মতামত
নিরাপদ সড়ক: স্লোগানের বাইরে চাই কার্যকর আইন ও জবাবদিহি
নিরাপদ সড়ক: স্লোগানের বাইরে চাই কার্যকর আইন ও জবাবদিহি আইনের প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ই পারে সড়কে প্রাণহানি কমাতে ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬-এর এই প্রতিপাদ্য কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, জননিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি প্রত্যাশা। সেতু, মহাসড়ক, উড়ালসড়ক কিংবা দ্রুতগতির যান চলাচল উন্নয়নের দৃশ্যমান নিদর্শন হতে পারে। কিন্তু যে সড়কে প্রতিদিন মানুষের প্রাণহানি ঘটে, পরিবারে নেমে আসে স্থায়ী শোক, সেই উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না। প্রকৃত সমৃদ্ধির অন্যতম মাপকাঠি হলো—মানুষ কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে। প্রতিবছর ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের পেছনে রয়েছে বেদনাবিধুর ইতিহাস। ১৯৯৩ সালের এই দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন নিহত হন। ব্যক্তিগত শোককে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে তিনি নিরাপদ সড়কের দাবিতে কাজ শুরু করেন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের স্বীকৃতি পায়। দীর্ঘদিনের প্রচার, আলোচনা ও নানা উদ্যোগের পরও সড়কে মৃত্যুর ঝুঁকি রয়ে গেছে। তাই এখন প্রশ্ন—দিবস পালন ও প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তব পরিবর্তন কতটা ঘটেছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই বছরের সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৪ জন, আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মডেলভিত্তিক অনুমান প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক অনুমানের এই ব্যবধান তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা ও হিসাবপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। উল্লেখ্য, এগুলো ২০২১ সালের তথ্য; ২০২৬ সালের বর্তমান মৃত্যুসংখ্যা নয়। তবে এই ব্যবধানই একটি নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত জাতীয় দুর্ঘটনা তথ্যভান্ডার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। সাম্প্রতিক দেশীয় পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। আপনার সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, বিআরটিএর হিসাবে আগস্ট ২০২৬-এ ৪১৭টি দুর্ঘটনায় ৪১৮ জন নিহত ও ৪৭৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে একই মাসে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত ও ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। ফাউন্ডেশনের হিসাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৬ জন, যা ওই মাসের মোট প্রাণহানির প্রায় ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ। দুই প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও উভয় হিসাবই সড়ক নিরাপত্তার নাজুক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। এসব তথ্যের তুলনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের হিসাবপদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহের আওতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনাকে কেবল চালকের ভুল কিংবা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, চালকের ক্লান্তি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ অবকাঠামোর অভাব—সবকিছু মিলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিবহন মালিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে আইন প্রয়োগ যেন বড় দুর্ঘটনার পর কয়েক দিনের অভিযানেই সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরিবহন মালিক কিংবা সাধারণ চালক—সবার ক্ষেত্রে আইন সমানভাবে কার্যকর হতে হবে। একই সঙ্গে আইনের নামে হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধেও নজরদারি প্রয়োজন। বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি সময়োপযোগী, সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন ও প্রয়োজনীয় বিধিবিধানের ঘাটতি পর্যালোচনা করা দরকার। আইন ও বিধিমালায় সড়ক নির্মাণের নিরাপত্তামান, যানবাহনের কারিগরি পরীক্ষা, চালকের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা, গতিসীমা, পথচারীর অধিকার, দুর্ঘটনার তদন্ত, জরুরি চিকিৎসা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব সুস্পষ্ট থাকতে হবে। তবে নতুন আইন প্রণয়নের অজুহাতে বর্তমান আইনের প্রয়োগ থামিয়ে রাখা যাবে না। আইন তৈরি যেমন জরুরি, তেমনি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, বাজেট, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। সড়ক নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নিয়মিত মনিটরিং ও জবাবদিহি। বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, ফায়ার সার্ভিস ও স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন সংস্থা কী দায়িত্ব পালন করবে, কাজের অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়িত হবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা স্পষ্ট থাকতে হবে। শুধু অভিযান বা জরিমানার সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করা যাবে না; দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমেছে কি না, সেটিই হবে মূল বিবেচ্য। নিরাপদ সড়কের জন্য অবকাঠামো ও জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত কম গতিসীমা কার্যকর করতে হবে। ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, সড়কবাতি, নির্দেশক চিহ্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় এবং জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। পাশাপাশি পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য সমন্বয় করে জাতীয় দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জনসচেতনতা ও ব্যক্তিগত দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। চালককে গতিসীমা মানতে হবে, মোটরসাইকেলে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করতে হবে, গাড়িতে সিটবেল্ট বাঁধতে হবে এবং গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। পথচারীদেরও ট্রাফিক সংকেত ও নিরাপদ পারাপারের নিয়ম মানতে হবে। তবে সচেতনতার দায়িত্ব নাগরিকের ওপর চাপিয়ে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। নিরাপদ আচরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্র ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের সার্থকতা তাই ব্যানার, র্যালি কিংবা আলোচনাসভায় সীমাবদ্ধ নয়। এই দিন হওয়া উচিত অগ্রগতি মূল্যায়ন, ব্যর্থতা শনাক্ত এবং সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উপলক্ষ। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাবে, শিক্ষার্থী নিশ্চিন্তে বিদ্যালয়ে যাবে এবং জীবিকার সন্ধানে বের হওয়া মানুষ সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফিরবে। সড়কে মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক নিয়তি নয়; পরিকল্পনা, প্রতিরোধ ও জবাবদিহির মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন কার্যকর আইন, নিরপেক্ষ প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং ব্যর্থতার জবাবদিহি। উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সড়কে মানুষের জীবন সুরক্ষিত হলেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশা সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হয়ে উঠবে। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: বিনোদন থেকে আসক্তি, দায় এড়াতে পারে না পরিবার
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: বিনোদন থেকে আসক্তি, দায় এড়াতে পারে না পরিবার -মোহাম্মদ হাসান প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্মার্টফোন এখন অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু এই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার যখন শিশু-কিশোরদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা আর নিছক ব্যক্তিগত অভ্যাস থাকে না; হয়ে ওঠে পরিবার ও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। একসময় স্কুল কিংবা মাদ্রাসা থেকে ফিরে শিশুরা মাঠে খেলত, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাত, গল্পের বই পড়ত কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিত। এখন অনেক শিশুর অবসর কাটে স্মার্টফোনের পর্দায় চোখ রেখে। অনলাইন গেম, কার্টুন, টিকটক ও বিভিন্ন ভিডিওতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। শুরুতে শিশুকে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় মনে হলেও একপর্যায়ে তা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। ফোন ছাড়া খাওয়াদাওয়া, সময় কাটানো কিংবা স্বাভাবিক আচরণ বজায় রাখাও তখন কঠিন হয়ে পড়ে। আসক্তির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব শৈশব মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশপর্ব। এ সময় শিশুর চিন্তাশক্তি, আবেগ, সামাজিক দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। খেলাধুলা, প্রকৃতির সংস্পর্শ, বন্ধুত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে কথোপকথন এই বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা এসব অভিজ্ঞতার সুযোগ সংকুচিত করে দিতে পারে। দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, চোখের ক্লান্তি ও মেজাজের পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাস্তব জীবনের সম্পর্কেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব ঝুঁকি শিশুর বয়স, ব্যবহারের ধরন, কনটেন্ট এবং পারিবারিক পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন গেমের আকর্ষণ, নতুন ভিডিও দেখার আগ্রহ এবং বারবার আসা নোটিফিকেশন শিশুদের ঘন ঘন ফোনের দিকে ফিরিয়ে নেয়। ফলে পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও পারিবারিক সম্পর্ক উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। দায় এড়াতে পারেন না অভিভাবকেরা শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় অভিভাবকদেরও ভূমিকা থাকে। শিশুর কান্না থামাতে, খাওয়ানোর সময় কিংবা নিজেদের ব্যস্ততা সামলাতে ফোন দিয়ে রাখেন অনেকেই। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে শিশুকে শান্ত করার এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে তার আচরণ ও দৈনন্দিন রুটিনে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সন্তানকে সময় দেওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তিকে তার সঙ্গী বানিয়ে দিচ্ছি? সন্তানের মনের কথা শোনা, তার আনন্দ-বেদনা বোঝা কিংবা তার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ কি আমরা নিজেরাই কমিয়ে দিচ্ছি? বাস্তবতা হলো, অনেক অভিভাবকও দিনের বড় একটি সময় স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকেন। সন্তানকে ফোন কম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে নিজেরা যদি সারাক্ষণ পর্দায় চোখ রাখি, তাহলে সেই নির্দেশ কতটা কার্যকর হবে? শিশুরা উপদেশের চেয়ে বড়দের আচরণ অনুকরণ করে বেশি শেখে। তাই সন্তানের অভ্যাস বদলাতে হলে আগে নিজেদের অভ্যাসের দিকেও নজর দিতে হবে। নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন সচেতন নিয়ন্ত্রণ শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহার কমাতে শুধু বকাঝকা কিংবা হঠাৎ ফোন কেড়ে নেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবসম্মত নিয়ম, ধৈর্য এবং বিকল্প আনন্দের ব্যবস্থা। প্রথমত, পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও পারিবারিক সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্মার্টফোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশুদের মাঠে খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা, সাইকেল চালানো ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে। ফোনের বিকল্প হিসেবে আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। তৃতীয়ত, পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিন কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, সন্তানের সঙ্গে কথা বলা এবং তার সমস্যার প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ঘুমের আগে স্মার্টফোন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুরা অনলাইনে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোনো অনুপযুক্ত কনটেন্ট বা হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে। তবে নজরদারি যেন সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক নষ্ট না করে। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো সমস্যায় পড়লে শিশু নির্ভয়ে মা-বাবাকে জানাতে পারে। পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তির দায় শুধু পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলেও চলবে না। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত শিশুদের উপযোগী কনটেন্ট, কার্যকর অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ও অনলাইন নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা। অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল সচেতনতা, অনলাইন নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে হবে। একই সঙ্গে মাঠ, খেলার জায়গা, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। শিশুরা যেন স্মার্টফোনকেই আনন্দের একমাত্র উৎস মনে না করে, সে জন্য পরিবার ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তবে স্মার্টফোনকে সম্পূর্ণ শত্রু ভাবারও কারণ নেই। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি শিক্ষা, জ্ঞান অর্জন ও সৃজনশীলতার কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। মূল সমস্যা প্রযুক্তি নয়; সমস্যা হলো বয়স ও প্রয়োজন বিবেচনা না করে এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। সন্তানের স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে বিষয়টি অবহেলা করা যাবে না। প্রয়োজনে শিশু বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নিতে হবে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের সুস্থ চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতার বিকাশ নিশ্চিত করা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে—আমরা কি তাকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখাচ্ছি, নাকি অজান্তেই বাস্তব পৃথিবী থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি? শিশুকে শুধু ফোন থেকে দূরে রাখলেই হবে না; তার জীবনে পারিবারিক ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, খেলাধুলা, বই ও সৃজনশীলতার জায়গা বাড়াতে হবে। শিশুর হাতে স্মার্টফোন থাকতেই পারে, কিন্তু স্মার্টফোন যেন তার শৈশব কেড়ে না নেয়। প্রযুক্তি হোক বিকাশের সহায়ক, আসক্তির শৃঙ্খল নয়—এই হোক পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
অপরাধ দমনে ইসলাম: আইন নয়, মূল্যবোধেরও পুনর্জাগরণ দরকার
