তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিন, এক দশকেও কাটেনি বন্দিজীবন: সাফারি পার্কে দুই লেপার্ডের করুণ দশা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১২ পিএম

মহিউদ্দিন আহমেদ, শ্রীপুর (গাজীপুর) সংবাদদাতা

পাচারকারীদের কাছ থেকে উদ্ধারের পর নিয়ম অনুযায়ী মাত্র তিন সপ্তাহের জন্য কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল দুটি লেপার্ড শাবককে। কিন্তু সেই অস্থায়ী কোয়ারেন্টিনই এখন তাদের স্থায়ী ঠিকানা।

 প্রায় এক দশক ধরে ছোট দুটি কক্ষে বন্দি অবস্থায় দিন কাটছে পূর্ণবয়স্ক দুই লেপার্ডের। গাছে ওঠা, দৌড়ানো, লাফানো কিংবা স্বাভাবিকভাবে বিচরণের সুযোগও নেই তাদের।

ঘটনাটি গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গাজীপুর সাফারি পার্কের। ২০১৭ সালে যশোর থেকে পুলিশ দুটি লেপার্ড শাবক উদ্ধার করে। পরে খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তার মাধ্যমে শাবক দুটিকে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়। জীবাণুমুক্তকরণ ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের রাখা হয় পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টিন শেডে।

নিয়ম অনুযায়ী কয়েক সপ্তাহ পর তাদের কোয়ারেন্টিন থেকে বের করে উপযুক্ত আবাসনে দেওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়নি। দেখতে দেখতে প্রায় এক দশক পার হলেও পূর্ণবয়স্ক লেপার্ড দুটির জন্য তৈরি হয়নি কোনো উপযুক্ত এনক্লোজার।

সম্প্রতি পার্কের কোয়ারেন্টিন শেডে গিয়ে দেখা যায়, ছোট দুটি কক্ষে লোহার গ্রিলের ভেতর বন্দি রয়েছে প্রাণী দুটি। জায়গা সংকটের কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরারও সুযোগ সীমিত। মানুষ দেখলে অনেক সময় উত্তেজিত হয়ে গ্রিলে আছড়ে পড়ছে তারা। দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে থাকায় তাদের স্বাভাবিক আচরণ ও জীবনযাপন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান বলেন, জীবাণুমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে সাধারণত সর্বোচ্চ চার সপ্তাহ পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনে রাখা যুক্তিযুক্ত। সাফারি পার্কের মূল লক্ষ্য প্রাণীদের তুলনামূলক উন্মুক্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশে রাখা। দীর্ঘদিন ছোট ঘরে আটকে রাখা সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দ্রুত লেপার্ড দুটির জন্য উপযুক্ত এনক্লোজার তৈরি করা প্রয়োজন।

পার্কে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদেরও অনেকেই লেপার্ড দুটির এমন বন্দিজীবন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সাফারি পার্কে বাঘ ও সিংহের মতো লেপার্ডের জন্যও বড় পরিসরের আবাসন তৈরি করা যেতে পারে। এতে প্রাণী দুটির স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দর্শনার্থীরাও বিরল এই প্রাণী দেখার সুযোগ পাবেন।

লেপার্ড দুটির আবাসন তৈরির বিষয়ে এর আগেও একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাফারি পার্ক পরিদর্শনে গিয়ে লেপার্ড দুটির জন্য আবাসন তৈরির নির্দেশনা দেন। এরপরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

গাজীপুর সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম. কে. এম. ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল লেপার্ড দুটির অবস্থান পরিদর্শন করেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রাণী দুটির জন্য দ্রুত উপযুক্ত আবাসন তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন থেকে মুক্ত করে তাদের স্বাভাবিক আচরণ ও চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com