মতামত
সঙ্কটে জ্বালানি খাত: গ্যাস-বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের বৃত্ত থেকে মুক্তির উপায়
সঙ্কটে জ্বালানি খাত: গ্যাস-বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের বৃত্ত থেকে মুক্তির উপায় মোহাম্মদ হাসান একটি দেশের অর্থনীতির চাকা কতটা সচল, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা। শিল্প-কারখানা চলবে, কৃষি উৎপাদন হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে, মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক থাকবে—এসবের পেছনে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটি আর কেবল জনদুর্ভোগের বিষয় নয়; বরং অর্থনীতি, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য একটি বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমে একদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানায়। কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও কারখানার যন্ত্রপাতি নির্ধারিত সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। অনেক উদ্যোক্তাকে অতিরিক্ত ব্যয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমছে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংকটটি আকস্মিক নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি, আমদানিনির্ভরতার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি। ফলে আজ যে সংকট আমরা দেখছি, তা আসলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সমস্যারই বহিঃপ্রকাশ। চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের বিশাল ব্যবধান দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো চাহিদা ও সরবরাহের বিপুল ব্যবধান। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি। বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানিসহ সরবরাহ প্রায় ২,৮৩২ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে রয়েছে বিপুল ঘাটতি। এই ঘাটতি শুধু রান্নার চুলা কিংবা শিল্প-কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানির অভাবে সেই সক্ষমতার একটি অংশ অকার্যকর পড়ে থাকছে। এটি নিঃসন্দেহে পরিকল্পনার একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, সঞ্চালন অবকাঠামো আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই—এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। শিল্পে সংকট, অর্থনীতিতে অভিঘাত জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি অনুভূত হচ্ছে উৎপাদন খাতে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকলে শিল্পের যন্ত্রপাতি স্বাভাবিক গতিতে চালানো যায় না। উৎপাদন চক্র ব্যাহত হয়, সময়মতো পণ্য তৈরি করা সম্ভব হয় না এবং কারখানার নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে বিদেশি ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু একটি চালান বিলম্বিত হয় না; দীর্ঘমেয়াদে ক্রেতার আস্থা ও বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে কারখানা চালু রাখতে উদ্যোক্তাদের অনেক ক্ষেত্রে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। একজন উদ্যোক্তার পক্ষে দীর্ঘদিন এভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দাম, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানে। এখানেই গ্যাস সংকট একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়। উৎপাদন কমলে কর্মঘণ্টা কমে, আয় কমে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে। তাই শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে দেখতে হবে। এলএনজি আমদানি কি একমাত্র সমাধান? দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কতটা আমদানি এবং কী ধরনের আমদানিনির্ভরতা? আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কখনো বাড়ে, কখনো কমে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, সরবরাহ-শৃঙ্খলের বিঘ্ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার—সবকিছুই আমদানিকৃত জ্বালানির ব্যয়কে প্রভাবিত করে। ফলে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। যেখানে প্রয়োজন সেখানে এলএনজি আমদানি থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিশেষ করে স্থলভাগের সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দেশের সমুদ্রসীমায় বিপুল সম্ভাবনার কথা বহুদিন ধরেই আলোচিত। কিন্তু সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর অনুসন্ধান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। কোথায় কী পরিমাণ গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে হলে নিয়মিত ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও অনুসন্ধান চালাতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি গ্যাস ও এলএনজির পাশাপাশি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হতে পারে নবায়নযোগ্য শক্তি। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তির মতো উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর এখনই সময়। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্প-কারখানা, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো যেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত করা যেতে পারে। তবে নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে অবাস্তব উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের প্রযুক্তি, গ্রিডের সক্ষমতা, জমির প্রাপ্যতা, বিনিয়োগের ব্যয় এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। অপচয় কমানোও নতুন জ্বালানি উৎপাদনের সমান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সংকটের সমাধান শুধু নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় কতটা অপচয় হচ্ছে, কোথায় সিস্টেম লস বেশি, কোথায় অব্যবস্থাপনা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে অপচয়, অবৈধ সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটি কমাতে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একইভাবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দক্ষ করতে হবে। বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন চুক্তি, প্রকল্পের ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ও নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা অন্যান্য আর্থিক দায়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের স্বার্থ, বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা এবং চুক্তির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত। জ্বালানি নীতিতে দরকার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থাকা জাতীয় জ্বালানি নীতি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতির মৌলিক দিক পরিবর্তিত হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং সংকট আরও গভীর হতে পারে। জ্বালানি অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, আমদানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, জ্বালানি দক্ষতা এবং মূল্য নির্ধারণ—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত, গবেষণা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত যেন কোনো গোষ্ঠী বা স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে সাময়িক সমস্যা ভেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আজ শিল্পে গ্যাস নেই, কাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি নেই—এভাবে সংকট সামাল দিতে থাকলে একসময় পুরো অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। একটি হলো সংকট দেখা দিলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। অন্যটি হলো সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় পথটিই কঠিন, কিন্তু টেকসই। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গতি, অফশোর সম্ভাবনা কাজে লাগানো, এলএনজি আমদানিতে বাস্তবসম্মত কৌশল, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো এবং আর্থিকভাবে টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন—সবকিছুর সমন্বিত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া শিল্পের নিরাপত্তা নেই, শিল্পের নিরাপত্তা ছাড়া কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই, আর কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সম্ভব নয়। সুতরাং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে কেবল একটি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় ইস্যু। সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। অন্ধকারের এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু আলো জ্বালানো নয়—এটি বাংলাদেশের শিল্প, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পথও আলোকিত করা। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
রাজনীতিতে শিষ্টাচার: ভিন্নমত হোক যুক্তির, ভাষা হোক সভ্যতার
রাজনীতিতে শিষ্টাচার: ভিন্নমত হোক যুক্তির, ভাষা হোক সভ্যতার মোহাম্মদ হাসান পক্ষ-বিপক্ষ, মত-মতান্তর, ভিন্নমত কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা—এসব রাজনীতির চিরাচরিত উপাদান। রাজনীতি যেখানে মত ও আদর্শের সংঘাতের ক্ষেত্র, সেখানে মতবিরোধ থাকবেই। পরনিন্দা, সমালোচনা কিংবা প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করাও গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ। কিন্তু মতের অমিল যখন পারস্পরিক অশ্রদ্ধা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশ্লীলতা ও রুচিহীন ভাষায় রূপ নেয়, তখন তা আর সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ থাকে না। বরং তা রাজনীতির সৌন্দর্য ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ—দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। একসময় রাজনীতির মঞ্চে এমন কিছু স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে, যা মানুষের মস্তিষ্কে ঝড় তুলেছে, চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে, রাজনৈতিক আবেগকে নাড়া দিয়েছে। স্লোগান ছিল তীক্ষ্ণ, বক্তব্য ছিল কঠোর; কিন্তু ভাষায় ছিল ছন্দ, বক্তব্যে ছিল রাজনৈতিক বার্তা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যূনতম শালীনতার সীমারেখা। এখন সেই রাজনৈতিক ভাষার জায়গায় কোথাও কোথাও ঢুকে পড়ছে অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ শব্দ, ব্যক্তিগত কটাক্ষ এবং এমন সব ‘শব্দবোমা’, যা উচ্চারণ করতেও বিবেকে বাধে। প্রশ্ন হলো—এ কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে আমরা এগোচ্ছি? মুখ মানুষের কথা বলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই মুখ দিয়ে যা ইচ্ছা বলা যেমন সভ্যতার পরিচয় নয়, তেমনি যা ইচ্ছা খাওয়াও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। কথারও একটি খাদ্যবিধি আছে—সেখানে যুক্তি থাকবে, সৌজন্য থাকবে, সংযম থাকবে। রাজনৈতিক বক্তব্য যত কঠোরই হোক, তাতে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সামাজিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করার কোনো প্রয়োজন নেই। অশালীন ভাষায় হয়তো মুহূর্তের জন্য মাঠ গরম করা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হাইপ’ তৈরি করা যায়, কয়েক দিনের জন্য ভাইরাল হওয়া যায়। কিন্তু ভাইরাল হওয়া আর মর্যাদা অর্জন করা এক কথা নয়। আলোচনায় আসা আর ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়াও এক বিষয় নয়। সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে যুক্তি, আদর্শ, নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ও আচরণ; গালিগালাজ কিংবা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য নয়। রাজনীতিতে শিষ্টাচার কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি একজন রাজনীতিকের শক্তির পরিচয়। যে নেতা প্রতিপক্ষের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও তাকে সম্মান করতে জানেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারক। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো—আমি আপনার মতের সঙ্গে একমত নই, কিন্তু আপনার মত প্রকাশের অধিকারকে অস্বীকার করছি না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র গালি নয়, যুক্তি। অপমান নয়, তথ্য। হুমকি নয়, জনগণের আস্থা। একজন নেতার আচরণ তার কর্মীদের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। নেতৃত্বে যদি শিষ্টাচার, সংযম ও সৌজন্য থাকে, কর্মীদের মধ্যেও তার প্রতিফলন ঘটে। বিপরীতে নেতৃত্ব যদি প্রতিপক্ষকে অপমান করাকে রাজনৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলে, তাহলে কর্মীদের কাছ থেকেও সভ্য ও সংযত আচরণ প্রত্যাশা করা কঠিন। দলীয় ক্ষমতার মোহে কাউকে গালিগালাজ করলেই কেউ বড় নেতা হয়ে যান না। বড়জোর কিছুদিন আলোচনায় থাকা যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করা যায় না। দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্নমতকে গালিগালাজ ও অপমান করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার অনেকটাই উচ্চারণ বা লেখার অযোগ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশ এই প্রবণতাকে শুধু জায়গাই দিচ্ছে না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে উৎসাহও দিচ্ছে। ফলে যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে ব্যক্তিকে একটি তকমা লাগিয়ে দেওয়া, অর্ধসত্য বা খণ্ডিত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, বিদ্বেষ উসকে দেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে হেয় করাই যেন সহজ পথ হয়ে উঠেছে। এখানে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গাটি হলো—এই ভাষা কেবল রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তা সমাজের বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত যে ভাষা ও আচরণ আমরা দেখি, তা তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক মনোজগতেও প্রভাব ফেলছে। যুক্তির জায়গায় গালিগালাজ, মতবিরোধের জায়গায় অপমান এবং শ্রদ্ধার জায়গায় বিদ্বেষ প্রতিষ্ঠিত হলে একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলবে। কোনো সভ্য সমাজের জন্য এটি শুভ লক্ষণ নয়। এখানে এসে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকেও তাকাতে হয়। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ছে; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—নৈতিক মানুষ কতটা বাড়ছে? শিক্ষিত হওয়া আর সুশিক্ষিত হওয়া এক বিষয় নয়। ডিগ্রি একজন মানুষকে শিক্ষিত পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু নৈতিকতা তাকে প্রকৃত অর্থে মানুষ করে। দুর্নীতি, ঘুষ, প্রতারণা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার কেবল অশিক্ষিত মানুষের হাতে ঘটে না; বরং শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষের একটি অংশও এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এখানেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য ও ব্যর্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি শুধু চাকরির বাজারের জন্য মানুষ তৈরি করছি, নাকি বিবেকবান নাগরিকও তৈরি করছি? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিকতা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং উন্নত চরিত্র গঠনের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ একজন মানুষ কত বড় পদে গেলেন, কত ডিগ্রি অর্জন করলেন কিংবা কত অর্থ উপার্জন করলেন—এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তিনি মানুষ হিসেবে কতটা সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের সঙ্গেও শিক্ষার এই সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আমরা রাজনীতি নিয়ে যতটা আলোচনা করি, শিক্ষা নিয়ে ততটা করি না। ঘরে, বাইরে, অফিস-আদালতে, হাট-বাজারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—রাজনীতি নিয়ে আমাদের আগ্রহের কমতি নেই। অথচ একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে সেই মাত্রায় সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনা খুব একটা দেখা যায় না। রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে যেমন আলোচনা হয়, তেমনি শিক্ষা সংস্কার নিয়েও সমান গুরুত্বে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কারণ সৎ, দায়িত্বশীল ও নৈতিক নাগরিক ছাড়া কোনো সংস্কারই স্থায়ী হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বদলানো সম্ভব, আইন পরিবর্তন করা সম্ভব, নীতিমালা সংশোধন করা সম্ভব; কিন্তু মানুষের নৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন ছাড়া এসব উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন। তাই রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনায় ‘শিষ্টাচার’কে প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক শিষ্টাচার আসলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি। প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, ভিন্নমত সহ্য করা, যুক্তির মাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করা, ভুল হলে তা স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি করা—এসবই সভ্য রাজনীতির লক্ষণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রু নয়। আজ যে ব্যক্তি আপনার প্রতিপক্ষ, আগামীকাল কোনো জাতীয় স্বার্থে তার সঙ্গে একই টেবিলে বসতে হতে পারে। মতের অমিল থাকতেই পারে; কিন্তু সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে দেওয়া গণতন্ত্রের পথ নয়। বরং গণতন্ত্রের শক্তি হলো মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও সহাবস্থান। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে, তর্ক থাকবে, তীব্র সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন চরিত্রহননে পরিণত না হয়, সমালোচনা যেন অশ্লীলতায় না নামে এবং প্রতিবাদ যেন অসভ্য ভাষার আশ্রয় না নেয়—এই সীমারেখাটি আমাদের নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে। কারণ ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়; ভাষা একটি সমাজের রুচি, সংস্কৃতি ও মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। আজ আমরা যে ভাষা ব্যবহার করছি, আগামী প্রজন্ম সেই ভাষাই উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে। তাই রাজনীতিকদের দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা বা ক্ষমতার রাজনীতি করা নয়; সমাজের ভাষা ও আচরণের মানও নির্ধারণ করা। নেতারা যদি সংযত হন, কর্মীরাও সংযম শিখবেন। নেতারা যদি যুক্তি দিয়ে কথা বলেন, কর্মীরাও যুক্তির মূল্য বুঝবেন। আর নেতারা যদি গালিগালাজকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানান, তাহলে সেই বিষ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং সময় এসেছে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন করে শিষ্টাচারের চর্চা ফিরিয়ে আনার। ভিন্নমত থাকবে, মতবিরোধ থাকবে, কঠোর সমালোচনাও থাকবে—কিন্তু ভাষা হবে সভ্য, বক্তব্য হবে যুক্তিনির্ভর এবং আচরণ হবে দায়িত্বশীল। রাজনীতিকে যদি সত্যিই জনকল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে গালির বদলে যুক্তি, বিদ্বেষের বদলে সহনশীলতা, অপমানের বদলে সম্মান এবং অশালীনতার বদলে শিষ্টাচারকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মানদণ্ড করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষার ফল, সনদ কিংবা চাকরির বাজারের প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিক ও মানবিক মানুষ তৈরির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ শিক্ষা যদি বিবেক তৈরি না করে, রাজনীতি যদি শিষ্টাচার শেখাতে না পারে এবং সমাজ যদি ভিন্নমতকে সম্মান করতে না শেখে—তাহলে উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্য যতই বাড়ুক, একটি সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব হবে না। দিনশেষে রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ক্ষমতা নয়, মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থা অর্জনের প্রথম শর্ত—শিষ্টাচার। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
নিখোঁজ মানুষ, নিঃশব্দ রাষ্ট্র: গুম কি এখনও বিশ্বের অদৃশ্য অস্ত্র?
নিখোঁজ মানুষ, নিঃশব্দ রাষ্ট্র: গুম কি এখনও বিশ্বের অদৃশ্য অস্ত্র? বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারো নিখোঁজের অভিযোগ; ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবসে প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সংঘাত ও দমননীতিতে কি এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষকে অদৃশ্য করে দেওয়ার কৌশল? বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদার একজন মানুষ নিখোঁজ হলেন। পরিবার থানায় গেল, আদালতে গেল, প্রশাসনের দ্বারস্থ হলো—কিন্তু মিলল না তাঁর অবস্থানের নিশ্চিত তথ্য। তিনি জীবিত কি না, কোথায় আছেন, কী ঘটেছে—সবই রয়ে গেল অজানা। বছরের পর বছর এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকা পরিবারের জন্য গুম তাই শুধু একজন মানুষ হারানোর ঘটনা নয়; এটি সত্য, বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দীর্ঘ লড়াই। প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘের Working Group on Enforced or Involuntary Disappearances-এর নথিতে বিভিন্ন দেশ থেকে এ ধরনের ৬২,৯০৪টি মামলা বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানোর তথ্য রয়েছে। তবে এটি বিশ্বের মোট গুমের সংখ্যা নয়; আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নথিভুক্ত মামলার হিসাব। গুমের প্রকৃত চিত্র নির্ণয় কঠিন। কারণ অনেক পরিবার অভিযোগ করতে ভয় পায়, কোথাও তথ্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত, আবার অনেক ঘটনা যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। ফলে সরকারি ও আন্তর্জাতিক নথির সংখ্যা বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়। বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব অভিযোগ তদন্তে জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনে ১,৮৫০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগের সংখ্যা এবং তদন্তে প্রমাণিত গুমের সংখ্যা এক নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নথিতেও সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন সময়সীমা ও পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাই বাংলাদেশে গুমের চূড়ান্ত সংখ্যা নিয়ে এখনো সতর্কতা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নিখোঁজদের কতজনের সন্ধান মিলেছে, কতজন এখনও নিখোঁজ এবং কতটি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে? এই তিনটি তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ না হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে না।‘আয়না ঘর’ থেকে জবাবদিহির প্রশ্ন বাংলাদেশে কথিত গোপন আটককেন্দ্র ‘আয়না ঘর’ গুমের বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের মূল বিষয় শুধু স্থাপনা শনাক্ত করা নয়; বরং কে সেখানে দায়িত্ব পালন করতেন, কারা আটক ছিলেন, কী নথি ছিল এবং পরে তাদের কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। CCTV, মোবাইল ফোনের তথ্য, যানবাহনের গতিপথ, ডিউটি রোস্টার, আটক রেজিস্টার ও সরকারি নির্দেশনা—এসব ডিজিটাল ও নথিগত প্রমাণই অভিযোগকে প্রমাণভিত্তিক তদন্তে নিয়ে যেতে পারে। গুমের আন্তর্জাতিক চিত্রে সাংবাদিকদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। Reporters Without Borders-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত ১৩৭ সাংবাদিকের মধ্যে অন্তত ৪৬ জন জোরপূর্বক গুমের শিকার। এসব ঘটনা ২২টি দেশ ও চারটি মহাদেশে ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ গুম শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রশ্ন নয়; সত্য অনুসন্ধান, তথ্য প্রকাশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সশস্ত্র সংঘাত গুমের ঝুঁকি আরও বাড়ায়। ইউক্রেন, সিরিয়া ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান নির্ধারণ এখনও বড় মানবাধিকার চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আটক ব্যক্তি, বেসামরিক নাগরিক ও নিখোঁজদের তথ্য গোপন হলে পরিবারগুলোর অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হয়। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে enforced disappearance প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য নতুন আইনি কাঠামোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইনটির তদন্তব্যবস্থা, স্বাধীনতা, সাক্ষী সুরক্ষা ও ভুক্তভোগীর প্রতিকার নিয়ে আরও শক্তিশালী নিশ্চয়তার দাবি জানিয়েছে। কারণ আইন তৈরি করাই শেষ নয়—অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যত শক্তিশালীই হোক, তদন্ত ও বিচার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না সেটিই আসল পরীক্ষা। গুমের ক্ষতি শুধু নিখোঁজ ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উপার্জনক্ষম সদস্য হারালে পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। সন্তানরা অভিভাবক হারায়। আর পরিবার সবচেয়ে বেশি ভোগে অনিশ্চয়তায়। মৃত্যু হলে শোকের একটি পরিসমাপ্তি থাকে। গুমের ক্ষেত্রে থাকে শুধু প্রশ্ন— “সে কোথায়?” এই অনিশ্চয়তাই গুমকে অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে আলাদা করে। গুমের অভিযোগের কার্যকর সমাধানে প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় ডাটাবেস, ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষী সুরক্ষা, পরিবারের আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং দায়ীদের নিরপেক্ষ বিচার। একই সঙ্গে অভিযোগ, যাচাই করা ঘটনা, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি এবং এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য আলাদা করে প্রকাশ করা জরুরি। গুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম ধাপ প্রতিশোধ নয়—সত্য উদঘাটন। একজন মানুষ কোথায় গেলেন, তাঁর কী হয়েছিল এবং কে দায়ী—এই তিন প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত একটি পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয় না। ৩০ আগস্ট তাই শুধু নিখোঁজদের স্মরণ করার দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহির প্রশ্ন তোলার দিন। একজন নাগরিক নিখোঁজ হলে রাষ্ট্র কি শুধু তাঁকে খুঁজবে, নাকি সত্যটাও খুঁজবে?