অপরাধ দমনে ইসলাম: আইন নয়, মূল্যবোধেরও পুনর্জাগরণ দরকার -মোহাম্মদ হাসান মানবসমাজে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও ন্যা য়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। আইন মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু বিবেকের আদালতকে জাগ্রত করতে পারে না সবসময়। আর যখন মানুষের ভেতরের নৈতিক বোধ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই সমাজে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, দুর্নীতি, মাদকাসক্তি, প্রতারণা, যৌন সহিংসতা ও নানা ধরনের অপরাধ বিস্তার লাভ করে। অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের আইন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেবল শাস্তির ভয় দেখিয়ে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা যায় না। প্রয়োজন মানুষের ভেতরে এমন একটি নৈতিক শক্তি তৈরি করা, যা তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে গেলেও অন্যায় থেকে বিরত রাখবে। এখানেই ইসলামি মূল্যবোধের গুরুত্ব গভীরভাবে সামনে আসে। ইসলাম শুধু কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; এটি মানুষের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনের জন্য নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, ন্যায়, মানবিকতা ও জবাবদিহির একটি সুসংহত কাঠামো প্রদান করে। এই মূল্যবোধগুলো যথাযথভাবে চর্চা করা গেলে সামাজিক অপরাধের অনেক কারণই শিকড় থেকে দুর্বল করা সম্ভব। মূল্যবোধের ভিত্তি আল্লাহভীতি ও নৈতিক জবাবদিহি ইসলামি মূল্যবোধের অন্যতম ভিত্তি হলো তাকওয়া—অর্থাৎ আল্লাহসচেতনতা। একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে তার প্রকাশ্য ও গোপন সব কর্মকাণ্ডের জন্য একদিন জবাবদিহি করতে হবে, তখন তার মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি তৈরি হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সৎকর্ম ও আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করেন।’ —সুরা আন-নাহল, ৯০। এই আয়াতের মধ্যে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের মৌলিক দর্শন নিহিত রয়েছে। ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সৎকর্মে উৎসাহ, মানুষের প্রতি দায়িত্ব এবং অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত থাকা—এসবই একটি সুস্থ সমাজের অপরিহার্য উপাদান। আইনের চোখ এড়িয়ে অপরাধ করা সম্ভব হতে পারে; কিন্তু নিজের বিবেক ও স্রষ্টার জবাবদিহির অনুভূতি থেকে পালানোর সুযোগ নেই—তাকওয়া মানুষকে এই বোধটিই শেখায়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া অপরাধ দমন অসম্ভব অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে অপরাধীর মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় অবিশ্বাস ও হতাশা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা ন্যায়ের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়।’ —সুরা আন-নিসা, ১৩৫। অর্থাৎ ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বার্থ কিংবা পক্ষপাতকে স্থান দেওয়া যাবে না। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয়ের চেয়ে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচিত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিরপরাধ মানুষের অধিকার ও মর্যাদাও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকতে হবে। ন্যায়বিচার যখন দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য হয়, তখন অপরাধের সামাজিক প্রশ্রয় কমে। বিপরীতে বিচারহীনতা ও পক্ষপাত অপরাধকে উৎসাহিত করতে পারে। শাস্তির পাশাপাশি প্রতিরোধের দর্শন ইসলামে কিছু অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে শাস্তির উদ্দেশ্যকে কেবল প্রতিশোধ হিসেবে দেখলে ইসলামি বিচারদর্শনের পূর্ণতা বোঝা যায় না। অপরাধ প্রতিরোধ, মানুষের অধিকার রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠাই এর বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অংশ। তবে এ বিষয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে রাখা প্রয়োজন—কোনো শাস্তি প্রয়োগের আগে অপরাধের প্রমাণ, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং অভিযুক্তের অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কারণ ন্যায়বিচারের নামে অন্যায় করা ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতএব, অপরাধ দমনে কঠোরতার পাশাপাশি বিচারিক সততা ও প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারই নৈতিক শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয় একটি শিশুর নৈতিক চরিত্র গড়ে ওঠে প্রথমে পরিবারে। পরিবারে যদি সত্যবাদিতা, শালীনতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা শেখানো হয়, তাহলে সেই শিক্ষা তার ব্যক্তিত্বের ভিত গড়ে দেয়। অন্যদিকে সন্তান যদি পরিবারেই মিথ্যা, প্রতারণা, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা কিংবা অন্যায়কে স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে শেখে, তাহলে পরবর্তী জীবনে তার আচরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই সামাজিক অপরাধ দমনের আলোচনা করতে গিয়ে পরিবারকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল বা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শিক্ষা নয়; ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে। কারণ জ্ঞানী মানুষ অপরাধী না-ও হতে পারে, কিন্তু নৈতিক মানুষ হওয়ার জন্য মূল্যবোধের শিক্ষা অপরিহার্য। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রতিকার অপরাধের পেছনে একমাত্র কারণ অর্থনৈতিক দুরবস্থা নয়; তবে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বঞ্চনা ও চরম বৈষম্য কিছু ক্ষেত্রে অপরাধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই অপরাধ দমনের একটি কার্যকর কৌশল হলো মানুষের মৌলিক চাহিদা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ নিশ্চিত করা। ইসলাম জাকাত, সদকা, ফিতরা ও দানের মাধ্যমে সমাজের অপেক্ষাকৃত সামর্থ্যবান মানুষের ওপর দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তিগত দান নয়; বরং সমাজে সহমর্মিতা, সম্পদের সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। একটি সমাজে যখন ক্ষুধার্ত মানুষকে অবহেলা করা হয়, বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্ব অস্বীকার করা হয় এবং সম্পদের বৈষম্য সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে, তখন শুধু আইন দিয়ে সব ধরনের অপরাধের মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ‘সৎকাজের আদেশ’ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ ইসলাম ব্যক্তিকে শুধু নিজের ভালো থাকার শিক্ষা দেয় না; সমাজের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে শেখায়। সৎকাজে উৎসাহ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার নীতি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ তৈরি করে। তবে এর অর্থ কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়। বরং অন্যায় প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করাই দায়িত্বশীল নাগরিকতার অংশ। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। গুজব ছড়ানো, অপমানজনক বক্তব্য, চরিত্রহনন, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা যাচাই না করে কোনো অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া—এসবও সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই নৈতিকতা শুধু রাস্তাঘাটের আচরণে নয়, আমাদের অনলাইন আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। অপরাধীর সংশোধন ও পুনর্বাসনও জরুরি অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে শাস্তির পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ ভুল করতে পারে; কিন্তু ভুলের পর ফিরে আসার পথ বন্ধ করে দিলে সংশোধনের সুযোগ সংকুচিত হয়। ইসলাম তওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষের ফিরে আসার দরজা উন্মুক্ত রেখেছে। একজন অপরাধী তার অপরাধের জন্য জবাবদিহি করবে—এটি যেমন সত্য, তেমনি সংশোধনের সুযোগ পাওয়াও মানবিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারাগার যদি শুধু শাস্তির স্থান না হয়ে সংশোধন, শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, তাহলে একজন অপরাধীর জীবন নতুনভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে ব্যক্তি যেমন উপকৃত হয়, তেমনি সমাজও একটি সম্ভাব্য অপরাধীকে দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করার সুযোগ পায়। শুধু আইন নয়, দরকার নৈতিক পুনর্জাগরণ সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু পুলিশ, আদালত ও কারাগারের ওপর ছেড়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ। শিশুর হাতে যেমন বই তুলে দিতে হবে, তেমনি তার মনে নৈতিকতার বীজও বপন করতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে সততার সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। আইন প্রয়োগ করতে হবে নিরপেক্ষভাবে, আর বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ইসলামি মূল্যবোধের মূল শিক্ষা হলো—মানুষ শুধু আইনের ভয়ে সৎ হবে না; বিবেক, নৈতিকতা ও আল্লাহর প্রতি জবাবদিহির অনুভূতি থেকেও সৎ থাকবে। এই অন্তর্গত নৈতিক শক্তিই একটি সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখতে পারে। শেষ কথা অপরাধমুক্ত সমাজ কেবল কঠোর আইন দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় ন্যায়বিচার, সুশাসন, নৈতিক শিক্ষা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, পারিবারিক মূল্যবোধ, মানবিকতা এবং ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির সমন্বয়ে। তাই সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই হতে হবে দুই দিক থেকে—একদিকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, অন্যদিকে মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ। ইসলামি মূল্যবোধের তাকওয়া, ন্যায়, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, দয়া, দায়িত্ববোধ ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দিতে পারলে একটি অধিকতর শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের পথ সুগম হতে পারে। আজকের সময়ে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘অপরাধীকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া হবে’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে এমন একটি নৈতিক সমাজ গড়ে তোলা যায়, যেখানে মানুষ অপরাধ করার আগে নিজের বিবেকের কাছে থেমে যাবে? সেই জায়গাতেই ইসলামি মূল্যবোধের চর্চা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ আমাদের সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও নৈতিকতার পথে চলার এবং সমাজ থেকে অন্যায়-অপরাধ দূর করার তওফিক দান করুন। আমিন। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
নিরাপদ খাবার কোথায়? ভোক্তার জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি আর কতদিন: জাহাঙ্গীর আলম
নিরাপদ খাবার কোথায়? ভোক্তার জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি আর কতদিন - জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রাম মহানগরীর ব্যস্ততম সড়ক, বাণিজ্যিক এলাকা কিংবা আবাসিক পাড়া—চোখের সামনে সারি সারি হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, ফাস্টফুডের দোকান। কোথাও ঝকঝকে সাজসজ্জা, কোথাও আধুনিক নাম ও বাহারি বিজ্ঞাপন। বাইরে থেকে দেখলে সবই যেন পরিপাটি। কিন্তু সেই খাবারের পেছনের রান্নাঘর, সংরক্ষণব্যবস্থা কিংবা ব্যবহৃত কাঁচামালের দিকে তাকালেই কি একই চিত্র দেখা যায়? সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানের তথ্য অন্তত সেই নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। মানুষ বাইরে খাবার খায় প্রয়োজনেই। কর্মব্যস্ত নগরজীবনে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাবারের ওপর নির্ভর করেন। কেউ অফিসের ব্যস্ততায়, কেউ ব্যবসায়িক কাজে, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে, কেউবা পরিবার নিয়ে। একজন ক্রেতা যখন একটি খাবারের দোকানে প্রবেশ করেন, তখন তিনি ধরে নেন—টাকা দিয়ে যে খাবারটি কিনছেন, সেটি নিরাপদ এবং মানুষের খাওয়ার উপযোগী। কিন্তু যদি সেই বিশ্বাসের আড়ালে থাকে পচা খাবার, মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ, পোড়া তেল, অপরিষ্কার রান্নাঘর কিংবা কাঁচা ও রান্না করা খাবার পাশাপাশি সংরক্ষণের মতো অনিয়ম, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—ভোক্তার নিরাপত্তা কোথায়? সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা অধিকারবিষয়ক অভিযানে এমন বেশ কিছু অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে পচা খাদ্য উপকরণ, কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ মাংস, সবজি, ফল বা দই, কোথাও নিম্নমানের উপকরণ কিংবা অননুমোদিত রং ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পোড়া তেলে খাবার তৈরির পাশাপাশি কাঁচা ও রান্না করা খাবার একই স্থানে সংরক্ষণের মতো বিষয়ও উঠে এসেছে। কোথাও আবার অপরিচ্ছন্ন পাত্র, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ কিংবা পোকামাকড়ের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযানের পর এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটিকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের জরিমানাও করা হয়েছে। একটি সাম্প্রতিক অভিযানে নগরের ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে মোট ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অন্য একটি অভিযানে চকবাজারের একটি ফুড কোর্টের চারটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় খাবারের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জরিমানার ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং নগরের খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথাই এসব অভিযান সামনে নিয়ে আসছে। তবে এখানেই শেষ নয়; বরং এখান থেকেই শুরু হওয়া উচিত আরও বড় প্রশ্নের। জরিমানা করার পর কী হয়? একটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলো, জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে গেল, অভিযান শেষ হলো—তারপর? প্রতিষ্ঠানটি কি পরদিন থেকে স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলল? রান্নাঘর কি পরিচ্ছন্ন হলো? মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ কি আর ব্যবহার করা হলো না? পোড়া তেল কি বাদ দেওয়া হলো? কাঁচা ও রান্না করা খাবারের জন্য পৃথক সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরি হলো? নাকি কয়েকদিন পর আবারও আগের চিত্র ফিরে এল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে। কারণ জরিমানা শাস্তির একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু জনস্বাস্থ্য রক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। একজন মানুষ পচা বা দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হলে তার কষ্টের মূল্য কোনো জরিমানার অঙ্ক দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। তার চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি, পরিবারের দুশ্চিন্তা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি—এসবের দায় কে নেবে? একজন ভোক্তা খাবার কিনে রান্নাঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন না। তিনি দেখতে পারেন না মাংসটি কতদিন ধরে রাখা হয়েছে, সবজিটি তাজা কি না, তেল কতবার ব্যবহার করা হয়েছে, ফ্রিজের তাপমাত্রা ঠিক আছে কি না কিংবা রান্নার পাত্রটি কতটা পরিষ্কার। তিনি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস করেই খাবার খান। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কেউ যদি নিম্নমানের বা অনিরাপদ খাবার পরিবেশন করেন, তাহলে সেটি শুধু ব্যবসায়িক অনৈতিকতা নয়—এটি ভোক্তার মৌলিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর বিষয়। চট্টগ্রামের মতো বন্দরনগরী ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নগরে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নগরের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করেন। দেশ-বিদেশের মানুষও এই নগরে আসেন। ফলে এখানকার খাদ্যব্যবস্থার মান শুধু স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য নয়, নগরের সামগ্রিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত। প্রশ্ন হলো, একটি শহরে শত শত খাবারের প্রতিষ্ঠান থাকলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘর ও খাদ্য সংরক্ষণব্যবস্থা কি নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে? যেসব প্রতিষ্ঠান একবার জরিমানা হয়েছে, তাদের পুনরায় পরিদর্শন করা হচ্ছে কি? একই ধরনের অনিয়ম পুনরাবৃত্তি হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত নজরদারি কতটা কার্যকর? এসব প্রশ্নের উত্তর সাধারণ মানুষ জানার অধিকার রাখেন। