একই মঞ্চে মোদি–শি–পুতিন: BRICS কি নতুন কূটনৈতিক শক্তিকেন্দ্রের জন্ম দিচ্ছে?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
বিশেষ প্রতিনিধি: সঞ্জয় মজুমদার
নয়াদিল্লিতে ১২–১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত ১৮তম BRICS সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একই কূটনৈতিক মঞ্চে অবস্থান করছেন। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক বাণিজ্য-ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবির মধ্যে এই সম্মেলন BRICS-এর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরি করেছে।
সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ভারত ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ। ১২ সেপ্টেম্বর মোদি ও শি জিনপিং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুই নেতা সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সীমান্ত পরিস্থিতিসহ পারস্পরিক স্বার্থের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সাত বছর পর শির ভারত সফর হওয়ায় বৈঠকটি বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে এই rapprochement বা সম্পর্কোন্নয়নের সম্ভাবনাকে অতিরিক্ত আশাবাদীভাবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক গভীর হলেও ভারতের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৫৫.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ। ১১ সেপ্টেম্বর মোদি ও পুতিন বৈঠকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মহাকাশ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন। ভারতের সরকারি বিবৃতিতে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং BRICS-এর বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে BRICS-এর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের মধ্যেও অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই জোটে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে তাদের অবস্থান সব বিষয়ে অভিন্ন নয়। তারপরও ১২ সেপ্টেম্বর BRICS একটি যৌথ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সংযমের আহ্বান জানায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে।
BRICS-এর ঘোষণায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নও সামনে এসেছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় Global South-এর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা-নির্ভর আন্তর্জাতিক কাঠামোর বিকল্প ও অধিক বহুমেরু ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান জোরদার করছে। তবে ভারত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে যে BRICS কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট নয়।
এখানেই BRICS-এর প্রকৃত কৌশলগত প্রশ্নটি সামনে আসে। এটি কি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠবে, নাকি বিভিন্ন জাতীয় স্বার্থের সমন্বয়কারী একটি কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই থাকবে? কারণ সদস্যদেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা অগ্রাধিকার ও পররাষ্ট্রনীতি এক নয়। ফলে অভিন্ন ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি যৌথ নীতি বাস্তবায়ন করা অনেক বেশি কঠিন।
বর্তমান বাস্তবতায় BRICS-এর প্রভাব কেবল অর্থনীতি বা বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, ইউক্রেন সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জোটটি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্যও এর গুরুত্ব রয়েছে। BRICS যদি বাণিজ্য, উন্নয়ন অর্থায়ন, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, জ্বালানি সহযোগিতা ও Global South-এর কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে ভূরাজনৈতিক বিভাজন বাড়লে আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির BRICS সম্মেলনকে শুধু তিন নেতার বৈঠক হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। মোদি–শি–পুতিনের একই মঞ্চে উপস্থিতি একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার প্রতীক হলেও, BRICS সত্যিই নতুন বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠবে কি না—তার উত্তর নির্ভর করবে সদস্যদেশগুলো তাদের পারস্পরিক মতপার্থক্য কতটা সামলে বাস্তব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে তার ওপর। ১২–১৩ সেপ্টেম্বরের নয়াদিল্লি সম্মেলন সেই পরীক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।