গ্যাস আছে, কিন্তু চুলায় নেই: ঢাকার মানুষের দিন কাটছে অপেক্ষায়
গ্যাস আছে, কিন্তু চুলায় নেই—ঢাকার মানুষের দিন কাটছে অপেক্ষায় নিম্নচাপের গ্যাসে রান্নাঘর থেকে CNG স্টেশন ও শিল্পকারখানা—সংকটের চাপ কোথায় কতটা, আর এর দায় কার? বিশেষ প্রতিনিধি সঞ্জয় মজুমদার ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সকাল শুরু হওয়ার কথা ছিল রান্নাঘরের চুলায় আগুন জ্বালানোর মধ্য দিয়ে। কিন্তু অনেক পরিবারের বাস্তবতা এখন ভিন্ন। চুলার নব ঘুরিয়েও কাঙ্ক্ষিত আগুন মিলছে না; কোথাও সামান্য আগুন জ্বললেও তা দিয়ে রান্না শেষ করা কঠিন। বাধ্য হয়ে কেউ electric stove, কেউ induction cooker, আবার কেউ মাটির চুলা বা LPG সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে গ্যাসের সংকট শুধু একটি জ্বালানি সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই—এটি এখন নগরজীবনের সময়, ব্যয় ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোকে বিকল্প চুলা ব্যবহারের কথাও উঠে এসেছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দেশে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, তাহলে ঢাকার অনেক বাসাবাড়ির চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না কেন? তথ্য বলছে, Titas-এর বিতরণ নেটওয়ার্কে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ বিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ১.৫ বিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ Titas-এর আওতাধীন বিস্তীর্ণ এলাকায়। গ্যাসের এই ঘাটতির পেছনে LNG সরবরাহের অস্থিরতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি LNG টার্মিনালে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সরবরাহ প্রায় ৪৫০ mmcfd কমে যাওয়ার কথা Titas জানিয়েছিল। তখন Titas-এর আওতাধীন সব ধরনের গ্রাহককে তীব্র নিম্নচাপের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। পরবর্তী সময়ে LNG সরবরাহে ওঠানামা অব্যাহত থাকায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহও চাহিদার তুলনায় অনেক কম ছিল। এক পর্যায়ে জাতীয় দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ mmcfd-এর বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ১,৯৩০ mmcfd-এ নেমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। কিন্তু সংকটের প্রভাব শুধু রান্নাঘরে থেমে নেই। ঢাকার রাস্তায় CNGচালকদের জন্য তৈরি হয়েছে আরেক বাস্তবতা। গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক CNG স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। একজন চালককে একটি গাড়িতে গ্যাস নিতে যদি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে তার দৈনিক ট্রিপ কমে যায়, আয় কমে যায় এবং সেই ঘাটতি শেষ পর্যন্ত পরিবহনব্যবস্থার ওপরও পড়ে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গ্যাস-সংকটের কারণে CNG স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ queues-এর কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলেও সংকটের অভিঘাত স্পষ্ট। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুরসহ রাজধানীর আশপাশের শিল্প এলাকায় নিম্ন গ্যাসচাপের কারণে বহু কারখানা উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। নরসিংদীতেই ৩০০-এর বেশি ছোট-বড় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার দাবি এসেছে। অর্থাৎ একটি পরিবারের রান্নাঘরের যে সংকট, তার সঙ্গে দেশের উৎপাদন, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির একটি সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। গ্যাসের সংকট আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপরও চাপ তৈরি করছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হওয়ায় সরবরাহ কমে গেলে gas-fired power plants-এ উৎপাদন কমার ঝুঁকি তৈরি হয়। সাম্প্রতিক গ্যাস-সংকটের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে load shedding বৃদ্ধির কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ফলে একজন নগরবাসী একই সময়ে দুটি সংকটের মুখোমুখি হতে পারেন—চুলায় গ্যাস নেই, আবার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা electric stove চালাতেও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এখানেই প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে চাহিদা বাড়ছে। ফলে LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস এবং পর্যাপ্ত নতুন অনুসন্ধান না হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ বর্তমান সংকটকে শুধু একটি LNG terminal-এর কারিগরি ত্রুটি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দিকটি আড়ালে থেকে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো দেশের গ্যাস বিতরণ অবকাঠামো। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো distribution ও service line পরিবর্তনের কাজ চলার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। তাই অনুসন্ধানের প্রয়োজন—কত কিলোমিটার পাইপলাইন পুরোনো, কোথায় leakage বেশি, কোথায় network upgrade প্রয়োজন এবং অবকাঠামো আধুনিকায়নের কাজ কতটা এগিয়েছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস-সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এক নয়। তাৎক্ষণিকভাবে LNG supply স্বাভাবিক করা, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখা এবং বিতরণব্যবস্থায় চাপের ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, পাইপলাইন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, LNG নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তবে এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। একটি পরিবারকে যখন রান্নার জন্য electric stove বা LPG কিনতে হয়, CNGচালককে যখন দীর্ঘ সময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, কারখানাকে যখন generator চালাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়, আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে যখন গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ে—তখন গ্যাসের সংকট আর শুধু “energy sector-এর সমস্যা” থাকে না। এটি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতির সমস্যা হয়ে ওঠে। এই প্রতিবেদনের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে ঢাকার অন্তত পাঁচটি এলাকার বাসিন্দা, কয়েকটি CNG স্টেশনের চালক ও কর্মী, restaurant ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের বক্তব্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে Titas Gas, Petrobangla, RPGCL এবং বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জানতে হবে—বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ কী এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের হাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা কতটা আছে। সবশেষে প্রশ্নটি খুব সরল: গ্যাসের জন্য মানুষ যদি প্রতিদিন অপেক্ষা করে, সেই অপেক্ষার মূল্য কে দিচ্ছে? একজন গৃহিণী অতিরিক্ত সময় দিয়ে, একজন CNGচালক আয় হারিয়ে, একজন কারখানা মালিক উৎপাদন কমিয়ে এবং একজন শ্রমিক কর্মঘণ্টা হারিয়ে—সবাই কি একই সংকটের আলাদা আলাদা মূল্য পরিশোধ করছেন? ঢাকার রান্নাঘরের ছোট্ট একটি আগুনের শিখা তাই আজ দেশের বৃহত্তর জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—গ্যাস কি সত্যিই নেই, নাকি সরবরাহব্যবস্থার কোথাও গিয়ে সাধারণ মানুষের চুলায় পৌঁছানোর আগেই তার সংকট শুরু হয়ে যাচ্ছে?
জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের সামনে কতটা বড় সংকট
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কি পানির দখলে? জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের সামনে কতটা বড় সংকট সঞ্জয় মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি | পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন আর শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধির হিসাব করলেই হয় না—হিসাব করতে হচ্ছে পানিরও। কোথাও অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও মিঠাপানির উৎসে বাড়ছে লবণাক্ততা। জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর পানিচক্রকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের ভাষায়, জলবায়ু সংকটের কেন্দ্রেই রয়েছে পানি; বন্যা ও খরার তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও চাপ বাড়ছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। নদী, খাল, বিল ও জলাভূমিনির্ভর এই দেশের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, মৎস্য, শিল্প, নগরজীবন এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুই পানির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও দূষণ, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো একাধিক চাপ বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তাকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশের পানি সংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—দেশটি একই সঙ্গে অতিরিক্ত পানি এবং নিরাপদ পানির ঘাটতির মুখোমুখি। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি ও উজানের প্রবাহে নদী প্লাবিত হয়ে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়; আবার শুষ্ক মৌসুমে অনেক অঞ্চলে পানীয় জল ও সেচের জন্য চাপ বাড়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নদীভাঙনের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয় বলে সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইতেও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও চট্টগ্রাম অঞ্চলে একদিনে ৪১২.৩ মিলিমিটার বৃষ্টির মতো চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যার ফলে আকস্মিক বন্যায় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে সংকটের চেহারা আরও ভয়াবহ। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নদী, মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রবেশ করায় অনেক এলাকায় নিরাপদ মিঠাপানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে উপকূলীয় বাংলাদেশের নদীর লবণাক্ততা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই লবণাক্ততা শুধু পানীয় জলের সমস্যা নয়; এটি কৃষি, মৎস্য, জীবিকা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও যুক্ত। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। অর্থাৎ উপকূলের মানুষের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী বৈশ্বিক তত্ত্ব নয়। অনেক পরিবারের কাছে এটি প্রতিদিনের প্রশ্ন—আজকের পানিটা কোথা থেকে আসবে? বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হলেও শুধু নদীর সংখ্যা দিয়ে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পানি দূষণ, দখল, পলি জমা এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি নদী যদি দূষিত হয় কিংবা শুষ্ক মৌসুমে তার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়, তাহলে মানচিত্রে নদী থাকলেও মানুষের জন্য সেটি নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের Monsoons, Rivers, and Tides প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের সঙ্গে পানির গভীর সম্পর্ক এবং পানি খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে। পানি সংকটের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও স্পষ্ট। জলবায়ু পরিবর্তন বৃষ্টিপাতের ধরন, নদীর প্রবাহ, বন্যা, খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের মতো নিচু ও ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপে এসব পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাভিত্তিক একটি জলবায়ু মডেলিং বিশ্লেষণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় শতবর্ষে একবার সংঘটিত ভয়াবহ storm tide-এর উচ্চতা শতাব্দীর শেষে বর্তমান প্রায় ৩.৫ মিটার থেকে বিভিন্ন জলবায়ু পরিস্থিতিতে প্রায় ৪.৯–৫.৪ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই গবেষণায় কিছু ধরনের চরম storm-tide ঘটনার পুনরাবৃত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছে। এ ধরনের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য ঝুঁকির মডেল হিসেবে দেখা উচিত। তবে বার্তাটি স্পষ্ট—উপকূলীয় বাংলাদেশের জন্য পানি ও জলবায়ু নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমছে। ঠিক এমন এক সময়ে ২৩ থেকে ২৭ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে World Water Week 2026। এবারের প্রতিপাদ্য—“Water for People and Progress”। বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারক, গবেষক, পানি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একটি ন্যায্য ও পানি-নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছেন। আন্তর্জাতিক এই আলোচনায় বাংলাদেশের গুরুত্ব আলাদা। কারণ বাংলাদেশের পানির ভবিষ্যৎ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে না। আন্তঃসীমান্ত নদী, উজানের পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে পানি বাংলাদেশের জন্য পরিবেশগত সম্পদের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়। আগামী দিনের পানি সংকট শুধু পানি থাকবে কি থাকবে না—এমন সরল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, নিরাপদ পানি কে পাবে, কতটা পাবে এবং কত খরচে পাবে। পানি যদি শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে কিংবা কৃষি, শিল্প ও মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্যে অসমভাবে বণ্টিত হয়, তাহলে পানি সংকট সামাজিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বব্যাংক বলছে, বিশ্বে ২ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের অভাবে রয়েছে এবং পানি নিরাপত্তা এখন বৈশ্বিক উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা। বাংলাদেশের জন্য নদী ও জলাভূমি রক্ষা, পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবহার, উপকূলীয় লবণাক্ততা মোকাবিলা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের সামনে তাই এখন একটি কঠিন বাস্তবতা—পানি হয়তো হারিয়ে যাবে না, কিন্তু নিরাপদ পানি ক্রমেই দুর্লভ ও মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। আজ যে নদীকে আমরা দখল করছি, যে জলাশয় ভরাট করছি, যে পানিকে দূষিত করছি কিংবা যে ভূগর্ভস্থ পানি সীমাহীনভাবে তুলে নিচ্ছি—তার মূল্য হয়তো দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে। তাই প্রশ্নটি শুধু “পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কি পানির দখলে?” নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো— আমরা কি এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করছি, যেখানে পানি থাকবে—কিন্তু নিরাপদ পানি থাকবে না?