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও রেস্টুরেন্টগুলোর রান্না, খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশনে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কী হচ্ছে তার ওপর। নির্দেশনা দেওয়ার চেয়ে নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটিই বড় কথা। অভিযানের সময় ক্যামেরার সামনে রান্নাঘর পরিষ্কার করে রাখলেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। দরকার প্রতিদিনের স্বাস্থ্যবিধি, নিয়মিত তদারকি এবং ব্যবসায়ীদের নিজেদের দায়িত্ববোধ। ব্যবসা করা অপরাধ নয়। লাভ করাও অপরাধ নয়। বরং একটি ভালো রেস্টুরেন্ট বা বেকারি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, মানুষের প্রয়োজন মেটায় এবং অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু লাভের জন্য যদি খাবারের মান কমানো হয়, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয় কিংবা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি করা হয়, তখন ব্যবসা আর কেবল ব্যবসা থাকে না—তা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে পরিণত হয়। এখানে ব্যবসায়ীদের বিবেকের প্রশ্নও আছে। একজন ক্রেতা হয়তো বুঝতে পারছেন না তার প্লেটে পরিবেশিত খাবারের উপকরণ কতটা নিরাপদ। কিন্তু খাবার প্রস্তুতকারী জানেন তিনি কী ব্যবহার করছেন। ক্রেতা জানেন না তেলটি কতবার ব্যবহার করা হয়েছে; রান্নাঘরের দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানেন। ভোক্তা জানেন না ফ্রিজে রাখা খাবারটির মেয়াদ শেষ হয়েছে কি না; ব্যবসায়ী জানেন। তাই তথ্যের এই অসমতার জায়গায় ব্যবসায়ীর দায়িত্ব আরও বেশি। শুধু প্রশাসনের ভয়েই নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে ভোক্তারও দায়িত্ব আছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার না খাওয়া, খাবারের মান নিয়ে সন্দেহ হলে অভিযোগ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়া দরকার। তবে ভোক্তাকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারি শক্তিশালী করাও জরুরি। কারণ একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে একটি রেস্টুরেন্টের রান্নাঘরের ভেতরের প্রতিটি বিষয় পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম মহানগরীতে সাম্প্রতিক অভিযানগুলো তাই কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানার খবর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এসব অভিযান নগরের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, সেটি দেখারও একটি সুযোগ। অভিযান থেকে তথ্য নিতে হবে, পুনরাবৃত্ত অনিয়মের কারণ খুঁজতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে কোনো রেস্টুরেন্টে অভিযান চালানোর জন্য অভিযোগ জমা পড়ার অপেক্ষা করতে হবে না; নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে অনিয়ম আগেই শনাক্ত হবে। এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে শুধু জরিমানা নয়, সংশোধন বাস্তবায়নের অগ্রগতিও দেখা হবে। এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহিত হবে এবং বারবার অনিয়ম করা প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের আওতায় আরও কার্যকরভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হবে। কারণ খাবার কোনো সাধারণ পণ্য নয়। খাবারের সঙ্গে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সরাসরি জড়িত। একজন মানুষ দিনের পর দিন পরিশ্রম করে উপার্জিত টাকা দিয়ে খাবার কিনছেন। সেই খাবার যদি তার সুস্থ থাকার বদলে অসুস্থতার কারণ হয়, তাহলে এর চেয়ে বড় ভোক্তা-অবিচার আর কী হতে পারে? আমরা চাই না চট্টগ্রামের কোনো মা-বাবা সন্তানকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফিরে এসে হাসপাতালের পথে ছুটুন। আমরা চাই না একজন শ্রমজীবী মানুষ দিনের উপার্জনের টাকা খাবারে খরচ করে পরদিন চিকিৎসার জন্য আরও বেশি টাকা ব্যয় করুন। আমরা চাই না একটি পরিবারের আনন্দের খাবার অসুস্থতার কারণ হয়ে উঠুক। তাই এখন সময় এসেছে প্রশ্ন করার—নিরাপদ খাবার কোথায়? ভোক্তার জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি আর কতদিন? অভিযান হোক, জরিমানা হোক, আইন প্রয়োগ হোক—কিন্তু তার সাথে থাকতে হবে স্থায়ী সমাধান। খাদ্য ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল হতে হবে, প্রশাসনকে নিয়মিত নজরদারি করতে হবে এবং ভোক্তাকে সচেতন হতে হবে। এই তিন পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সবশেষে একটি কথা মনে রাখা দরকার—আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে হয়তো কোনো অনিয়মের তাৎক্ষণিক দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু মানুষের ক্ষতি, মানুষের অধিকার এবং মানুষের আমানতের দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একজন বিশ্বাসী মানুষের কাছে সেই জবাবদিহি শুধু রাষ্ট্রের কাছে নয়, মহান আল্লাহর কাছেও। একটি জরিমানার রসিদ হয়তো অপরাধের আইনি মূল্য নির্ধারণ করতে পারে; কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের কষ্টের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। তাই প্রয়োজন এমন একটি খাদ্যব্যবস্থা, যেখানে ব্যবসা থাকবে, মুনাফা থাকবে, কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্যকে মুনাফার বলি হতে হবে না। নিরাপদ খাবার কোনো বিলাসিতা নয়—এটি মানুষের অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি ব্যবসায়ীর নৈতিক দায় এবং রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্যগত দায়িত্বও। লেখক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট মোবাইল - ০১৭৪৯৩৩৮২৮৫ ইমেইল - jahangirfa@yahoo.com
খাদ্য সংকটের নতুন বাস্তবতা: কৃষক, পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্ন
খাদ্য সংকটের নতুন বাস্তবতা: কৃষক, পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্ন মোহাম্মদ হাসান একটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে মৌলিক সূচকগুলোর একটি হলো—সেই দেশের মানুষ নিয়মিত, পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে কি না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই দৃশ্যমান হোক, মানুষের খাবারের নিশ্চয়তা যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে উন্নয়নের ভিত নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় খাদ্যনিরাপত্তা তাই কেবল কৃষি মন্ত্রণালয় কিংবা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, বাজারব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সমন্বিত প্রশ্ন। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা বিশ্লেষণ সেই উদ্বেগকেই সামনে এনেছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন—আইপিসির সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে থেকে আগস্ট সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ, অর্থাৎ বিশ্লেষণভুক্ত জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ, তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ ছিল জরুরি পর্যায়ে বা IPC Phase 4-এ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা অবনতির আশঙ্কা করা হয়েছে; সে সময়ে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখে এবং জরুরি পর্যায়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজারে পৌঁছাতে পারে। এই পরিসংখ্যানকে কেবল একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি শিশু, একজন কৃষক, একজন শ্রমজীবী মানুষ কিংবা একজন মা—যিনি হয়তো খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন, পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়েছেন অথবা পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য নিজের খাবারের অংশ কমিয়েছেন। খাদ্য আছে, কিন্তু সবার নাগালে কি? বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান, মাছ, মাংস ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তার অর্থ কেবল বাজারে খাদ্য থাকা নয়। মানুষের কাছে সেই খাদ্য কেনার সামর্থ্য থাকতে হবে, খাদ্য হতে হবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর এবং সংকটের সময়েও সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তার এই চারটি মৌলিক স্তম্ভ হলো—লভ্যতা, প্রবেশগম্যতা, ব্যবহারযোগ্যতা এবং স্থিতিশীলতা। অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ থাকতে হবে; মানুষের সেই খাদ্য কেনার বা পাওয়ার সামর্থ্য থাকতে হবে; খাদ্য হতে হবে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ; এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের সময়েও খাদ্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান সংকট মূলত এই চারটি স্তম্ভের আন্তঃসম্পর্কের জায়গাতেই। একদিকে খাদ্য উৎপাদন চলছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহকে ব্যাহত করছে। ফলে বাজারে খাদ্য থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবারের জন্য তা পর্যাপ্ত পরিমাণে ও নিয়মিত কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি—WFP-ও বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টিকে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীন এবং প্রায় ১৬ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। আবহাওয়াজনিত অভিঘাত, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক চাপ ও মানবিক সহায়তার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। খাদ্যনিরাপত্তা মানেই শুধু পেট ভরা নয় খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—পেট ভরা আর পুষ্টি নিশ্চিত হওয়া এক কথা নয়। অনেক পরিবার হয়তো প্রতিদিন ভাত ও ডাল খেতে পারছে; কিন্তু মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফলমূল ও শাকসবজির পর্যাপ্ততা নেই। ফলে ক্যালরির ঘাটতি না থাকলেও প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ভিটামিন ও অন্যান্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই অপুষ্টি বাংলাদেশের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, অন্যদিকে অতিপ্রক্রিয়াজাত বা পুষ্টিহীন খাদ্যাভ্যাস। WFP বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘ট্রিপল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’-এর প্রেক্ষাপটে দেখিয়েছে—যেখানে অপুষ্টি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত ওজন বা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি একই খাদ্যব্যবস্থার ভেতরে উপস্থিত থাকতে পারে। শিশুদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। IPC-এর ২০২৬ সালের তীব্র অপুষ্টি বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে, বছরের বিভিন্ন সময়ে ৬–৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৭ লাখ শিশুর তীব্র অপুষ্টির সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার শিশু গুরুতর তীব্র অপুষ্টির পর্যায়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রশ্নও। কৃষক বাঁচলে খাদ্যব্যবস্থা বাঁচবে খাদ্যনিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কৃষক। অথচ কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বহন করেন তিনিই। বীজ, সার, জ্বালানি, সেচ, শ্রম ও পরিবহন—সবকিছুর ব্যয় বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে। কিন্তু বাজারে ফসলের দাম সেই অনুপাতে না বাড়লে উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার কোনো কোনো মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে দাম পড়ে গেলে কৃষকের লোকসান হয়; অন্যদিকে ঘাটতির সময়ে ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হয়। এই বৈপরীত্য কৃষি বাজারব্যবস্থার একটি পুরোনো দুর্বলতা। বাংলাদেশের কৃষি খাতের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির হারও উদ্বেগের কারণ। BBS-এর ২০২৪–২৫ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১.৭৯ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৩.৩০ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এখানে প্রশ্নটি শুধু কৃষির প্রবৃদ্ধির নয়; প্রশ্ন হলো, কৃষক কি উৎপাদন করে টিকে থাকতে পারছেন? কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা তাই ভোক্তার স্বার্থেরও অংশ। কৃষক উৎপাদন থেকে সরে গেলে কিংবা কৃষি অলাভজনক হয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাই দুর্বল হবে। কৃষির সঙ্গে অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক বাংলাদেশের শ্রমবাজারেও কৃষির গুরুত্ব এখনও ব্যাপক। বিশ্বব্যাংকের ILO-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৪.৩ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই কৃষিকে কেবল গ্রামীণ মানুষের জীবিকার খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কৃষির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে খাদ্য সরবরাহ, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের স্থিতিশীলতা। কৃষি খাত দুর্বল হলে তার প্রভাব শহরেও পৌঁছায়। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। ফলে কৃষি সংকট শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতির সংকটেও রূপ নেয়। জমি রক্ষা না করলে ভবিষ্যৎ খাদ্য কোথা থেকে আসবে? বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ আবাদযোগ্য জমির ওপর বাড়তে থাকা চাপ। নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আবাসন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু এর সঙ্গে কৃষিজমি সংরক্ষণের ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি। একটি জমি একবার স্থায়ীভাবে অকৃষি ব্যবহারে চলে গেলে সেটিকে আবার কৃষিতে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। ফলে কৃষিজমি সংরক্ষণ কেবল কৃষকের স্বার্থ নয়—এটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এ ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা, কৃষিজমি সুরক্ষা, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত শিল্পায়নকে একই নীতির আওতায় আনতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও আকস্মিক বন্যা কৃষি উৎপাদন ও মানুষের জীবিকাকে বারবার আঘাত করছে। ২০২৬ সালের IPC বিশ্লেষণেও জলবায়ু ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর বিশেষ চাপের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ে তীব্র অপুষ্টির বিশ্লেষণে ফ্ল্যাশ ফ্লাড, রোগের প্রাদুর্ভাব, অপর্যাপ্ত শিশুখাদ্য এবং পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির দুর্বলতাকে কয়েকটি এলাকায় অবনতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই আগামী দিনের কৃষিনীতি হতে হবে জলবায়ু-সহনশীল। লবণাক্ততা সহনশীল জাত, খরাসহিষ্ণু ফসল, পানি সাশ্রয়ী সেচ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং কৃষিবীমার মতো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। নিরাপদ খাদ্যও খাদ্যনিরাপত্তার অংশ খাদ্য উৎপাদন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেই খাদ্য নিরাপদ কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভেজাল, অনিরাপদ রাসায়নিকের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর সংরক্ষণ, দূষিত পানি, অপরিচ্ছন্ন বাজার এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে অনিয়ম জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত একটি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি বিভাগ, ভোক্তা অধিকার সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা দরকার। বাজারব্যবস্থায় কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানের দূরত্ব কমাতে হবে কৃষক মাঠে যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, শহরের ভোক্তা অনেক সময় তার চেয়ে অনেক বেশি দামে সেই পণ্য কেনেন। এই ব্যবধানের পেছনে পরিবহন, সংরক্ষণ, পাইকারি বাজার, খুচরা বাজারসহ নানা যৌক্তিক কারণ রয়েছে। কিন্তু অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজারের তথ্যের অসমতাও অনেক ক্ষেত্রে মূল্যবৈষম্য বাড়ায়। এখানে কৃষকের জন্য সরাসরি বাজারসংযোগ, কৃষক সমবায়, কৃষিপণ্যের ডিজিটাল বাজার, আধুনিক গুদাম ও কোল্ড-চেইন অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য—সবজি, ফল, মাছ, দুধ ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা