবে, মোটরসাইকেলে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করতে হবে, গাড়িতে সিটবেল্ট বাঁধতে হবে এবং গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। পথচারীদেরও ট্রাফিক সংকেত ও নিরাপদ পারাপারের নিয়ম মানতে হবে। তবে সচেতনতার দায়িত্ব নাগরিকের ওপর চাপিয়ে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। নিরাপদ আচরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্র ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের সার্থকতা তাই ব্যানার, র্যালি কিংবা আলোচনাসভায় সীমাবদ্ধ নয়। এই দিন হওয়া উচিত অগ্রগতি মূল্যায়ন, ব্যর্থতা শনাক্ত এবং সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উপলক্ষ। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাবে, শিক্ষার্থী নিশ্চিন্তে বিদ্যালয়ে যাবে এবং জীবিকার সন্ধানে বের হওয়া মানুষ সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফিরবে।
সড়কে মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক নিয়তি নয়; পরিকল্পনা, প্রতিরোধ ও জবাবদিহির মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন কার্যকর আইন, নিরপেক্ষ প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং ব্যর্থতার জবাবদিহি। উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সড়কে মানুষের জীবন সুরক্ষিত হলেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশা সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হয়ে উঠবে।
লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।