জলবায়ু পরিবর্তন: বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য ও মানবিক ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তন: বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য ও মানবিক ঝুঁকি - নিকোলাস বিশ্বাস জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু পরিচিত দৃশ্য - ভয়াবহ দাবানল, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কিংবা খরায় ফেটে যাওয়া মাটি। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশনের পর্দায় এসব দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি স্থান পায়। কারণ এগুলো তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান এবং উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এগুলো জলবায়ু সংকটের কেবল দৃশ্যমান অংশ। যেমনি হিমশৈলের (Iceberg) সবচেয়ে বড় এবং গভীর অংশ লুকিয়ে থাকে পানির নিচে তেমনি জলবায়ূ পরিবর্তনের গভীর প্রভাব ও ক্ষত মিশে থাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মাঝে যা উপর থেকে দেখা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ফসলহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এই সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দৃশ্যমান দুর্যোগের বাইরে গিয়ে এর অন্তর্নিহিত কারণ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দৃশ্যমান দুর্যোগ: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকাশ্য রূপ বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা ক্রমাগত বাড়ছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এবং দাবানল পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করছে। এসব দুর্যোগ তাৎক্ষণিক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সরকার ও মানবিক সংস্থাগুলো ত্রাণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ থাকে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই, অথচ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো অনেক বেশি গভীর এবং জটিল যা আমাদের জীবনকে দূর্বীসহ করে তোলে। দুর্যোগের আড়ালে শুরু হয় আরেকটি সংকট প্রতিটি জলবায়ুজনিত দুর্যোগ একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার সূচনা করে। যখন খরায় ফসল নষ্ট হয়, তখন শুধু কৃষকের উৎপাদনই কমে না; খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয়, বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি হয়। কৃষক তার আয়ের উৎস হারান, পরিবারগুলো ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয় এবং অনেক মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একইভাবে নদী, খাল ও জলাধার শুকিয়ে গেলে শুধু পানির সংকটই সৃষ্টি হয় না; কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, যা তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগকেও সীমিত করে। খাদ্য নিরাপত্তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুতর কিন্তু কম আলোচিত প্রভাবগুলোর একটি হলো খাদ্য নিরাপত্তা। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা ও খরার কারণে কৃষি উৎপাদন দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের ক্ষুদ্র কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফসলের উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। দরিদ্র পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে কম এবং নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণ করে। এর ফলে অপুষ্টি বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে। ক্ষুধা তখন শুধু একটি মানবিক সংকট নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব হুমকি জলবায়ু পরিবর্তন এখন জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং তাপজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যার কারণে নিরাপদ পানির উৎস দূষিত হয়ে কলেরা, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অনেক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে জরুরি চিকিৎসা প্রদান ব্যাহত হয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্বাস্থ্যখাতকে আরও শক্তিশালী ও সহনশীল করে গড়ে তোলা জরুরি। অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বৈষম্যের বিস্তার জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিটি দুর্যোগের পর সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠনে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তারা সঞ্চয় হারায়, ঋণগ্রস্ত হয়, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যেসব জনগোষ্ঠীর দায় সবচেয়ে কম, তারাই এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা, বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বহু এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ফলে জলবায়ুজনিত অভিবাসন দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে সীমিত ভূমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক অঞ্চলে সামাজিক উত্তেজনা, সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ নতুন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। ভবিষ্যতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ এবং বৈশ্বিক অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু বা পরিবেশগত অভিবাসীর সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১০০ কোটিরও বেশি হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হতে পারে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই প্রায় ২ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারে। Internal Displacement Monitoring Centre (IDMC) -এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে (২০১৪–২০২৩) জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে যা বিভিন্ন দেশে অমানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। জলবায়ু সংকট: উন্নয়নেরও বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষা ব্যাহত হয়। স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে ব্যয় করতে হয়। ফলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন অনেক দেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এজন্য পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই জরুরী। দুর্যোগের আগে বিনিয়োগই সর্বোত্তম সমাধান জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা, বন ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা দুর্যোগ ঘটার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে এবং তাদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরে তাকানোর সময় এখনই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটিই মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করে। তাই শুধু বন্যা, খরা কিংবা দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করলেই চলবে না। আমাদের দেখতে হবে খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বাস্তুচ্যুতি এবং উন্নয়নের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এই সামগ্রিক চিত্রটি উপলব্ধি করলেই আমরা এমন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সহনশীল, নিরাপদ এবং টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। উপসংহার: সংকটের আড়ালে গভীর সংকট জলবায়ু পরিবর্তন কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। অতএব, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আমাদের শুধু দৃশ্যমান দুর্যোগ নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলোর প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ প্রকৃত সমাধান তখনই সম্ভব, যখন আমরা কেবল লক্ষণ নয়, সংকটের মূল কারণ এবং এর বহুমাত্রিক প্রভাব মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করব। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সহনশীল এবং টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রীল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।
জঙ্গিবাদের নতুন ছায়া: আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সতর্কতা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নতুন কোনো বাস্তবতা নয়। ২০০৫ সালের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা থেকে শুরু করে হলি আর্টিজান হামলা—অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, উগ্রবাদী তৎপরতাকে শুরুতেই শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা না গেলে তা দ্রুত বড় নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার, নব্য জেএমবির তৎপরতা নিয়ে আলোচনা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার সেল গঠনের চেষ্টার তথ্য—সব মিলিয়ে বিষয়টিকে তাই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে অযথা আতঙ্ক ছড়ানোও সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন তথ্যনির্ভর তদন্ত, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা আরও জোরদার করা। সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের প্রতিবেদনে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএসের কর্মকাণ্ডের পরিবর্তিত কৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। বড় সংগঠিত ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা এবং শক্তিশালী লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক তৈরির যে প্রবণতার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে সংগঠনটির সেল গঠনের চেষ্টার কথা যদি প্রতিবেদনে উঠে এসে থাকে, তাহলে সেটিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দায়িত্ব। জাতিসংঘের কোনো প্রতিবেদনকে অন্ধভাবে সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো আশঙ্কাকে গুরুত্বহীন মনে করে উপেক্ষা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টির দ্রুত ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান। এরই মধ্যে সাভার, আশুলিয়া ও ঢাকায় বিস্ফোরক বা বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলো নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিবাদের সরাসরি সম্পর্ক আছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানোর কারণ নেই। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো একই সময়ে ঘটতে থাকলে সেগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খুঁজে দেখা জরুরি। এখানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সিটিটিসি বলছে, তারা প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করছে এবং এই মুহূর্তে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা দেখছে না। এই বক্তব্য স্বস্তিদায়ক। কিন্তু নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘বড় ঘটনা ঘটেনি’—এটিকে কখনোই ‘ঝুঁকি নেই’-এর সমার্থক হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং বড় ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য আগাম সতর্কতাই সবচেয়ে কার্যকর নিরাপত্তা কৌশল। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। জঙ্গিবাদ সাধারণত একদিনে বড় আকার ধারণ করে না। ছোট ছোট সংগঠন, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, প্রচার এবং গোপন নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে একটি কাঠামো তৈরি হয়। তাই বোমা উদ্ধারের মতো ঘটনাকে কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না; একই সঙ্গে এগুলোর উৎস, অর্থের প্রবাহ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য পৃষ্ঠপোষকতার দিকও তদন্ত করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা। কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক দুর্বলতা বা সামাজিক অস্থিরতার সুযোগ উগ্রবাদী গোষ্ঠী নিতে পারে—এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে। কারাগার থেকে জঙ্গি আসামির পালিয়ে যাওয়া কিংবা পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের কার্যক্রমও তাই যথাযথ নজরদারির আওতায় থাকা প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যও জরুরি—কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাকে অপরাধী ধরে নেওয়া যাবে না; আইন, আদালত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো—জঙ্গিবাদ মোকাবিলার বিষয়টি যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন বা হয়রানির হাতিয়ার না হয়ে ওঠে। কোনো বিস্ফোরণ, বোমা উদ্ধার কিংবা উগ্রবাদী তৎপরতার অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু তদন্তের ফলাফলের আগে রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ বা সংগঠনের ভিত্তিতে কাউকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করা হলে প্রকৃত হুমকি শনাক্ত করার কাজই দুর্বল হয়ে পড়বে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ যে ‘প্রক্সি’ তৎপরতা কিংবা বাইরের অর্থায়নের সম্ভাবনার কথা বলছেন, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। কিন্তু এমন সংবেদনশীল অভিযোগের ক্ষেত্রেও অনুমান ও প্রমাণকে আলাদা রাখতে হবে। কোন দেশ, কোন সংগঠন বা কোন পক্ষ অর্থায়ন করছে—এমন দাবি কেবল গোয়েন্দা তথ্য, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং তদন্তের ভিত্তিতেই করা উচিত। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা শুধু পুলিশের কাজ নয়। এটি একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, কারা কর্তৃপক্ষ, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উগ্রবাদী প্রচারণা, অর্থ সংগ্রহ, নিয়োগ ও যোগাযোগের বিষয়গুলোতে নজরদারি আরও আধুনিক করতে হবে। তবে নজরদারি মানেই নির্বিচার হয়রানি নয়। নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনকে অক্ষুণ্ণ রেখেই সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে হবে। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কঠোর হাতে অপরাধ দমনে নয়; বরং একই সঙ্গে ন্যায়বিচার ও নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়া মানেই দেশে জঙ্গিবাদের বড় উত্থান ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্ত যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়াও বিপজ্জনক। এখন সবচেয়ে প্রয়োজন সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি তথ্য যাচাই করা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে আতঙ্ক নয়, আস্থা তৈরি করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হবে গুজব নয়, তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করা। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হবে উত্তেজনা সৃষ্টি না করে অনুসন্ধানী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করা। আর নাগরিকদের দায়িত্ব হবে সন্দেহজনক কোনো তৎপরতা দেখলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো এবং গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকা। জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো—আগে শনাক্ত করা, প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা এবং বড় ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধ করা। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করেছে। বর্তমানের ঘটনাগুলো সেই সতর্কবার্তাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে শোনার দাবি রাখে। তাই এখন আতঙ্ক নয়—প্রয়োজন সতর্কতা, গোয়েন্দা সক্ষমতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। লেখক: মোহাম্মদ হাসান সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের নীরব আগ্রাসন: জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও রাষ্ট্রের করণীয়
প্লাস্টিক আধুনিক সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এর বহুমুখী ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, শিল্পোৎপাদনকে গতিশীল করেছে এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছে এক নীরব সংকট—মাইক্রোপ্লাস্টিক। পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। একসময় এটি কেবল পরিবেশ দূষণের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এটি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি গুরুতর বৈশ্বিক উদ্বেগ। আজ আমরা যে পানি পান করি, যে খাবার খাই, যে বাতাসে শ্বাস নিই, এমনকি যে টুথপেস্ট দিয়ে প্রতিদিন দাঁত মাজি—সবখানেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। ফলে অজান্তেই প্রতিদিন আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। বিষয়টি আর কেবল পরিবেশবিদদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে প্রচলিত কিছু টুথপেস্ট ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকজাত ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যদিও সব ব্র্যান্ড বা সব দেশে একই চিত্র নয় এবং অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এসব উপাদান ব্যবহার বন্ধ করেছে, তবুও বিষয়টি ভোক্তাদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, কারণ দাঁত ব্রাশ করার সময় তারা অনেক সময় টুথপেস্ট গিলে ফেলে। কেবল প্রসাধনী বা টুথপেস্ট নয়, খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গবেষণায় সামুদ্রিক মাছ, লবণ, বোতলজাত পানি, কিছু ফলমূল, দুগ্ধজাত খাদ্য এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্যে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। এর প্রধান কারণ পরিবেশে অনিয়ন্ত্রিত প্লাস্টিক দূষণ। যত্রতত্র ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও প্যাকেজিং সামগ্রী সূর্যের তাপ, বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের ফলে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। পরে সেগুলো মাটি, নদী ও সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক মানুষ এখনো মনে করেন পানি ফুটিয়ে নিলেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি দূর হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। পানি ফুটালে জীবাণু ধ্বংস হলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণ অপসারিত হয় না। একইভাবে সাধারণ অনেক পানির ফিল্টারও অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পুরোপুরি ছেঁকে ফেলতে সক্ষম নয়। ফলে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার প্রচলিত ধারণাগুলোর পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। তবে এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, এই কণাগুলো শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে এবং হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় মানবদেহের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, এমনকি প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। যদিও হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যান্সার বা নির্দিষ্ট রোগের সঙ্গে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবুও সম্ভাব্য ঝুঁকি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানাচ্ছেন। এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোক্তা অধিকার। অধিকাংশ পণ্যের গায়ে উপাদানের তালিকা এমন ছোট অক্ষরে লেখা থাকে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা পড়া কঠিন। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত নাম ব্যবহার করায় ভোক্তারা বুঝতেই পারেন না পণ্যটিতে কী ধরনের উপাদান রয়েছে। তাই ক্ষতিকর বা বিতর্কিত উপাদান থাকলে তা পণ্যের মোড়কের সামনের অংশে সহজ ভাষায় এবং স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার বিধান থাকা প্রয়োজন। এতে ভোক্তা সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল ব্যবহার, প্লাস্টিকের বিকল্প উদ্ভাবন এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কেবল মুনাফা নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা, গবেষণায় বিনিয়োগ, শিল্পকারখানার মান নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি একযোগে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্ব কম নয়। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, কাপড় বা পাটের ব্যাগ ব্যবহার, প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথ স্থানে ফেলা, প্লাস্টিক পোড়ানো থেকে বিরত থাকা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো—এসব ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিক কোনো ভবিষ্যতের সংকট নয়; এটি ইতোমধ্যেই আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, দায়িত্বশীল নীতি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। আজ যদি আমরা প্লাস্টিক ব্যবহারে সংযমী হই, দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হই এবং নিরাপদ উৎপাদন ও ভোগব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাই, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়া সম্ভব হবে। নইলে এই নীরব বিষের মূল্য শুধু আমাদের স্বাস্থ্য নয়, দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হবে। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
রাষ্ট্র কি শুধু ইতিহাস নিয়েই বাঁচবে, নাকি ভবিষ্যৎও নির্মাণ করবে?
একটি জাতি শুধু ইতিহাসকে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না; তাকে ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে হয়। ইতিহাস আমাদের পরিচয় দেয়, আত্মপরিচয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে শেখায়। কিন্তু কোনো জাতি যদি প্রতিদিন শুধু অতীত নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তবে একসময় সে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ইতিহাস সম্মানের, কিন্তু উন্নয়ন নির্মিত হয় বর্তমানের সঠিক সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যতের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ওপর। চীনের শেনজেন আজ বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি নগরী। অথচ মাত্র চার দশক আগে এটি ছিল একটি ছোট জেলেপাড়া। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে আজ প্রযুক্তি, শিক্ষা ও শিল্পে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। সিঙ্গাপুরের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না; কিন্তু সুশাসন, দক্ষ নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে তারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে—উন্নয়নের জন্য সম্পদের চেয়ে সঠিক নীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই দেশগুলো ইতিহাস ভুলে যায়নি। কিন্তু তারা ইতিহাসকে ভবিষ্যতের পথে বাধা হতে দেয়নি। তারা অতীতকে স্মরণ করেছে, আর ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশও একদিন এমন স্বপ্ন দেখেছিল। আজও সেই স্বপ্ন বেঁচে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমাদের জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কী? আমরা কি বিজ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, নাকি এখনো রাজনৈতিক বিভাজন, স্লোগান, মিছিল এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি? রাষ্ট্রের শক্তি তার বক্তৃতায় নয়; তার প্রতিষ্ঠানে। একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যায় আদালতের স্বাধীনতায়, প্রশাসনের জবাবদিহিতে, নাগরিক সেবার মানে, শিক্ষার গুণগত উন্নতিতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। যদি জুলাইয়ের ঘটনায় বহু মানুষ নিহত হয়ে থাকেন এবং আরও অনেকে গুরুতর আহত বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন—যেমন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে—তাহলে নাগরিক হিসেবে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক: এই ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটনে কী অগ্রগতি হয়েছে? দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও বিচারের প্রক্রিয়া কোথায় দাঁড়িয়ে? এমন বড় ঘটনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার। একইভাবে, এ ধরনের সংবেদনশীল ঘটনা নিয়ে গবেষণাভিত্তিক কাজেরও গুরুত্ব রয়েছে। একটি ডকুমেন্টারি শুধু কিছু ভিডিওচিত্রের সমষ্টি নয়। এর জন্য প্রয়োজন তথ্য যাচাই, নথিপত্র, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ। ইতিহাসের দলিল তৈরির দায়িত্ব হালকাভাবে নেওয়া যায় না। আরেকটি প্রশ্ন আমাকে দীর্ঘদিন ভাবায়—দেশে এত মিটিং-মিছিলের প্রকৃত অর্জন কী? গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও দেখতে হবে, সেই কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জীবন, কর্মঘণ্টা ও অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব ফেলছে। যদি একটি কর্মসূচির ফলে মানুষের দুর্ভোগই বেশি বাড়ে, তবে তার কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত। গণতন্ত্রে প্রশ্ন করা যেমন অধিকার, তেমনি প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও দায়িত্ব। ব্যক্তিগতভাবে আমি বরাবরই দলীয় ছাত্র রাজনীতির সমালোচক। এটি একটি নীতিগত অবস্থান, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। আমার বিশ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে। শিক্ষার্থীদের সময়, মেধা ও শক্তি ব্যয় হওয়া উচিত গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, সাহিত্য এবং দক্ষতা অর্জনে। রাজনৈতিক সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যেন এমন হয়, যেখানে মতের ভিন্নতা সহিংসতার নয়, যুক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রকে বুঝতে চাইলে সংসদের দিকে তাকানোর পাশাপাশি রাস্তায়ও তাকাতে হয়। সেই রাস্তায় দেখা যায়—একজন রিকশাচালক সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করছেন। তিনি হয়তো দেশের জিডিপি, বৈদেশিক ঋণ বা ব্যাংকিং খাতের জটিল পরিসংখ্যান জানেন না। কিন্তু তিনি জানেন, আজ কাজ না করলে আজ তাঁর পরিবারের খাবার জুটবে না। উন্নয়নের সব পরিকল্পনার কেন্দ্রে এই মানুষটির জীবনমান থাকা উচিত। আমিও একজন সাধারণ নাগরিক। আমার অভিজ্ঞতাও খুব আলাদা নয়। গত দুই মাস ধরে আমার বাসায় গ্যাসের সংযোগ নেই। তবুও নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে বিদ্যুতের চুলায় রান্না করায় বিদ্যুৎ বিলও বেড়ে গেছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত অসুবিধা নয়; এটি একটি বড় প্রশ্নের প্রতীক—নাগরিক সেবার মান কতটা কার্যকর? একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সফলতা কেবল বড় প্রকল্পে নয়; বরং একজন সাধারণ নাগরিক সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটিতেও। নেতৃত্বের বিষয়েও কিছু কথা বলা জরুরি। নেতৃত্ব কেবল একটি পদ নয়; এটি একটি দায়িত্ব। ইতিহাসে যেসব নেতা মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, তারা সংকটের সময় মানুষের পাশে থেকেছেন। আবার ইতিহাস এটাও দেখিয়েছে, কোনো নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা, সময় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে। তাই ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করাই একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ। একজন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা খুব বড় নয়। আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে একজন কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন, একজন শ্রমিক সম্মানজনক মজুরি পাবেন, একজন শিক্ষার্থী নিরাপদ ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশে পড়াশোনা করবেন, একজন উদ্যোক্তা হয়রানির শিকার হবেন না, একজন রোগী ন্যায্য চিকিৎসা পাবেন এবং একজন সাধারণ নাগরিক সেবা পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত ভোগান্তিতে পড়বেন না। পরিবর্তন শুধু সরকার পরিবর্তনের নাম নয়। পরিবর্তন মানে নাগরিকের জীবন সহজ হওয়া। পরিবর্তন মানে দুর্নীতি কমা, সেবার মান বাড়া, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পাওয়া এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা। শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়তে চাই? একটি বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিদিন অতীতের দ্বন্দ্বই আলোচনার বিষয় হবে, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে আগামী প্রজন্ম বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, শিল্প, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে? আমার বিশ্বাস, এই দেশের মানুষ বিলাসিতা চায় না। তারা চায় ন্যায্য সেবা, আইনের সমান প্রয়োগ, সুশাসন, জবাবদিহি, কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার স্লোগানে নয়, তার প্রতিষ্ঠানে। একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি তার অতীতের গৌরবে নয়, তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতায়। ইতিহাস আমাদের অনুপ্রেরণা দেবে, কিন্তু আগামী প্রজন্ম আমাদের বিচার করবে—আমরা তাদের জন্য কেমন রাষ্ট্র রেখে গেলাম। মোঃ মনির হোসেন গ্রন্থাগারিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক
মাদকের নীরব আগ্রাসন: জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সংকট
বাংলাদেশের উন্নয়ন, অবকাঠামোগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নানা আলোচনার আড়ালে একটি ভয়ংকর সংকট ক্রমেই গভীরতর হচ্ছে—মাদকের বিস্তার। ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), ফেন্সিডিল, হেরোইন ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা আজ শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এক বহুমাত্রিক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য আইরিশ টাইমস বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তির বিস্তার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সেখানে একজন আসক্তের বক্তব্য—"ইয়াবা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়"—আসলে কেবল একজন ব্যক্তির হতাশা নয়, বরং একটি সমাজের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে, তখন সেটি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের জন্যও আত্মসমালোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে ওঠে। ইয়াবা মূলত মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি একটি শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক। এটি মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন ব্যবস্থাকে অস্বাভাবিকভাবে উদ্দীপিত করে সাময়িক উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, অনিদ্রা, বিষণ্নতা, সাইকোসিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং স্থায়ী মানসিক বিকারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আসক্ত ব্যক্তি নিজের আচরণ, আবেগ এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশে মাদকাসক্তির প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে কিছু পার্থক্য থাকলেও এটি স্পষ্ট যে সমস্যাটি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ এবং এমনকি নারী ও কিশোর-কিশোরীরাও এই মাদকের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে। এটি দেশের জনমিতিক সুবিধাকে (Demographic Dividend) দুর্বল করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সিনথেটিক মাদক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেই রুট ব্যবহার করে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়েও বিভিন্ন ধরনের মাদক চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া এই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অতীতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে, বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং অসংখ্য ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেবল অভিযান ও গ্রেপ্তার দিয়ে মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়নি। কারণ মাদকের সরবরাহের পাশাপাশি এর চাহিদাও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। আসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক পুনঃএকীভূতকরণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতিও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক তরুণকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। অথচ দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। ফলে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা বা কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ পান না। মাদকের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম ভয়াবহ নয়। উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, স্বাস্থ্যসেবায় অতিরিক্ত ব্যয়, অপরাধ বৃদ্ধি, বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ এবং পরিবারে অর্থনৈতিক বিপর্যয়—সব মিলিয়ে এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের বোঝা সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে মাদক পাচারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধ, অর্থপাচার এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল। সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করতে হবে। মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মানসম্মত মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। আধুনিক কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলে অনেক আসক্তকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রযুক্তিনির্ভর গোপনীয় হেল্পলাইন, অনলাইন কাউন্সেলিং এবং গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাদককে কেবল অপরাধের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না; এটিকে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তরুণ প্রজন্ম। তাদের মাদকাসক্তির অন্ধকার থেকে রক্ষা করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক পুনর্বাসন, সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াই কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযান নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, জাতীয় নিরাপত্তা এবং একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে সফল হতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সর্বস্তরের নাগরিক অংশগ্রহণ—এই তিনটির সমন্বয়ই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, এটি হলো সমাজ বদলের ইঞ্জিন
সংঘাতমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ ছাএ রাজনীতি দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ দিনের প্রধান প্রত্যাশা। ক্যাম্পাস গুলোতে দখল দারিত্ব, হানাহানি ও শক্তির প্রদর্শনের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে সুস্থ সহাবস্থান এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের রাজনীতি গড়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি। রাজনীতি বলতে আমরা কি বুঝি ? রাষ্ট্রের বা সরকারের বা জনগণের বিভিন্ন সমস্যা, সুযোগ - সুবিধা, ভালো - মন্দ নিয়ে কথা বলা বা সমলোচনা করা কি রাজনীতি নয় ? বর্তমানে দেশের অস্থিতিশীলতা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে কথা বলা কি রাজনীতি নয় ? তাহলে রাজনীতি কি শুধু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং না করার মাঝেই সীমাবদ্ধ ? নাকি চাঁদাবাজি, হল দখল, জমি দখল, খাল দখল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এই সব হল রাজনীতি। ছাএ রাজনীতির আদর্শগত ভিত্তি হতে হবে সঠিক দিকনির্দেশনা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণের প্রতি নিবেদিত। এ ক্ষেত্রে ছাএ রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক উন্নয়ন। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং গনতান্ত্রিক মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থীদের রাজনীতি অবশ্যই সুশৃঙ্খল ও শিক্ষার্থী কেন্দ্রীক হওয়া উচিত। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং তাদের নেতৃত্ব গুন বিকাশিত হয়। তবে বলপ্রয়োগ বা সংঘাতের রাজনীতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে। ছাএ রাজনীতি হচ্ছে দেশের গনতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম মূল্যবান ভিত্তি। ছাএ রাজনীতি শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, সচেতনতা, অধিকার সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। ইতিহাসে দেখা যায়, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গনতান্ত্রিক সংগ্রামে ছাএ সমাজ কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্ব বা অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে। সুস্থ আর সুন্দর ছাএ রাজনীতি শিক্ষার্থীদের যুক্তি, সংগঠিত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠ দিয়ে কথা বলার সাহস জোগায়, তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন ছাএ রাজনীতি আদর্শচ্যুত হয়ে দলীয় স্বার্থ, সহিংসতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। তাতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয় এবং অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি ও মূল আলোচনা ছাএ রাজনীতি নিয়ে কিন্তু আমার মতে, ছাএ রাজনীতি পৃথক কোন বিষয় নয়। এর সাথে শিক্ষক রাজনীতি, বিভিন্ন পেশাজীবীদের রাজনীতি, শ্রমজীবী সংগঠনের বিষয় গুলো সম্পৃক্ত। কোনটিকে অন্যটির থেকে পৃথক করে দেখার অবকাশ নেই। দলীয় লেজুরভিত্তি ছাএ সংগঠন বা শিক্ষক, পেশাজীবী, শ্রমজীবী সংগঠনের বিরোধিতা আমি ও করি কিন্তু সেই সঙ্গে এও বলতে চাই যে, গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই সব সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা ও অপরীসিম। প্রজাতন্ত্রের প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্কের অধিকার রয়েছে এবং উচিত ও প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে সজাগ থাকা এবং সে আলোকে নিজের মতামত প্রদান করা। কোন আইন করে নির্দিষ্ট কোন গোষ্ঠী বা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়, যদি না সে গোষ্ঠী বা সংগঠন আদর্শগত ভাবে হিংসাত্মক বা ধ্বংসাত্মক কাজে যুক্ত থাকে।
উন্নয়নের গতিপথে বিকেন্দ্রীকরণের অপরিহার্যতা
রাষ্ট্রের উন্নয়ন কার্যক্রমকে কার্যকর, জনবান্ধব ও টেকসই করতে প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়ন ও সংস্কার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য দাবি। নাগরিকদের জন্য প্রদেয় জনসেবার মান উন্নয়ন, সেবাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনা—এসব লক্ষ্য অর্জনে একটি দক্ষ ও বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো মূলত কেন্দ্রনির্ভর, যা কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে প্রণীত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা কিংবা স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোর প্রায় সবই কেন্দ্রীয়ভাবে গৃহীত হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রণয়ন—সবকিছুই মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড একটি অতিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, যেখানে স্থানীয় বাস্তবতা, বৈচিত্র্য ও চাহিদার যথাযথ প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। অতিকেন্দ্রীকরণের এই প্রবণতা কেবল উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি ও কার্যকারিতাকেই ব্যাহত করছে না; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের ক্ষেত্রেও অন্তরায় সৃষ্টি করছে। স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা, সম্ভাবনা ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান রয়েছে, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয়ের অপচয় এবং কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে জনগণের বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তাই উন্নয়নকে গণমুখী ও বাস্তবমুখী করতে হলে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে নীতিগত বক্তব্য, প্রস্তাব এবং আংশিক উদ্যোগ দেখা গেলেও কার্যকর ও টেকসই কোনো কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮০-এর দশকে উপজেলা পরিষদ গঠনের উদ্যোগকে এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রবণতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা পায়নি। ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীল ও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাস্তবতা হলো, একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। বিকেন্দ্রীকরণ মানে কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পনা গ্রহণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সেবাদানের ক্ষেত্রে বাস্তব ক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কৃষি, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি বাড়বে, অন্যদিকে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট প্রণয়ন, কর আহরণ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত না করা হলে প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিমালা ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কার্যকর তদারকি কাঠামো। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার বিকাশ ও ক্ষমতায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা বিদ্যমান। এসব অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে নতুন করে কোনো কমিশন গঠন বা আনুষ্ঠানিকতা সৃষ্টির চেয়ে অধিক জরুরি হলো—বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ। নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব উদ্যোগে রূপান্তর করতে পারলেই কেবল বিকেন্দ্রীকরণের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। অবশেষে বলা যায়, উন্নয়নকে যদি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং জনগণমুখী করতে হয়, তবে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ আর কোনো বিকল্পহীন ধারণা নয়—এটি এখন অপরিহার্য বাস্তবতা। কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, ক্ষমতার সুষম বণ্টন এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই কেবল একটি শক্তিশালী ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। এখন দেখার বিষয়—নতুন সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং বাস্তব পদক্ষেপ নিতে কতটা আন্তরিকতা প্রদর্শন করে। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