গেলে উৎপাদন-পরবর্তী অপচয় কমবে এবং কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হতে পারেন। তরুণদের কৃষিতে ফিরিয়ে আনা দরকার কৃষিকে যদি কেবল কায়িক শ্রমের পেশা হিসেবে দেখা হয়, তবে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ এ খাত থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু আধুনিক কৃষি এখন শুধু লাঙল ও কাস্তের কৃষি নয়; এটি প্রযুক্তি, তথ্য, গবেষণা, উদ্যোক্তা, বাজার ও ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ক্ষেত্র। ড্রোন, স্যাটেলাইট ডেটা, মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, স্মার্ট সেচ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কৃষি-অ্যাপ, অনলাইন বাজার ও যান্ত্রিকীকরণ—এসব প্রযুক্তি কৃষিকে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার খাতে পরিণত করতে পারে। তাই কৃষি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে প্রযুক্তি, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। কৃষিকে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ খাত হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বাংলাদেশের সামনে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো যখন নিজেদের কর্মসূচি ও ইশতেহার নিয়ে আলোচনা করবে, তখন কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার বিষয়গুলো কীভাবে অগ্রাধিকার পায়, তা গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত প্রশ্ন হয়ে উঠবে। কোনো নির্দিষ্ট দল বা রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে না গিয়ে বলা যায়, যে কোনো নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে পরিমাপযোগ্য, বাস্তবায়নযোগ্য এবং অর্থায়ন-সমর্থিত পরিকল্পনা থাকলে তা জনসাধারণের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। সেখানে কৃষকের ন্যায্য মূল্য, কৃষিঋণের সহজপ্রাপ্যতা, ফসলবীমা, কৃষিজমি সংরক্ষণ, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা, নারী কৃষকের অধিকার, তরুণ উদ্যোক্তা, কৃষি গবেষণা, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, নিরাপদ খাদ্য এবং পুষ্টিকর খাদ্যের সহজপ্রাপ্যতার মতো বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। শুধু প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সময়সীমা, বাজেট, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং অগ্রগতি পরিমাপের স্বচ্ছ কাঠামো। কৃষকের অধিকার মানেই ভোক্তার অধিকার কৃষকের স্বার্থ ও ভোক্তার স্বার্থকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। কৃষক ন্যায্য দাম পেলে উৎপাদনে উৎসাহিত হন; উৎপাদন স্থিতিশীল হলে সরবরাহ বাড়ে; সরবরাহ স্থিতিশীল হলে বাজারও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা সহজ হয়। অন্যদিকে ভোক্তাকে সুরক্ষা দিতে হলে শুধু বাজারে দাম কমানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়। উৎপাদন খরচ, কৃষকের ন্যায্য আয়, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এই ভারসাম্যই হতে পারে টেকসই খাদ্যনীতির ভিত্তি। শেষ কথা বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সামনে আজ যে চ্যালেঞ্জ, তা কেবল খাদ্যের ঘাটতির প্রশ্ন নয়। এটি ক্রয়ক্ষমতা, কৃষকের আয়, উৎপাদন ব্যয়, পুষ্টি, নিরাপদ খাদ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি, বাজারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সম্মিলিত সংকেত। আইপিসির সাম্প্রতিক পূর্বাভাস যদি বাস্তবে রূপ নেয় এবং বছরের শেষ দিকে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে, তবে তা নিঃসন্দেহে নীতি-নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখন প্রয়োজন সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং সংকটের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কৃষককে ন্যায্য মূল্য দিতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে। উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। কৃষিতে গবেষণা ও প্রযুক্তির বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। শিশু ও মায়ের পুষ্টিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। বাজারে খাদ্যের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, খাদ্যকে শুধু পণ্য হিসেবে নয়—মানবিক অধিকার, জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদনকারী নন; তিনি দেশের খাদ্যব্যবস্থার প্রথম সারির অংশীদার। তাঁর ঘামেই মাঠে শস্য জন্মায়, সেই শস্যেই শহর-গ্রামের কোটি মানুষের জীবন চলে। তাই কৃষকের নিরাপত্তা মানেই খাদ্যনিরাপত্তার নিরাপত্তা; খাদ্যনিরাপত্তা মানেই মানুষের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের শেষ হিসাব হয় তার মানুষের জীবনযাত্রায়। সেই হিসাবের প্রথম প্রশ্নটি খুব সহজ—মানুষ কি পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করাই এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় জাতীয় দায়িত্ব। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাদের জন্য আলাদা প্রজ্ঞাপন : কিছু ভাবনা
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাদের জন্য আলাদা প্রজ্ঞাপন : কিছু ভাবনা। একরামুল ইসলাম তুষার : কলাম লেখক। পে-স্কেল বা বেতন স্কেল হলো সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন নির্ধারণের কাঠামো। কোন পদ কোন গ্রেডে থাকবে, সেই গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন কত হবে এবং চাকরির মেয়াদে বেতন কীভাবে ধাপে ধাপে বাড়বে—এসব বিষয় এই কাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা যুক্ত হয়ে একজন সরকারি চাকরিজীবীর মোট বেতন নির্ধারিত হয়। প্রতি ৫ বছর পর পর নতুন পে-স্কেল বা জাতীয় বেতন কাঠামো গঠনের নিয়ম বা প্রচলন রয়েছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এটি সবসময় মানা হয় না। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, ক্যাডার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই গ্রেডে একাধিক ধরনের পদ থাকতে পারে। আবার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিশেষায়িত কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা বেতন আদেশও রয়েছে। নতুন বেতন স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তি হওয়ার বিষয়টি আগেই নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাদের জন্য পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানা গেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করে পৃথক চিঠি কবে জারি করা হবে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানা গেছে । বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে। এমপিওভুক্ত জনবল ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্যও পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে। শিগগিরই তাদের জন্য পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি হবে।’ চলতি মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানা গেছে। আগামী নভেম্বর মাসে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতন পেতে পারেন। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার তথ্য আইবাস প্লাস প্লাস সফটওয়্যারে এন্ট্রি দিতে হয়। প্রতি মাসের ২০ তারিখের মধ্যে এ তথ্য পাঠাতে হয়। ইতোমধ্যে অধিকাংশ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতার তথ্য সাবমিট করেছেন। সে হিসেবে সেপ্টেম্বরে বর্ধিত বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। রবিবার পর্যন্ত বেতনের তথ্য আইবাসে পাঠানোর সময়সীমা রয়েছে। অক্টোবরের মাস থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’ নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। একই সময়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়তি মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই বাড়তি অর্থ গত ৩০ জুন আহরিত বা প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতনকাঠামোতে বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০-২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। আর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে। ১ জুলাই থেকে যেহেতু নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হয়েছে, তাই বকেয়া বেতনও পাবেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি নতুন বেতনকাঠামোর অন্য সব ভাতা পাওয়া শুরু করবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একইভাবে পেনশন সুবিধাভোগীরাও নতুন বেতনকাঠামোর যাবতীয় সব সুবিধা পাবেন। নতুন বেতনকাঠামোতে ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। আর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়বে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ধরনের ভাতাও বাড়বে। এর আগে ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন প্রজ্ঞাপন জারি হল। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিই সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে। ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে এ বছরের ২১ জানুয়ারি। কমিশনপ্রধান সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। গেজেট অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীরা ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা প্রতি মাসে চিকিৎসা ভাতা হিসেবে পাবেন। পে-স্কেলের আওতায় আসায় সরকারি স্কুল বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও মাসিক ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পাবেন। তবে এই ভাতা পাবেন না বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা। তারা পূর্বের ন্যায় মাসিক ৫০০ টাকা হারে চিকিৎসা ভাতা পাবেন। ফলে বিষয়টিকে চরম বৈষম্য দাবি করেছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। নবম পে-স্কেলের গেজেটে চিকিৎসা ভাতা সংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছে, ‘চিকিৎসা সংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধাদি যাহা সরকার কর্তৃক, সময়ে সময়ে জারীকৃত আদেশের মাধ্যমে প্রদান করা হইয়াছে তাহা যথারীতি বলবৎ থাকিবে এবং কর্মচারীগণ ৫০ বৎসর বয়স পর্যন্ত মাসিক ৩০০০ (তিন হাজার) টাকা এবং ৫০ বৎসর ১ দিন হইতে পিআরএল শেষ হওয়া পর্যন্ত মাসিক ৪০০০ (চার হাজার) টাকা চিকিৎসা ভাতা প্রাপ্য হইবেন।’ এতে আরও বলা হয়, ‘অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ভাতা ৫০ বৎসর বয়স পর্যন্ত মাসিক ৩০০০ (তিন হাজার) টাকা, ৫০ বৎসর ১ দিন হইতে ৬০ বৎসর পর্যন্ত মাসিক ৪০০০ (চার হাজার) টাকা, ৬০ বৎসর ০১ দিন হইতে ৭০ বৎসর বয়স পর্যন্ত মাসিক ৫০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা এবং ৭০ বৎসরের ঊর্ধ্বে মাসিক ৬০০০ (ছয় হাজার) টাকা হইবে: তবে শর্ত থাকে যে, কোনও মূল পেনশনভোগী হইতে উদ্ভূত একাধিক পারিবারিক পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে মূল পেনশনভোগীর প্রাপ্য চিকিৎসা ভাতাকে ভিত্তি ধরিয়া বিধি মোতাবেক আনুপাতিক হারে বণ্টন করিতে হইবে।’ পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের চিকিৎসা ভাতা বাড়ানো হলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের চিকিৎসা ভাতা বাড়েনি দীর্ঘদিন ধরে। এমনকি শিক্ষক-কর্মচারীদের শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির আন্দোলনে চিকিৎসা ভাতা এক হাজার টাকা করার দাবি উঠলেও তা আজও পূরণ হয়নি। নাম না প্রকাশ করার শর্তে অনেক বলেন যে,-বিষয়টি চরম বৈষম্যমূলক প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বৈষম্যের শিকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। বর্তমান সময়ে যেখানে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ ফি এক হাজার টাকার বেশি। সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিমাসে ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা কীভাবে দেওয়া হয় সেটি আমাদের বোধগম্য নয়।’ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকরাও চিকিৎসা ভাতা পাবেন ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মেধা কোনোটিই কম নয় তা সত্ত্বেও তাদের চিকিৎসা সহ অন্যান্য ভাতা অনেক কম। অবিলম্বে তাদের চিকিৎসা সহ অন্যান্য ভাতা বাড়ানো হোক। একরামুল ইসলাম তুষার, সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
এনটিআরসিএ এর শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব: প্রাসঙ্গিক ভাবনা
এনটিআরসিএ এর শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব: প্রাসঙ্গিক ভাবনা একরামুল ইসলাম তুষার, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে NTRCA প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। ১ম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা: NTRCA প্রতিষ্ঠার পর ২০০৫ সালে প্রথম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন নিবন্ধন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে থাকে এবং শিক্ষকতার জন্য নিবন্ধন সনদ গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের সঙ্গে পরীক্ষার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। বর্তমানে সাধারণত প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক—এই ধাপগুলো রয়েছে। পরবর্তীতে শুধু সনদ দেওয়া নয়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিবন্ধনধারীদের সুপারিশ করার ব্যবস্থাও চালু হয়। ১৮তম নিবন্ধন পরীক্ষা ২০২৩ সালের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শুরু হয়ে এর লিখিত ও মৌখিক ধাপ ২০২৪–২০২৫ সময়ে সম্পন্ন হয়। ১৯তম নিবন্ধন নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা/প্রক্রিয়া হয়েছে; তবে বর্তমান পর্যন্ত কোন পরীক্ষাকে সর্বশেষ হিসেবে গণনা করা হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মৌখিক ২০ নম্বর থাকলেও তা বাড়িয়ে ৩০ নম্বর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও মানসম্মত ও কার্যকর করার অংশ হিসেবে এ পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার নম্বর কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০ থেকে বাড়িয়ে ৩০ করার প্রস্তাব উঠে আসে। তবে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার নম্বরে কোনো পরিবর্তন আনার বিষয়ে কোন প্রস্তাব করা হয়নি। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় প্রার্থীদের মোট নম্বর হবে ২৩০। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ১০০, +লিখিত পরীক্ষায় ১০০ +এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৩০ নম্বর থাকবে।অর্থাৎ, প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার নম্বর অপরিবর্তিত রেখে শুধু মাত্র ভাইভা পরীক্ষার নম্বর ১০ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক—এই তিন ধাপে মূল্যায়ন করা হয়। নতুন প্রস্তাবের ফলে মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, উপস্থাপনক্ষমতা ও শিক্ষকতা পেশার উপযোগিতা মূল্যায়নে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে ভাইভার নম্বর ৩০ করার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে কার্যকর হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী প্রজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তির পরই বিষয়টি নিশ্চিতভাবে কার্যকর হবে। শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর না বাড়িয়ে পূর্বেটা বহাল রাখা উচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে মনে করেন মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধি করলেএতে দলীয়করণে প্রভাব পড়বে। তবে অন্যদিকে, ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন পরীক্ষার্থীরা। তাঁদের মতে, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হলে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট মানদণ্ড ও জবাবদিহি থাকা জরুরি। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন শিক্ষক নিবন্ধন প্রত্যাশীরা। একরামুল ইসলাম তুষার, কলামিস্ট, সহকারী অধ্যাপক আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
