থানচি রেঞ্জ এখন বনদস্যুদের আস্তানা, নেপথ্যে রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসরাইল
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বান্দরবানের থানচি রেঞ্জের আওতাধীন সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবাধে গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বান্দরবান বন বিভাগের থানচি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হোসেনের যোগসাজশে সংঘবদ্ধ কাঠ পাচারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গাছ কেটে পাচার করছে। এ ঘটনায় মো. ইসরাইল হোসেনের বিরুদ্ধে বনদস্যু ও কাঠ পাচারকারীদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে বন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখাচ্ছে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ। ফলে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চল। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এভাবে বন উজাড় অব্যাহত থাকলে পাহাড়ি এ অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
রেঞ্জ কার্যালয়ের পাশেই ইটভাটা
সরেজমিনে দেখা যায়, থানচি রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের কাছেই রয়েছে ব্রিকফিল্ড মাফিয়া আওয়ামীলিগ নেতা আনিসুর রহমান সুজনের এসবিএম ইটভাটা। স্থানীয়দের দাবি, ইটভাটাটি বছরের প্রায় পুরো সময়ই চালু থাকে। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় ট্রাকে করে বনাঞ্চল থেকে কাঠ এনে ওই ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক বলেন, “প্রতিদিন ট্রাকে করে বনের কাঠ এই ইটভাটায় আনা হয়। ইট তৈরিতে এসব কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত ঘনফুট কাঠ পোড়ানো হলেও এ বিষয়ে বন বিভাগের কার্যকর কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না।”
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ইটভাটাটিতে বনাঞ্চলের কাঠ সরবরাহের ক্ষেত্রে থানচি রেঞ্জ কর্মকর্তার পক্ষ থেকে অলিখিত অনুমতি বা ‘পাস’ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
‘জোত পারমিট’ ঘিরে কাঠ পাচারের অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থানচি রেঞ্জ এলাকায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ‘জোত পারমিট’ আবারও কার্যকর হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এর সুযোগ নিয়ে রেঞ্জ এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে গাছ কেটে প্রথমে বান্দরবান সদর ডিপোতে নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, সেখানে কাগজের বৈধতার আড়ালে টিপি (ট্রানজিট পাস) ইস্যুর মাধ্যমে এসব কাঠ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠও বৈধ কাঠের সঙ্গে মিশিয়ে পাচারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে সেগুন কাঠের দরজার পাল্লা, চৌকাঠ, চিরাই কাঠসহ পাড়াবন, প্রাকৃতিক বন ও সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পরিবহনের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সংরক্ষিত পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে গাছ কেটে পাচারের প্রবণতা আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ তাদের।
হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষী গাছ
সাঙ্গু বনাঞ্চলের আশপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় সাঙ্গু নদীর দুই পাড়জুড়ে ঘন বন ও শতবর্ষী গাছ ছিল। গোদা, গর্জন, চম্পা, জারুল, গুটগুটিয়া, চাপালিশ ও গামারসহ বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় গাছ ছিল এ বনাঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
থানচি থেকে সাঙ্গু নদীপথে তিন্দু, রেমাক্রি, বড় পাথর, বড় মদক, ছোট মদক, নারিশ্যা ঝিরি, ইয়াংরিং, লিকরি ও আন্ধারমানিকসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের সময় এসব গাছ চোখে পড়ত। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে সংঘবদ্ধ কাঠ পাচারকারীরা এসব গাছের বড় একটি অংশ কেটে ফেলেছে। এখনও নানা কৌশলে বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কমছে সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চল
সাঙ্গু বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী। বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সাঙ্গু-মাতামুহুরি রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতর থেকে এ নদীর উৎপত্তি। ১৮৮০ সালে সংরক্ষিত ঘোষণা করা এই বনাঞ্চল একসময় দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক বনভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল।
তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮০ সালে সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আয়তন ছিল প্রায় ৮২ হাজার ৮০ একর। সময়ের সঙ্গে বনাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে বসতি স্থাপন, গাছ কাটা ও অন্যান্য কারণে এর পরিমাণ কমেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ) সাঙ্গু বনাঞ্চলে একটি জরিপ চালায়। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বনাঞ্চলটি আশঙ্কাজনক হারে কমছিল এবং এর ফলে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখির আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপরও সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্টের বর্তমান পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কার্যকর ও নিয়মিত জরিপ বা পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় বন বিভাগের নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ গাছ কাটা বন্ধ, কাঠ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং কাঠ পরিবহনের বৈধতা যাচাই জরুরি। একই সঙ্গে বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম বা যোগসাজশের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে থানচি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে সংযোগে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।