নারী ও শিশু নির্যাতন: বর্তমান বাস্তবতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা
নারী ও শিশু নির্যাতন: বর্তমান বাস্তবতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা - নিকোলাস বিশ্বাস নারী ও শিশু নির্যাতন কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কিংবা অপরাধের পরিসংখ্যানগত হিসাব নয়; এটি একটি সমাজের মানবিকতা, নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে সামনে আসছে। শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, অপহরণ ও হত্যার মতো অপরাধগুলো আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক - সবক্ষেত্রেই এ ধরনের অপরাধ অহরহ ঘটছে। অপরাধীরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক কুসংস্কার এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অসহায় ও দুর্বল মানুষদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। আমাদের সমাজে নারী ও শিশুরা তুলনামূলকভাবে আর্থ-সামাজিক অবস্থানগত কারণে দুর্বল হওয়ায় অপরাধীরা প্রায়ই তাদের সহজ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা কেবল ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের শান্তি, কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা ও প্রবণতা বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতি ২০২৬ সালেও অত্যন্ত সংকটাপন্ন ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন দেশে চলমান সশস্ত্র সংঘাত, সম্মুখসারিতে কাজ করা মানবসেবা ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর তীব্র অর্থসংকট এবং লিঙ্গসমতার অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কয়েক দশকের আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, বিশ্বজুড়ে এখনো প্রায় প্রতি তিনজন নারীর একজন তার জীবদ্দশায় ঘনিষ্ঠ সঙ্গী কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত হয়রানি ও হুমকির মাধ্যমে নারী সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সামাজিক আন্দোলনকারী ও পরিচিত ব্যক্তিত্বদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) শিশুদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান যৌন সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অপরাধীদের প্রতি 'শূন্য-সহনশীলতা' নীতি কার্যকর করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে। দেশের বর্তমান বাস্তবতা ও চিত্র বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা মারাত্মকভাবে বাড়ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এক মাসেই সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২,০১১টি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে - যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর গত নয় মাসের মধ্যে একক মাসে সর্বোচ্চ। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,০৪২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে ৪৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৫ জন শিশু শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা অথবা যৌন নির্যাতনের পর করুণ পরিণতি হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়াও সংগৃহীত উপাত্তসমূহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে নির্দেশ করে: ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৮৬ শতাংশ শিশু শৃঙ্খলার নামে শারীরিক সহিংসতার মুখোমুখি হয় এবং দেশের ৪৭.২ শতাংশ কিশোরীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বাল্যবিবাহ হয়ে যায়। এছাড়া প্রায় ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় সঙ্গীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। বাংলাদেশে ১০২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং '১০৯ ও ১০৯২১' জাতীয় হেল্পলাইনের মতো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে চরম দুর্বলতা রয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নথিভুক্ত হওয়া ৫,৬০০টিরও বেশি যৌন সহিংসতার মামলার মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ মামলায় আসামির শাস্তি বা রায় কার্যকর হয়েছে। জরুরি ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশকে অতিসত্বর একটি ডেডিকেটেড 'শিশু বিষয়ক বিভাগ' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সংস্কার করতে হবে এবং পেশাদার ও সমাজভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কর্মী দল গঠন করতে হবে। সেই সাথে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বিত একটি কার্যকরী কর্মগোষ্ঠী গঠন করা প্রয়োজন, যা সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের মাধ্যমে অরক্ষিত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দেবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে একটি স্থায়ী সুরক্ষা বলয়ে রূপান্তর করবে। তবে এ তথ্যগুলো মূল ঘটনার একটি অংশমাত্র। সামাজিক কলঙ্ক, প্রতিশোধের ভয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং সামাজিক চাপের কারণে অধিকাংশ ভুক্তভোগী আইনি সহায়তা নিতে পারেন না এবং আদালতের বাইরে আপস করতে বাধ্য হন। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মানসিক প্রভাব প্রযুক্তির বিকাশ অপরাধের ধরণ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়াকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। স্মার্টফোন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট এখন সবার হাতে থাকায় যেকোনো নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অতীতেও সহিংসতা হতো, কিন্তু প্রযুক্তি অপ্রতুল থাকায় এত দ্রুত তা সামাজিক প্রভাব তৈরি করতে পারতো না। সামাজিক মাধ্যমে নির্যাতনের বিষয় ছড়ানোর দুটি দিক রয়েছে: ক) ইতিবাচক প্রভাব: অন্যায়ের ভিডিও বা ছবি জনমত গঠন করতে সাহায্য করে, অপরাধীকে দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে। খ) নেতিবাচক প্রভাব: সহিংসতার ভয়াবহ দৃশ্য বারবার দেখার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ, আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। নারী ও শিশুদের ওপর এই মানসিক প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হয়। কোনো মা যখন একটি শিশুর ওপর নির্যাতনের ভিডিও দেখেন, তখন নিজ সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তার মনে স্থায়ী শঙ্কা তৈরি হয়। একইভাবে, প্রকাশ্যে কোনো নারীকে লাঞ্ছিত হতে দেখলে অন্য নারীদের মনে ভয় জন্মায় এবং তারা নিজেদের স্বাধীনতা ও চলাফেরা সংকুচিত করতে পারেন। এভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাও প্রযুক্তি মারফতে পুরো সমাজে এক যৌথ মানসিক আঘাত ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। এছাড়া প্রযুক্তির অসচেতন ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন না রাখা, সংবেদনশীল ছবি বারবার পোস্ট করা কিংবা গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার দ্বিতীয়বার সামাজিকভাবে হেনস্থা ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন। প্রযুক্তি কেবল একটি মাধ্যম; তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। রাজনৈতিক সংঘাত ও পারিবারিক সহিংসতা দলীয় সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গণতান্ত্রিক চর্চায় মতাদর্শিক ভিন্নতা স্বাভাবিক, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধ কোনো ব্যক্তির ওপর অমানবিক অত্যাচারকে সমর্থন করতে পারে না। গণপিটুনি, শারীরিক নির্যাতন, প্রকাশ্যে অপমান ও নৃশংসতা মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে। ক্ষমতা প্রদর্শন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতাকে যখন নিয়মিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। একসময় মানুষের এই কষ্ট দেখে সমাজ উদাসীন হয়ে পড়ে, যা একটি অসুস্থ সামাজিক ব্যবস্থার লক্ষণ। একইভাবে, পারিবারিক সহিংসতা একটি মারাত্মক কিন্তু গোপনীয় সমস্যা। পরিবার ও সমাজ প্রায়ই একে 'ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয়' বলে এড়িয়ে যায়। স্ত্রীর ওপর নির্যাতন, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা এবং বয়োবৃদ্ধ বা দুর্বলদের অপমান করা গুরুতর অপরাধ হলেও সম্মানহানি ও সংসার টিকিয়ে রাখার চাপে ভুক্তভোগীরা নীরব থাকেন। এই নীরবতা অপরাধীকে আরও উৎসাহিত করে। তাই পরিবার ও সমাজকে এ নীরবতা ভেঙে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সমাধানের মূল পথ ও করণীয় নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে শুধু আইন সংশোধন বা আলোচনার আয়োজন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও বহুমুখী পদক্ষেপ: ১. কঠোর ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ: রাজনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতার তোয়াক্কা না করে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘসূত্রতা বিচারব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস নষ্ট করে। ২. নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা: পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিশুদের সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও লিঙ্গসমতার শিক্ষা দিতে হবে। ছেলেদের শেখাতে হবে যে শক্তি কখনো অন্যকে নিপীড়নের অধিকার দেয় না। মেয়েদেরও তাদের অধিকার, আত্মরক্ষা এবং হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। ৩. ভিকটিম দোষারোপ বন্ধ করা: সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা বা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে অপরাধীর ওপর থেকে দায় সরানোর মানসিকতা বাদ দিতে হবে। অপরাধের সমস্ত দায় সম্পূর্ণভাবে অপরাধীর; তবে ভুক্তভোগী সহানুভূতি ও আইনি সমর্থন পাওয়ার যোগ্য। ৪. গণমাধ্যম ও রাজনীতির দায়িত্ব: গণমাধ্যমকে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রেখে দায়িত্বশীল পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি মেনে চলতে হবে এবং কোনো অপরাধীকে দলীয় আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। সম্মিলিত দায়িত্ব ও উপসংহার একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার বড় বড় অট্টালিকা, প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে নয়; বরং তার সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। নারী ও শিশুর সুরক্ষা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এর জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সমাজ, নাগরিক সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা অপরাধকে সমর্থন করার নামান্তর। আজ যে ঘটনা অন্যের পরিবারে ঘটছে, তা আগামীকাল আমাদের নিজেদের ঘরেও ঘটতে পারে। আমাদের এমন এক সমাজ তৈরি করতে হবে যেখানে নারীরা ঘরে ও বাইরে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং শিশুরা ভয়হীন পরিবেশে বড় হবে। কোনো মতপার্থক্যই সহিংসতাকে বৈধ করতে পারে না। নীরবতা ভেঙে সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মাধ্যমেই আমরা একটি বাসযোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি। (নিকোলাস বিশ্বাস একজন উন্নয়নকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল-UNFPA মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।
বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণঃ এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে সর্বমোট ৩৫ হাজারের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) রয়েছে। স্তরভিত্তিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আনুমানিক সংখ্যা নিচে দেওয়া হলো: মাধ্যমিক বিদ্যালয় (হাই স্কুল): সারা দেশে প্রায় ১৯,৭৫৭টি। স্কুল অ্যান্ড কলেজ (উভয় স্তর): প্রায় ১,৩৮২টি। উচ্চমাধ্যমিক কলেজ: ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি মিলিয়ে প্রায় ২,৬৬৪টি। মাদ্রাসা: প্রায় ৯,২৬৫টি। কারিগরি ও ভোকেশনাল: প্রায় ২,২২৫টি। শিক্ষাখাতের সঠিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ও সামগ্রিক ডাটাবেজ তৈরি করতে নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপ ও নিবন্ধন হালনাগাদ করা হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত (মান্থলি পে অর্ডার)। ব্যানবেইসের (BANBEIS) বাৎসরিক প্রতিবেদনে এসব বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষক কে? এমপিওভুক্ত শিক্ষক হলেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) শিক্ষক যারা সরকারের কাছ থেকে মাসিক বেতন-ভাতা পান। “এমপিও” (MPO) এর পূর্ণরূপ হলো “মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার” (Monthly Payment Order), যা দ্বারা এই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। এমপিওভুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পান। বাংলাদেশে শিক্ষার ৯৩ শতাংশই বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে,দীর্ঘমাসাধিককাল সময় ধরে ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মানুষের কাতারেই পড়েন না! তাদের দাবিদাওয়া বলতে কিছুই নেই বা থাকতে পারে না। অথচ আমাদের দেশে মাধ্যমিক শিক্ষা বলতেই বুঝায় বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা। সরকারী মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। অন্যদিকে, দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৩৭ হাজার। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ৫ লাখ। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সাড়ে ২৬ হাজার। এগুলোর ৪ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকার থেকে মূল বেতন ও কিছু ভাতা পান। স্বল্প বেতনে বাড়ি হতে অনেক দূরে গিয়ে তাদের চাকরি, আর্থিক নিরাপত্তা না থাকা এমন মানুষদের চাকরি এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভরপুর। তাই এমপিও সিস্টেম রাখাটা কতোটুকু যুক্তিসংগত তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একটি হিসেবে দেখা যায়- যদি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের বেতনের পুরো অংশ সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নেয় তাহলে সরকারের লাভ বেশী হতো। এমনিতেই বেসরকারি শিক্ষকরা বর্তমানে বেতন স্কেলের শতভাগ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। এছাড়াও আছে বাড়ি ভাড়া আর সামান্য মেডিক্যাল ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা। আমরা বেসরকারি শিক্ষকগণ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার পর জাতীয়করণের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক বিশৃঙ্খলার বদনামতো আছেই। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে যত্রতত্র অর্থ আদায়ে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা একটি ব্যবসায়িক পণ্য পরিণত হয়েছে। জাতীয়করণ হলে শিক্ষা বিতরণের মহান কারিগর শিক্ষকগণ লাভবান হবে না শুধু জাতিও লাভবান হবে। তারা তাদের দোরগোড়ায় পছন্দের সরকারি স্কুল-কলেজ পাবে সাথে তাদের আর্থিক সাশ্রয়ও হবে। ছাত্রছাত্রীদের হতে আদায়কৃত অর্থসহ প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় রাষ্ট্রিয় কোষাগারে নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নিলে এটাই হবে জাতীয়করণের সহজ সরল কাজ। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মাত্র ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা, এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। অথচ একই কারিকুলামের অধীন একই সিলেবাস, একই অ্যাকাডেমিক সময়সূচি, একইভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজে নিয়োজিত থেকেও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে এক বড় ধরনের বৈষম্য। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেলের একধাপ নিচে দেওয়া হয়। তাছাড়া উচ্চতর স্কেলপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন স্কেল ও সহকারি প্রধানদের বেতন স্কেল সমান হওয়ায় সহকারি প্রধান মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ভাতা এখনো সরকারি অনুদান থেকে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের বেতন ভাতা কখন ছাড় হবে তা জানার জন্য সংবাদ মাধ্যমের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। বেতনের খবর এক তারিখের মধ্যে প্রচারিত হলেও ব্যাংকে জমা হতে মাসের ১০/১২ তারিখ চলে যায়। তারপরে পরিচালনা পর্ষদ সভাপতির দস্তখতসহ বেতন বিল তৈরি করে ব্যাংকে জমা দিতে আরো এক সপ্তাহ লেগে যায়। তাই বেসরকারি শিক্ষকদের পকেটে বেতনের টাকা আসতে মাসের বিশ তারিখ হয়ে যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও শিক্ষা বিতরণের মহান কারিগরদের বেতন এখনো অনুদান সহায়তা- এটা তাদের জীবনে এক ধরনের ‘চলিতেছে সার্কাসে’র মতো। বেসরকারি শিক্ষকরা এমনিতেই এমপিও সিস্টেমের জটিল নিয়মের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। একজন শিক্ষক ইচ্ছা মতো তাদের পছন্দের বাড়ির কাছের প্রতিষ্ঠানে বদলি হতে পারছেন না। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরে যাওয়ার পর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী টাকা পাওয়ার আগেই অর্থাভাবে বিনাচিকৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। তাছাড়া কয়েক বছর ধরে কোনও ধরনের সুবিধা না দিয়েই অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট খাতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ কাটা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক। ১৯৭৩ সালে একটি যুদ্ধবিধস্ত দেশে প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমকি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন। ১৯১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয় । এ অবস্থায় দেশ ও জনগণের স্বার্থে দ্রুত জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ বাস্তবায়ন, শিক্ষায় বিনিয়োগে ইউনেস্কো আইএলও’র সুপারিশগুলো বাস্তবায়নসহ সবার জন্য শিক্ষা গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষা জাতীয়করণ প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পাঠ্যক্রম, আইন এবং একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হলেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে বেতনের ১০ হারে কেটে রাখলেও বৃদ্ধ বয়সে যথাসময়ে এ টাকা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই। অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যান। প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা: তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন,আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশ নেত্রী, আপোষহীন নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ওয়াদা করেছিলেন ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান স্যার ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ওয়াদা করেছিলেন বি এন পি রাষ্ট্র পরিচালনা সুযোগ পেলে প্রথম কাজ হবে দেশের এম পি ও ভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের জীবন মানের উন্নয়ন করার জন্য চাকরি জাতীয়করণ করা হলে। দীর্ঘদিন আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সমস্যাটি মানবিক কারণে সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করুন। আপনার মানবিক দয়ালু হস্তক্ষেপেই পাঁচ লাখ জীবন স্বাচ্ছন্দময় হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষকদের শ্রম ও মেধার মূল্যায়ন করা এখন রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একরামুল ইসলাম তুষার, সহকারী অধ্যাপক, অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
পে-স্কেল : বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী?
বেসরকারি খাতে কোনো নির্দিষ্ট 'জাতীয় পে স্কেল' নেই, তাই সরকারি চাকরির মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পে স্কেল শুরুর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা ইতিহাস নেই। মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নীতি, কাজের ধরন, সক্ষমতা এবং বাজার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আলাদা আলাদা বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল তৈরি ও বাস্তবায়ন করে থাকে। বাংলাদেশে শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যই সরকার নির্ধারিত জাতীয় বেতন স্কেল বা পে-স্কেল চালু রয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই সর্বপ্রথম সরকারি কর্মচারীদের জন্য জাতীয় পে স্কেল কার্যকর করা হয়। এবার, দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বা নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই বর্ধিত সুবিধা কার্যকর হতে পারে– এই খবরে বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী? সরকারি দফতরে আনন্দের হাওয়া, ঠিক তখনই দেশের বেশির ভাগ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এই মহোৎসবের বিপরীতে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী? নতুন পে-স্কেলের আলো কি কোনোভাবেই পৌঁছাবে বেসরকারি খাতে? নাকি তারা পাবেন শুধু নতুন করে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির? বিভন্ন তথ্য অনুযায়ী, এবারের পে-স্কেল একযোগে নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে সংশোধিত মূল বেতনের একটি অংশ এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ভাতা সমন্বয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগে জনপ্রশাসনে কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির আশা করা হলেও, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ ধরে রাখা বেসরকারি খাতের কর্মীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে: শিল্প, তৈরি পোশাক, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও গণমাধ্যমসহ অর্থনীতির সব প্রধান চালিকাশক্তিই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো সমন্বিত চাকরি-নীতিমালা, সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো কিংবা কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। কয়েক বছর আগে বেসরকারি খাতের জন্য একটি খসড়া ‘সার্ভিস রুলস’ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ঝড় উঠেছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের দাবি–সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি বেসরকারি কর্মীদের জন্যও ন্যূনতম কর্মসংস্থানের মানদণ্ড, চাকরির নিরাপত্তা, উৎসব ভাতা ও সার্বিক শ্রমবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেলের বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত হলেও বেসরকারি খাতের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো সুবিধার রূপরেখা এই মুহূর্তে নেই। তবে বেসরকারি কর্মীদের সুরক্ষায় শ্রম নীতিমালা সংস্কারের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতে পারে। পে-স্কেল: সচিব কমিটির সভায় যেসব সিদ্ধান্ত হলো সরকারি পে-স্কেল সরাসরি বেসরকারি খাতের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে সরকারি বেতন বৃদ্ধি পরোক্ষভাবে বেসরকারি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্মীদের বেতন, মহার্ঘ ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়। গত পে-স্কেলগুলোতে সরকারি কাঠামো ঘোষণার পর বেসরকারি খাতে যে সুবিধাগুলো সাধারণত প্রসারিত হয়েছে: মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধি: সরকারি কাঠামোতে মূল বেতন বাড়ার কারণে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং প্রারম্ভিক মূল বেতন সমন্বয় করতে বাধ্য হয়। ভাতা সমন্বয়: সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও টিফিন ভাতা বৃদ্ধির পর বেসরকারি খাতের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোও কর্মীদের জন্য এই ভাতাগুলো বাড়িয়ে থাকে। বোনাস ও প্রণোদনা: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসব বোনাস ও বিশেষ সুবিধার প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতেও। এমপিওভুক্ত শিক্ষক: সরকারি পে-স্কেলের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত (MPO) শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা হয়। শ্রম আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও গ্র্যাচুইটি: নতুন পে-স্কেলে সরকারি পেনশনের হার ও গ্র্যাচুইটি বাড়লে বেসরকারি খাতের কর্মীরাও বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং টার্মিনেশন বেনিফিট পাওয়ার ক্ষেত্রে জোরালো দাবি উত্থাপন করতে পারেন। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে স্কেল, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কী বাংলাদেশে দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে সরকার, বেসরকারি চাকরিজীবীরাও কী সুবিধা বর্তমানে কার্যকর নবম জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নিয়মিত ও বিশেষ সুবিধা বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেতে পারেন এটাই সবার প্রত্যাশা। একরামুল ইসলাম তুষার, সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ ঝিনাইদহ।