জিন্নাহর ‘উর্দুই রাষ্ট্রভাষা’ থেকে একুশের রক্তাক্ত পথ: বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা বিতর্কিত?
জিন্নাহর ‘উর্দুই রাষ্ট্রভাষা’ থেকে একুশের রক্তাক্ত পথ: বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা বিতর্কিত? ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ঘিরে নতুন বিতর্ক; ভাষার অধিকার অস্বীকারের সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দিচ্ছেন সাবেক ছাত্রনেতারা বিশেষ প্রতিনিধি: সঞ্জয় মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতারা এক বিবৃতিতে ছবিটি অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত অবস্থান পূর্ববাংলার বাঙালিদের ভাষিক অধিকার সংকটকে আরও তীব্র করেছিল, স্বাধীন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালায় তাঁর ছবি কী বার্তা বহন করে? ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি পূর্ববাংলার মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার বড় অংশের মাতৃভাষা বাংলা হলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে পূর্ববাংলায় প্রতিবাদ আরও তীব্র হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯ মার্চ ১৯৪৮ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তব্যে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তখনই এর প্রতিবাদ জানায়। ঐতিহাসিকভাবে এই অবস্থান ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। জিন্নাহর এই অবস্থানের তাৎপর্য ছিল কেবল ভাষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না দেওয়ার প্রচেষ্টা বাঙালিদের মধ্যে রাজনৈতিক বঞ্চনা ও সাংস্কৃতিক অধিকারহীনতার অনুভূতিকে আরও গভীর করে। ভাষার প্রশ্ন ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক অধিকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে এই ধারাই বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার দাবির সঙ্গে একীভূত হয়। তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়গত বিষয় এখানে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। জিন্নাহ ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সালে মারা যান। ফলে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষণ বা সরাসরি সেই দিনের ঘটনাবলির সঙ্গে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত করা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালে তাঁর ঘোষিত রাষ্ট্রভাষা-নীতি যে ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল, ঐতিহাসিক দলিলগুলো তা স্পষ্টভাবে দেখায়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি চালায় এবং কয়েকজন শিক্ষার্থী নিহত হন। এই রক্তাক্ত ঘটনা ভাষার দাবিকে আরও শক্তিশালী করে এবং পরবর্তী সময়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়। এই ইতিহাসের কারণেই ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের ঘটনা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক তৈরি করেছে। ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতাদের বক্তব্য, এটি কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির ছবি প্রদর্শনের বিষয় নয়; বরং কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কী প্রেক্ষাপটে স্মরণ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে জিন্নাহর ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো, ভাষানীতি এবং বাঙালির অধিকারবঞ্চনার বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়াল হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, কোনো সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি থাকা নিজেই যে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের সমর্থন—এমন সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে টানা যায় না। একটি জাদুঘর বা সংগ্রহশালায় বিতর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি প্রদর্শন করা হলে তার সঙ্গে যথাযথ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, সময়কাল এবং প্রেক্ষাপট থাকা জরুরি। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু নিয়ে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ঘিরে বর্তমান বিতর্ক মূলত বাংলাদেশের ইতিহাস কীভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। ইতিহাসকে মুছে ফেলা নয়, বরং বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকেও সত্যনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপটে তুলে ধরাই হতে পারে দায়িত্বশীল ইতিহাসচর্চার পথ। আর সেই প্রেক্ষাপটে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ১৯৪৮ সালের ভাষানীতি, পূর্ববাংলার প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে কি না—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি, নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে সভাপতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি, নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে সভাপতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। শিক্ষা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ভালো আচরণ অর্জন করে এবং নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আবারও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা।অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া এমন সিদ্ধান্ত বাতিল করেছিল। তবে মনে হয় পুরোনো সেই নিয়ম আবারও ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। গত রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাপক্ষে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের অনুমোদনের পর এটি চূড়ান্ত করা হবে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মনোনয়ন সংক্রান্ত নতুন প্রস্তাবনায় যা বলা হয়েছে, ‘গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, ক্ষেত্রমত বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সহিত আলোচনাক্রমে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বা স্থানীয় খ্যাতিমান সমাজসেবকগণের মধ্য হইতে তিন জন ব্যক্তির নাম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত সংবলিত প্রস্তাব শিক্ষা বোর্ডের নিকট প্রেরণ করিবেন।’ ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত সংশোধিত বিধামালায় রাজনৈতিক নেতাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বাতিল করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সংশোধিত বিধিমালায় বলা হয়েছিল, গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের লক্ষ্যে প্রবিধান ৬ এর উপপ্রবিধান ১ এ উল্লিখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা সাপেক্ষে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, ক্ষেত্রমত, বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সহিত আলোচনাক্রমে নিম্ন বর্ণিত ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে ৩জন ব্যক্তির নাম ও জীবন বৃত্তান্তসম্বলিত প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের নিকট প্রেরণ করিবেন। (ক) সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯ম গ্রেডের নিম্নে নহে এইরূপ কোন কর্মকর্তা অথবা ৫ম গ্রেডের নিম্নে নহে এইরূপ আগ্রহী অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা; (খ) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজে কর্মরত কোনো সহযোগি অধ্যাপক বা অধ্যাপক; (গ) সংশ্লিষ্ট বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং (ঘ) এমবিবিএস অথবা প্রকৌশল বা কৃষিসহ যে কোনো কারিগরী বিষয়ে ৪ বৎসর মেয়াদী স্নাতক ডিগ্রিসহ সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯ম গ্রেডের নিম্নে নহে এইরূপ কোন কর্মকর্তা অথবা ৫ম গ্রেডের নিম্নে নহে এইরূপ আগ্রহী অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা।’ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ : ‘ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্ণিং বডির সভাপতি পদে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির অর্থ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পুনরায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা। যদিও এ পদে অন্যদেরও সুযোগ রয়েছে; তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নাম অন্তরভূক্ত অন্যদের এ পদে বসার সুযোগ কম।’ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি গঠনে পরিবর্তন ও সংশোধনী আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সভাপতিত্বে এক সভায় প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা অনুযায়ী, ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন ক্যাটাগরির সদস্য পদে আগে নির্বাচন হবে। সদস্য নির্বাচন শেষ হওয়ার সাতদিনের মধ্যে সভাপতির নির্বাচনের জন্য সভা আহ্বান করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার সভায় সভাপতিত্ব করবেন। উপস্থিত নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হবেন। তবে সভাপতি নির্বাচনের সভায় ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের ন্যূনতম দুই-তৃতীয়াংশের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একাধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে তাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পদত্যাগ, মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে সভাপতির পদ শূন্য হলে সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে নতুন সভাপতি নির্বাচনের বিধানও রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন প্রবিধানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আরও বলা হয়, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক বা কর্মচারী ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না। একই ব্যক্তি একই ধরনের সর্বোচ্চ দুটি এবং মেয়াদভিত্তিক ধরনের সর্বোচ্চ তিনটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন—এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মনোনয়ন সংক্রান্ত নতুন প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, ক্ষেত্রমত বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সহিত আলোচনাক্রমে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বা স্থানীয় খ্যাতিমান সমাজসেবকগণের মধ্য হইতে তিন জন ব্যক্তির নাম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত সংবলিত প্রস্তাব শিক্ষা বোর্ডের নিকট প্রেরণ করিবেন। এদিকে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতায়ও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ম্যানেজিং কমিটির হাতে থাকছে না প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা। তবে নিয়োগসহ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুপারিশকৃত নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিক্ষক ও কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা বহাল থাকছে। প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা অনুযায়ী, গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি বিধি মোতাবেক, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মচারী নিয়োগসহ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুপারিশকৃত বা প্রত্যয়নকৃত নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিক্ষক ও কর্মচারীদের পদোন্নতি প্রদান করবে। উল্লেখ্য আগে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রবিধানমালায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী প্রধান ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ছিল। তবে অনেকে মনে করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি পবিত্র জায়গা, এটা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা ভালো। এটাই কাম্য হওয়া উচিত। একরামুল ইসলাম তুষার, কলামিস্ট, সহকারী অধ্যাপক আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
সঙ্কটে জ্বালানি খাত: গ্যাস-বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের বৃত্ত থেকে মুক্তির উপায়
সঙ্কটে জ্বালানি খাত: গ্যাস-বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের বৃত্ত থেকে মুক্তির উপায় মোহাম্মদ হাসান একটি দেশের অর্থনীতির চাকা কতটা সচল, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা। শিল্প-কারখানা চলবে, কৃষি উৎপাদন হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে, মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক থাকবে—এসবের পেছনে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটি আর কেবল জনদুর্ভোগের বিষয় নয়; বরং অর্থনীতি, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য একটি বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমে একদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানায়। কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও কারখানার যন্ত্রপাতি নির্ধারিত সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। অনেক উদ্যোক্তাকে অতিরিক্ত ব্যয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমছে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংকটটি আকস্মিক নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি, আমদানিনির্ভরতার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি। ফলে আজ যে সংকট আমরা দেখছি, তা আসলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সমস্যারই বহিঃপ্রকাশ। চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের বিশাল ব্যবধান দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো চাহিদা ও সরবরাহের বিপুল ব্যবধান। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি। বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানিসহ সরবরাহ প্রায় ২,৮৩২ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে রয়েছে বিপুল ঘাটতি। এই ঘাটতি শুধু রান্নার চুলা কিংবা শিল্প-কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানির অভাবে সেই সক্ষমতার একটি অংশ অকার্যকর পড়ে থাকছে। এটি নিঃসন্দেহে পরিকল্পনার একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, সঞ্চালন অবকাঠামো আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই—এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। শিল্পে সংকট, অর্থনীতিতে অভিঘাত জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি অনুভূত হচ্ছে উৎপাদন খাতে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকলে শিল্পের যন্ত্রপাতি স্বাভাবিক গতিতে চালানো যায় না। উৎপাদন চক্র ব্যাহত হয়, সময়মতো পণ্য তৈরি করা সম্ভব হয় না এবং কারখানার নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে বিদেশি ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু একটি চালান বিলম্বিত হয় না; দীর্ঘমেয়াদে ক্রেতার আস্থা ও বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে কারখানা চালু রাখতে উদ্যোক্তাদের অনেক ক্ষেত্রে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। একজন উদ্যোক্তার পক্ষে দীর্ঘদিন এভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দাম, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানে। এখানেই গ্যাস সংকট একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়। উৎপাদন কমলে কর্মঘণ্টা কমে, আয় কমে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে। তাই শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে দেখতে হবে। এলএনজি আমদানি কি একমাত্র সমাধান? দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কতটা আমদানি এবং কী ধরনের আমদানিনির্ভরতা? আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কখনো বাড়ে, কখনো কমে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, সরবরাহ-শৃঙ্খলের বিঘ্ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার—সবকিছুই আমদানিকৃত জ্বালানির ব্যয়কে প্রভাবিত করে। ফলে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। যেখানে প্রয়োজন সেখানে এলএনজি আমদানি থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিশেষ করে স্থলভাগের সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দেশের সমুদ্রসীমায় বিপুল সম্ভাবনার কথা বহুদিন ধরেই আলোচিত। কিন্তু সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর অনুসন্ধান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। কোথায় কী পরিমাণ গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে হলে নিয়মিত ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও অনুসন্ধান চালাতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি গ্যাস ও এলএনজির পাশাপাশি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হতে পারে নবায়নযোগ্য শক্তি। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তির মতো উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর এখনই সময়। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্প-কারখানা, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো যেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত করা যেতে পারে। তবে নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে অবাস্তব উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের প্রযুক্তি, গ্রিডের সক্ষমতা, জমির প্রাপ্যতা, বিনিয়োগের ব্যয় এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। অপচয় কমানোও নতুন জ্বালানি উৎপাদনের সমান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সংকটের সমাধান শুধু নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় কতটা অপচয় হচ্ছে, কোথায় সিস্টেম লস বেশি, কোথায় অব্যবস্থাপনা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে অপচয়, অবৈধ সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটি কমাতে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একইভাবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দক্ষ করতে হবে। বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন চুক্তি, প্রকল্পের ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ও নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা অন্যান্য আর্থিক দায়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের স্বার্থ, বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা এবং চুক্তির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত। জ্বালানি নীতিতে দরকার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থাকা জাতীয় জ্বালানি নীতি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতির মৌলিক দিক পরিবর্তিত হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং সংকট আরও গভীর হতে পারে। জ্বালানি অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, আমদানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, জ্বালানি দক্ষতা এবং মূল্য নির্ধারণ—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত, গবেষণা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত যেন কোনো গোষ্ঠী বা স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে সাময়িক সমস্যা ভেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আজ শিল্পে গ্যাস নেই, কাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি নেই—এভাবে সংকট সামাল দিতে থাকলে একসময় পুরো অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। একটি হলো সংকট দেখা দিলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। অন্যটি হলো সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় পথটিই কঠিন, কিন্তু টেকসই। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গতি, অফশোর সম্ভাবনা কাজে লাগানো, এলএনজি আমদানিতে বাস্তবসম্মত কৌশল, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো এবং আর্থিকভাবে টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন—সবকিছুর সমন্বিত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া শিল্পের নিরাপত্তা নেই, শিল্পের নিরাপত্তা ছাড়া কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই, আর কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সম্ভব নয়। সুতরাং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে কেবল একটি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় ইস্যু। সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। অন্ধকারের এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু আলো জ্বালানো নয়—এটি বাংলাদেশের শিল্প, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পথও আলোকিত করা। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
রাজনীতিতে শিষ্টাচার: ভিন্নমত হোক যুক্তির, ভাষা হোক সভ্যতার
রাজনীতিতে শিষ্টাচার: ভিন্নমত হোক যুক্তির, ভাষা হোক সভ্যতার মোহাম্মদ হাসান পক্ষ-বিপক্ষ, মত-মতান্তর, ভিন্নমত কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা—এসব রাজনীতির চিরাচরিত উপাদান। রাজনীতি যেখানে মত ও আদর্শের সংঘাতের ক্ষেত্র, সেখানে মতবিরোধ থাকবেই। পরনিন্দা, সমালোচনা কিংবা প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করাও গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ। কিন্তু মতের অমিল যখন পারস্পরিক অশ্রদ্ধা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশ্লীলতা ও রুচিহীন ভাষায় রূপ নেয়, তখন তা আর সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ থাকে না। বরং তা রাজনীতির সৌন্দর্য ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ—দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। একসময় রাজনীতির মঞ্চে এমন কিছু স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে, যা মানুষের মস্তিষ্কে ঝড় তুলেছে, চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে, রাজনৈতিক আবেগকে নাড়া দিয়েছে। স্লোগান ছিল তীক্ষ্ণ, বক্তব্য ছিল কঠোর; কিন্তু ভাষায় ছিল ছন্দ, বক্তব্যে ছিল রাজনৈতিক বার্তা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যূনতম শালীনতার সীমারেখা। এখন সেই রাজনৈতিক ভাষার জায়গায় কোথাও কোথাও ঢুকে পড়ছে অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ শব্দ, ব্যক্তিগত কটাক্ষ এবং এমন সব ‘শব্দবোমা’, যা উচ্চারণ করতেও বিবেকে বাধে। প্রশ্ন হলো—এ কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে আমরা এগোচ্ছি? মুখ মানুষের কথা বলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই মুখ দিয়ে যা ইচ্ছা বলা যেমন সভ্যতার পরিচয় নয়, তেমনি যা ইচ্ছা খাওয়াও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। কথারও একটি খাদ্যবিধি আছে—সেখানে যুক্তি থাকবে, সৌজন্য থাকবে, সংযম থাকবে। রাজনৈতিক বক্তব্য যত কঠোরই হোক, তাতে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সামাজিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করার কোনো প্রয়োজন নেই। অশালীন ভাষায় হয়তো মুহূর্তের জন্য মাঠ গরম করা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হাইপ’ তৈরি করা যায়, কয়েক দিনের জন্য ভাইরাল হওয়া যায়। কিন্তু ভাইরাল হওয়া আর মর্যাদা অর্জন করা এক কথা নয়। আলোচনায় আসা আর ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়াও এক বিষয় নয়। সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে যুক্তি, আদর্শ, নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ও আচরণ; গালিগালাজ কিংবা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য নয়। রাজনীতিতে শিষ্টাচার কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি একজন রাজনীতিকের শক্তির পরিচয়। যে নেতা প্রতিপক্ষের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও তাকে সম্মান করতে জানেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারক। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো—আমি আপনার মতের সঙ্গে একমত নই, কিন্তু আপনার মত প্রকাশের অধিকারকে অস্বীকার করছি না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র গালি নয়, যুক্তি। অপমান নয়, তথ্য। হুমকি নয়, জনগণের আস্থা। একজন নেতার আচরণ তার কর্মীদের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। নেতৃত্বে যদি শিষ্টাচার, সংযম ও সৌজন্য থাকে, কর্মীদের মধ্যেও তার প্রতিফলন ঘটে। বিপরীতে নেতৃত্ব যদি প্রতিপক্ষকে অপমান করাকে রাজনৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলে, তাহলে কর্মীদের কাছ থেকেও সভ্য ও সংযত আচরণ প্রত্যাশা করা কঠিন। দলীয় ক্ষমতার মোহে কাউকে গালিগালাজ করলেই কেউ বড় নেতা হয়ে যান না। বড়জোর কিছুদিন আলোচনায় থাকা যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করা যায় না। দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্নমতকে গালিগালাজ ও অপমান করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার অনেকটাই উচ্চারণ বা লেখার অযোগ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশ এই প্রবণতাকে শুধু জায়গাই দিচ্ছে না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে উৎসাহও দিচ্ছে। ফলে যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে ব্যক্তিকে একটি তকমা লাগিয়ে দেওয়া, অর্ধসত্য বা খণ্ডিত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, বিদ্বেষ উসকে দেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে হেয় করাই যেন সহজ পথ হয়ে উঠেছে। এখানে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গাটি হলো—এই ভাষা কেবল রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তা সমাজের বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত যে ভাষা ও আচরণ আমরা দেখি, তা তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক মনোজগতেও প্রভাব ফেলছে। যুক্তির জায়গায় গালিগালাজ, মতবিরোধের জায়গায় অপমান এবং শ্রদ্ধার জায়গায় বিদ্বেষ প্রতিষ্ঠিত হলে একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলবে। কোনো সভ্য সমাজের জন্য এটি শুভ লক্ষণ নয়। এখানে এসে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকেও তাকাতে হয়। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ছে; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—নৈতিক মানুষ কতটা বাড়ছে? শিক্ষিত হওয়া আর সুশিক্ষিত হওয়া এক বিষয় নয়। ডিগ্রি একজন মানুষকে শিক্ষিত পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু নৈতিকতা তাকে প্রকৃত অর্থে মানুষ করে। দুর্নীতি, ঘুষ, প্রতারণা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার কেবল অশিক্ষিত মানুষের হাতে ঘটে না; বরং শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষের একটি অংশও এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এখানেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য ও ব্যর্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি শুধু চাকরির বাজারের জন্য মানুষ তৈরি করছি, নাকি বিবেকবান নাগরিকও তৈরি করছি? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিকতা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং উন্নত চরিত্র গঠনের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ একজন মানুষ কত বড় পদে গেলেন, কত ডিগ্রি অর্জন করলেন কিংবা কত অর্থ উপার্জন করলেন—এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তিনি মানুষ হিসেবে কতটা সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের সঙ্গেও শিক্ষার এই সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আমরা রাজনীতি নিয়ে যতটা আলোচনা করি, শিক্ষা নিয়ে ততটা করি না। ঘরে, বাইরে, অফিস-আদালতে, হাট-বাজারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—রাজনীতি নিয়ে আমাদের আগ্রহের কমতি নেই। অথচ একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে সেই মাত্রায় সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনা খুব একটা দেখা যায় না। রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে যেমন আলোচনা হয়, তেমনি শিক্ষা সংস্কার নিয়েও সমান গুরুত্বে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কারণ সৎ, দায়িত্বশীল ও নৈতিক নাগরিক ছাড়া কোনো সংস্কারই স্থায়ী হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বদলানো সম্ভব, আইন পরিবর্তন করা সম্ভব, নীতিমালা সংশোধন করা সম্ভব; কিন্তু মানুষের নৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন ছাড়া এসব উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন। তাই রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনায় ‘শিষ্টাচার’কে প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক শিষ্টাচার আসলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি। প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, ভিন্নমত সহ্য করা, যুক্তির মাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করা, ভুল হলে তা স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি করা—এসবই সভ্য রাজনীতির লক্ষণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রু নয়। আজ যে ব্যক্তি আপনার প্রতিপক্ষ, আগামীকাল কোনো জাতীয় স্বার্থে তার সঙ্গে একই টেবিলে বসতে হতে পারে। মতের অমিল থাকতেই পারে; কিন্তু সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে দেওয়া গণতন্ত্রের পথ নয়। বরং গণতন্ত্রের শক্তি হলো মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও সহাবস্থান। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে, তর্ক থাকবে, তীব্র সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন চরিত্রহননে পরিণত না হয়, সমালোচনা যেন অশ্লীলতায় না নামে এবং প্রতিবাদ যেন অসভ্য ভাষার আশ্রয় না নেয়—এই সীমারেখাটি আমাদের নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে। কারণ ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়; ভাষা একটি সমাজের রুচি, সংস্কৃতি ও মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। আজ আমরা যে ভাষা ব্যবহার করছি, আগামী প্রজন্ম সেই ভাষাই উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে। তাই রাজনীতিকদের দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা বা ক্ষমতার রাজনীতি করা নয়; সমাজের ভাষা ও আচরণের মানও নির্ধারণ করা। নেতারা যদি সংযত হন, কর্মীরাও সংযম শিখবেন। নেতারা যদি যুক্তি দিয়ে কথা বলেন, কর্মীরাও যুক্তির মূল্য বুঝবেন। আর নেতারা যদি গালিগালাজকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানান, তাহলে সেই বিষ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং সময় এসেছে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন করে শিষ্টাচারের চর্চা ফিরিয়ে আনার। ভিন্নমত থাকবে, মতবিরোধ থাকবে, কঠোর সমালোচনাও থাকবে—কিন্তু ভাষা হবে সভ্য, বক্তব্য হবে যুক্তিনির্ভর এবং আচরণ হবে দায়িত্বশীল। রাজনীতিকে যদি সত্যিই জনকল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে গালির বদলে যুক্তি, বিদ্বেষের বদলে সহনশীলতা, অপমানের বদলে সম্মান এবং অশালীনতার বদলে শিষ্টাচারকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মানদণ্ড করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষার ফল, সনদ কিংবা চাকরির বাজারের প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিক ও মানবিক মানুষ তৈরির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ শিক্ষা যদি বিবেক তৈরি না করে, রাজনীতি যদি শিষ্টাচার শেখাতে না পারে এবং সমাজ যদি ভিন্নমতকে সম্মান করতে না শেখে—তাহলে উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্য যতই বাড়ুক, একটি সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব হবে না। দিনশেষে রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ক্ষমতা নয়, মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থা অর্জনের প্রথম শর্ত—শিষ্টাচার। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
নিখোঁজ মানুষ, নিঃশব্দ রাষ্ট্র: গুম কি এখনও বিশ্বের অদৃশ্য অস্ত্র?
নিখোঁজ মানুষ, নিঃশব্দ রাষ্ট্র: গুম কি এখনও বিশ্বের অদৃশ্য অস্ত্র? বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারো নিখোঁজের অভিযোগ; ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবসে প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সংঘাত ও দমননীতিতে কি এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষকে অদৃশ্য করে দেওয়ার কৌশল? বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার একজন মানুষ নিখোঁজ হলেন। পরিবার থানায় গেল, আদালতে গেল, প্রশাসনের দ্বারস্থ হলো—কিন্তু মিলল না তাঁর অবস্থানের নিশ্চিত তথ্য। তিনি জীবিত কি না, কোথায় আছেন, কী ঘটেছে—সবই রয়ে গেল অজানা। বছরের পর বছর এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকা পরিবারের জন্য গুম তাই শুধু একজন মানুষ হারানোর ঘটনা নয়; এটি সত্য, বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দীর্ঘ লড়াই। প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘের Working Group on Enforced or Involuntary Disappearances-এর নথিতে বিভিন্ন দেশ থেকে এ ধরনের ৬২,৯০৪টি মামলা বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানোর তথ্য রয়েছে। তবে এটি বিশ্বের মোট গুমের সংখ্যা নয়; আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নথিভুক্ত মামলার হিসাব। গুমের প্রকৃত চিত্র নির্ণয় কঠিন। কারণ অনেক পরিবার অভিযোগ করতে ভয় পায়, কোথাও তথ্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত, আবার অনেক ঘটনা যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। ফলে সরকারি ও আন্তর্জাতিক নথির সংখ্যা বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়। বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব অভিযোগ তদন্তে জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনে ১,৮৫০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগের সংখ্যা এবং তদন্তে প্রমাণিত গুমের সংখ্যা এক নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নথিতেও সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন সময়সীমা ও পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাই বাংলাদেশে গুমের চূড়ান্ত সংখ্যা নিয়ে এখনো সতর্কতা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নিখোঁজদের কতজনের সন্ধান মিলেছে, কতজন এখনও নিখোঁজ এবং কতটি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে? এই তিনটি তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ না হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে না।‘আয়না ঘর’ থেকে জবাবদিহির প্রশ্ন বাংলাদেশে কথিত গোপন আটককেন্দ্র ‘আয়না ঘর’ গুমের বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের মূল বিষয় শুধু স্থাপনা শনাক্ত করা নয়; বরং কে সেখানে দায়িত্ব পালন করতেন, কারা আটক ছিলেন, কী নথি ছিল এবং পরে তাদের কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। CCTV, মোবাইল ফোনের তথ্য, যানবাহনের গতিপথ, ডিউটি রোস্টার, আটক রেজিস্টার ও সরকারি নির্দেশনা—এসব ডিজিটাল ও নথিগত প্রমাণই অভিযোগকে প্রমাণভিত্তিক তদন্তে নিয়ে যেতে পারে। গুমের আন্তর্জাতিক চিত্রে সাংবাদিকদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। Reporters Without Borders-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত ১৩৭ সাংবাদিকের মধ্যে অন্তত ৪৬ জন জোরপূর্বক গুমের শিকার। এসব ঘটনা ২২টি দেশ ও চারটি মহাদেশে ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ গুম শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রশ্ন নয়; সত্য অনুসন্ধান, তথ্য প্রকাশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সশস্ত্র সংঘাত গুমের ঝুঁকি আরও বাড়ায়। ইউক্রেন, সিরিয়া ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান নির্ধারণ এখনও বড় মানবাধিকার চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আটক ব্যক্তি, বেসামরিক নাগরিক ও নিখোঁজদের তথ্য গোপন হলে পরিবারগুলোর অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হয়। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে enforced disappearance প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য নতুন আইনি কাঠামোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইনটির তদন্তব্যবস্থা, স্বাধীনতা, সাক্ষী সুরক্ষা ও ভুক্তভোগীর প্রতিকার নিয়ে আরও শক্তিশালী নিশ্চয়তার দাবি জানিয়েছে। কারণ আইন তৈরি করাই শেষ নয়—অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যত শক্তিশালীই হোক, তদন্ত ও বিচার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না সেটিই আসল পরীক্ষা। গুমের ক্ষতি শুধু নিখোঁজ ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উপার্জনক্ষম সদস্য হারালে পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। সন্তানরা অভিভাবক হারায়। আর পরিবার সবচেয়ে বেশি ভোগে অনিশ্চয়তায়। মৃত্যু হলে শোকের একটি পরিসমাপ্তি থাকে। গুমের ক্ষেত্রে থাকে শুধু প্রশ্ন— “সে কোথায়?” এই অনিশ্চয়তাই গুমকে অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে আলাদা করে। গুমের অভিযোগের কার্যকর সমাধানে প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় ডাটাবেস, ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষী সুরক্ষা, পরিবারের আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং দায়ীদের নিরপেক্ষ বিচার। একই সঙ্গে অভিযোগ, যাচাই করা ঘটনা, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি এবং এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য আলাদা করে প্রকাশ করা জরুরি। গুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম ধাপ প্রতিশোধ নয়—সত্য উদঘাটন। একজন মানুষ কোথায় গেলেন, তাঁর কী হয়েছিল এবং কে দায়ী—এই তিন প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত একটি পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয় না। ৩০ আগস্ট তাই শুধু নিখোঁজদের স্মরণ করার দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহির প্রশ্ন তোলার দিন। একজন নাগরিক নিখোঁজ হলে রাষ্ট্র কি শুধু তাঁকে খুঁজবে, নাকি সত্যটাও খুঁজবে?
গ্যাস আছে, কিন্তু চুলায় নেই: ঢাকার মানুষের দিন কাটছে অপেক্ষায়
গ্যাস আছে, কিন্তু চুলায় নেই—ঢাকার মানুষের দিন কাটছে অপেক্ষায় নিম্নচাপের গ্যাসে রান্নাঘর থেকে CNG স্টেশন ও শিল্পকারখানা—সংকটের চাপ কোথায় কতটা, আর এর দায় কার? বিশেষ প্রতিনিধি সঞ্জয় মজুমদার ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সকাল শুরু হওয়ার কথা ছিল রান্নাঘরের চুলায় আগুন জ্বালানোর মধ্য দিয়ে। কিন্তু অনেক পরিবারের বাস্তবতা এখন ভিন্ন। চুলার নব ঘুরিয়েও কাঙ্ক্ষিত আগুন মিলছে না; কোথাও সামান্য আগুন জ্বললেও তা দিয়ে রান্না শেষ করা কঠিন। বাধ্য হয়ে কেউ electric stove, কেউ induction cooker, আবার কেউ মাটির চুলা বা LPG সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে গ্যাসের সংকট শুধু একটি জ্বালানি সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই—এটি এখন নগরজীবনের সময়, ব্যয় ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোকে বিকল্প চুলা ব্যবহারের কথাও উঠে এসেছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দেশে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, তাহলে ঢাকার অনেক বাসাবাড়ির চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না কেন? তথ্য বলছে, Titas-এর বিতরণ নেটওয়ার্কে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ বিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ১.৫ বিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ Titas-এর আওতাধীন বিস্তীর্ণ এলাকায়। গ্যাসের এই ঘাটতির পেছনে LNG সরবরাহের অস্থিরতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি LNG টার্মিনালে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সরবরাহ প্রায় ৪৫০ mmcfd কমে যাওয়ার কথা Titas জানিয়েছিল। তখন Titas-এর আওতাধীন সব ধরনের গ্রাহককে তীব্র নিম্নচাপের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। পরবর্তী সময়ে LNG সরবরাহে ওঠানামা অব্যাহত থাকায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহও চাহিদার তুলনায় অনেক কম ছিল। এক পর্যায়ে জাতীয় দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ mmcfd-এর বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ১,৯৩০ mmcfd-এ নেমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। কিন্তু সংকটের প্রভাব শুধু রান্নাঘরে থেমে নেই। ঢাকার রাস্তায় CNGচালকদের জন্য তৈরি হয়েছে আরেক বাস্তবতা। গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক CNG স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। একজন চালককে একটি গাড়িতে গ্যাস নিতে যদি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে তার দৈনিক ট্রিপ কমে যায়, আয় কমে যায় এবং সেই ঘাটতি শেষ পর্যন্ত পরিবহনব্যবস্থার ওপরও পড়ে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গ্যাস-সংকটের কারণে CNG স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ queues-এর কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলেও সংকটের অভিঘাত স্পষ্ট। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুরসহ রাজধানীর আশপাশের শিল্প এলাকায় নিম্ন গ্যাসচাপের কারণে বহু কারখানা উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। নরসিংদীতেই ৩০০-এর বেশি ছোট-বড় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার দাবি এসেছে। অর্থাৎ একটি পরিবারের রান্নাঘরের যে সংকট, তার সঙ্গে দেশের উৎপাদন, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির একটি সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। গ্যাসের সংকট আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপরও চাপ তৈরি করছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হওয়ায় সরবরাহ কমে গেলে gas-fired power plants-এ উৎপাদন কমার ঝুঁকি তৈরি হয়। সাম্প্রতিক গ্যাস-সংকটের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে load shedding বৃদ্ধির কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ফলে একজন নগরবাসী একই সময়ে দুটি সংকটের মুখোমুখি হতে পারেন—চুলায় গ্যাস নেই, আবার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা electric stove চালাতেও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এখানেই প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে চাহিদা বাড়ছে। ফলে LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস এবং পর্যাপ্ত নতুন অনুসন্ধান না হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ বর্তমান সংকটকে শুধু একটি LNG terminal-এর কারিগরি ত্রুটি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দিকটি আড়ালে থেকে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো দেশের গ্যাস বিতরণ অবকাঠামো। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো distribution ও service line পরিবর্তনের কাজ চলার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। তাই অনুসন্ধানের প্রয়োজন—কত কিলোমিটার পাইপলাইন পুরোনো, কোথায় leakage বেশি, কোথায় network upgrade প্রয়োজন এবং অবকাঠামো আধুনিকায়নের কাজ কতটা এগিয়েছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস-সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এক নয়। তাৎক্ষণিকভাবে LNG supply স্বাভাবিক করা, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখা এবং বিতরণব্যবস্থায় চাপের ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, পাইপলাইন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, LNG নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তবে এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। একটি পরিবারকে যখন রান্নার জন্য electric stove বা LPG কিনতে হয়, CNGচালককে যখন দীর্ঘ সময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, কারখানাকে যখন generator চালাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়, আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে যখন গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ে—তখন গ্যাসের সংকট আর শুধু “energy sector-এর সমস্যা” থাকে না। এটি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতির সমস্যা হয়ে ওঠে। এই প্রতিবেদনের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে ঢাকার অন্তত পাঁচটি এলাকার বাসিন্দা, কয়েকটি CNG স্টেশনের চালক ও কর্মী, restaurant ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের বক্তব্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে Titas Gas, Petrobangla, RPGCL এবং বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জানতে হবে—বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ কী এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের হাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা কতটা আছে। সবশেষে প্রশ্নটি খুব সরল: গ্যাসের জন্য মানুষ যদি প্রতিদিন অপেক্ষা করে, সেই অপেক্ষার মূল্য কে দিচ্ছে? একজন গৃহিণী অতিরিক্ত সময় দিয়ে, একজন CNGচালক আয় হারিয়ে, একজন কারখানা মালিক উৎপাদন কমিয়ে এবং একজন শ্রমিক কর্মঘণ্টা হারিয়ে—সবাই কি একই সংকটের আলাদা আলাদা মূল্য পরিশোধ করছেন? ঢাকার রান্নাঘরের ছোট্ট একটি আগুনের শিখা তাই আজ দেশের বৃহত্তর জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—গ্যাস কি সত্যিই নেই, নাকি সরবরাহব্যবস্থার কোথাও গিয়ে সাধারণ মানুষের চুলায় পৌঁছানোর আগেই তার সংকট শুরু হয়ে যাচ্ছে?
জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের সামনে কতটা বড় সংকট
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কি পানির দখলে? জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের সামনে কতটা বড় সংকট সঞ্জয় মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি | পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন আর শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধির হিসাব করলেই হয় না—হিসাব করতে হচ্ছে পানিরও। কোথাও অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও মিঠাপানির উৎসে বাড়ছে লবণাক্ততা। জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর পানিচক্রকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের ভাষায়, জলবায়ু সংকটের কেন্দ্রেই রয়েছে পানি; বন্যা ও খরার তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও চাপ বাড়ছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। নদী, খাল, বিল ও জলাভূমিনির্ভর এই দেশের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, মৎস্য, শিল্প, নগরজীবন এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুই পানির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও দূষণ, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো একাধিক চাপ বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তাকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশের পানি সংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—দেশটি একই সঙ্গে অতিরিক্ত পানি এবং নিরাপদ পানির ঘাটতির মুখোমুখি। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি ও উজানের প্রবাহে নদী প্লাবিত হয়ে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়; আবার শুষ্ক মৌসুমে অনেক অঞ্চলে পানীয় জল ও সেচের জন্য চাপ বাড়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নদীভাঙনের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয় বলে সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইতেও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও চট্টগ্রাম অঞ্চলে একদিনে ৪১২.৩ মিলিমিটার বৃষ্টির মতো চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যার ফলে আকস্মিক বন্যায় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে সংকটের চেহারা আরও ভয়াবহ। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নদী, মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রবেশ করায় অনেক এলাকায় নিরাপদ মিঠাপানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে উপকূলীয় বাংলাদেশের নদীর লবণাক্ততা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই লবণাক্ততা শুধু পানীয় জলের সমস্যা নয়; এটি কৃষি, মৎস্য, জীবিকা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও যুক্ত। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। অর্থাৎ উপকূলের মানুষের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী বৈশ্বিক তত্ত্ব নয়। অনেক পরিবারের কাছে এটি প্রতিদিনের প্রশ্ন—আজকের পানিটা কোথা থেকে আসবে? বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হলেও শুধু নদীর সংখ্যা দিয়ে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পানি দূষণ, দখল, পলি জমা এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি নদী যদি দূষিত হয় কিংবা শুষ্ক মৌসুমে তার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়, তাহলে মানচিত্রে নদী থাকলেও মানুষের জন্য সেটি নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের Monsoons, Rivers, and Tides প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের সঙ্গে পানির গভীর সম্পর্ক এবং পানি খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে। পানি সংকটের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও স্পষ্ট। জলবায়ু পরিবর্তন বৃষ্টিপাতের ধরন, নদীর প্রবাহ, বন্যা, খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের মতো নিচু ও ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপে এসব পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাভিত্তিক একটি জলবায়ু মডেলিং বিশ্লেষণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় শতবর্ষে একবার সংঘটিত ভয়াবহ storm tide-এর উচ্চতা শতাব্দীর শেষে বর্তমান প্রায় ৩.৫ মিটার থেকে বিভিন্ন জলবায়ু পরিস্থিতিতে প্রায় ৪.৯–৫.৪ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই গবেষণায় কিছু ধরনের চরম storm-tide ঘটনার পুনরাবৃত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছে। এ ধরনের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য ঝুঁকির মডেল হিসেবে দেখা উচিত। তবে বার্তাটি স্পষ্ট—উপকূলীয় বাংলাদেশের জন্য পানি ও জলবায়ু নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমছে। ঠিক এমন এক সময়ে ২৩ থেকে ২৭ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে World Water Week 2026। এবারের প্রতিপাদ্য—“Water for People and Progress”। বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারক, গবেষক, পানি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একটি ন্যায্য ও পানি-নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছেন। আন্তর্জাতিক এই আলোচনায় বাংলাদেশের গুরুত্ব আলাদা। কারণ বাংলাদেশের পানির ভবিষ্যৎ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে না। আন্তঃসীমান্ত নদী, উজানের পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে পানি বাংলাদেশের জন্য পরিবেশগত সম্পদের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়। আগামী দিনের পানি সংকট শুধু পানি থাকবে কি থাকবে না—এমন সরল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, নিরাপদ পানি কে পাবে, কতটা পাবে এবং কত খরচে পাবে। পানি যদি শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে কিংবা কৃষি, শিল্প ও মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্যে অসমভাবে বণ্টিত হয়, তাহলে পানি সংকট সামাজিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বব্যাংক বলছে, বিশ্বে ২ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের অভাবে রয়েছে এবং পানি নিরাপত্তা এখন বৈশ্বিক উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা। বাংলাদেশের জন্য নদী ও জলাভূমি রক্ষা, পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবহার, উপকূলীয় লবণাক্ততা মোকাবিলা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের সামনে তাই এখন একটি কঠিন বাস্তবতা—পানি হয়তো হারিয়ে যাবে না, কিন্তু নিরাপদ পানি ক্রমেই দুর্লভ ও মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। আজ যে নদীকে আমরা দখল করছি, যে জলাশয় ভরাট করছি, যে পানিকে দূষিত করছি কিংবা যে ভূগর্ভস্থ পানি সীমাহীনভাবে তুলে নিচ্ছি—তার মূল্য হয়তো দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে। তাই প্রশ্নটি শুধু “পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কি পানির দখলে?” নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো— আমরা কি এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করছি, যেখানে পানি থাকবে—কিন্তু নিরাপদ পানি থাকবে না?
জলবায়ু পরিবর্তন: বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য ও মানবিক ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তন: বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য ও মানবিক ঝুঁকি - নিকোলাস বিশ্বাস জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু পরিচিত দৃশ্য - ভয়াবহ দাবানল, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কিংবা খরায় ফেটে যাওয়া মাটি। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশনের পর্দায় এসব দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি স্থান পায়। কারণ এগুলো তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান এবং উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এগুলো জলবায়ু সংকটের কেবল দৃশ্যমান অংশ। যেমনি হিমশৈলের (Iceberg) সবচেয়ে বড় এবং গভীর অংশ লুকিয়ে থাকে পানির নিচে তেমনি জলবায়ূ পরিবর্তনের গভীর প্রভাব ও ক্ষত মিশে থাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মাঝে যা উপর থেকে দেখা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ফসলহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এই সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দৃশ্যমান দুর্যোগের বাইরে গিয়ে এর অন্তর্নিহিত কারণ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দৃশ্যমান দুর্যোগ: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকাশ্য রূপ বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা ক্রমাগত বাড়ছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এবং দাবানল পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করছে। এসব দুর্যোগ তাৎক্ষণিক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সরকার ও মানবিক সংস্থাগুলো ত্রাণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ থাকে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই, অথচ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো অনেক বেশি গভীর এবং জটিল যা আমাদের জীবনকে দূর্বীসহ করে তোলে। দুর্যোগের আড়ালে শুরু হয় আরেকটি সংকট প্রতিটি জলবায়ুজনিত দুর্যোগ একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার সূচনা করে। যখন খরায় ফসল নষ্ট হয়, তখন শুধু কৃষকের উৎপাদনই কমে না; খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয়, বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি হয়। কৃষক তার আয়ের উৎস হারান, পরিবারগুলো ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয় এবং অনেক মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একইভাবে নদী, খাল ও জলাধার শুকিয়ে গেলে শুধু পানির সংকটই সৃষ্টি হয় না; কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, যা তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগকেও সীমিত করে। খাদ্য নিরাপত্তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুতর কিন্তু কম আলোচিত প্রভাবগুলোর একটি হলো খাদ্য নিরাপত্তা। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা ও খরার কারণে কৃষি উৎপাদন দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের ক্ষুদ্র কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফসলের উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। দরিদ্র পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে কম এবং নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণ করে। এর ফলে অপুষ্টি বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে। ক্ষুধা তখন শুধু একটি মানবিক সংকট নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব হুমকি জলবায়ু পরিবর্তন এখন জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং তাপজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যার কারণে নিরাপদ পানির উৎস দূষিত হয়ে কলেরা, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অনেক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে জরুরি চিকিৎসা প্রদান ব্যাহত হয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্বাস্থ্যখাতকে আরও শক্তিশালী ও সহনশীল করে গড়ে তোলা জরুরি। অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বৈষম্যের বিস্তার জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিটি দুর্যোগের পর সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠনে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তারা সঞ্চয় হারায়, ঋণগ্রস্ত হয়, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যেসব জনগোষ্ঠীর দায় সবচেয়ে কম, তারাই এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা, বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বহু এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ফলে জলবায়ুজনিত অভিবাসন দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে সীমিত ভূমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক অঞ্চলে সামাজিক উত্তেজনা, সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ নতুন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। ভবিষ্যতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ এবং বৈশ্বিক অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু বা পরিবেশগত অভিবাসীর সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১০০ কোটিরও বেশি হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হতে পারে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই প্রায় ২ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারে। Internal Displacement Monitoring Centre (IDMC) -এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে (২০১৪–২০২৩) জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে যা বিভিন্ন দেশে অমানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। জলবায়ু সংকট: উন্নয়নেরও বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষা ব্যাহত হয়। স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে ব্যয় করতে হয়। ফলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন অনেক দেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এজন্য পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই জরুরী। দুর্যোগের আগে বিনিয়োগই সর্বোত্তম সমাধান জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা, বন ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা দুর্যোগ ঘটার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে এবং তাদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরে তাকানোর সময় এখনই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটিই মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করে। তাই শুধু বন্যা, খরা কিংবা দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করলেই চলবে না। আমাদের দেখতে হবে খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বাস্তুচ্যুতি এবং উন্নয়নের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এই সামগ্রিক চিত্রটি উপলব্ধি করলেই আমরা এমন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সহনশীল, নিরাপদ এবং টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। উপসংহার: সংকটের আড়ালে গভীর সংকট জলবায়ু পরিবর্তন কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। অতএব, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আমাদের শুধু দৃশ্যমান দুর্যোগ নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলোর প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ প্রকৃত সমাধান তখনই সম্ভব, যখন আমরা কেবল লক্ষণ নয়, সংকটের মূল কারণ এবং এর বহুমাত্রিক প্রভাব মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করব। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সহনশীল এবং টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রীল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।