নওগাঁয় পাইলসের অস্ত্রোপচারের পর নারীর মৃত্যু
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫২ এএম
মোঃ রমজান হোসেন নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ
নওগাঁর মহাদেবপুরে বেসরকারি একটি হাসপাতালে পাইলসের অস্ত্রোপচারের পর নাসিমা নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। অস্ত্রোপচারের আগে করা পরীক্ষায় তাঁর হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ৭.৪ গ্রাম/ডেসিলিটার পাওয়া গেলেও অস্ত্রোপচার করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা। অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং চিকিৎসাসেবা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
গত ১২ সেপ্টেম্বর উপজেলার আল মদিনা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। নাসিমা মহাদেবপুর উপজেলার রেজাউল ইসলামের স্ত্রী।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাইলসের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওই দিন নাসিমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁর রক্তসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। একটি হেমাটোলজিক্যাল রিপোর্টে হিমোগ্লোবিন ৭.৪ g/dL এবং একই দিনে করা অন্য একটি রিপোর্টে ৭.৫ g/dL পাওয়া যায়।
রিপোর্ট দুটিতে রক্তের অন্যান্য উপাদানের ফলাফলেও পার্থক্য দেখা যায়। একটিতে WBC ১২ হাজার ২০০ ও প্লেটলেট ৩ লাখ ৮৪ হাজার, অন্যটিতে WBC ২৬ হাজার ২০০ ও প্লেটলেট ৬ লাখ ৫ হাজার উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নাসিমাকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. ইমরান আলী অ্যানেস্থেশিয়া দেন এবং ডা. দেওয়ান মো. আব্দুস সবুর অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের পর রক্তস্বল্পতার কারণে বি-পজিটিভ গ্রুপের এক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
নাসিমার স্বামী রেজাউল ইসলাম বলেন, অস্ত্রোপচারের পর রাতের দিকে তাঁর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। তবে পরদিন সকাল ৮টার দিকে হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হয়। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসককে ডাকতে গিয়ে তাঁকে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
রেজাউল বলেন, পরে সকাল ৯টার দিকে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক ডা. দেওয়ান মো. আব্দুস সবুর হাসপাতালে আসেন এবং নাসিমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে অন্যত্র নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।
তিনি আরও জানান, মৃত্যুর পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁদের লিখিতভাবে মীমাংসা হয়েছে।
অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক ডা. দেওয়ান মো. আব্দুস সবুর বলেন, তিনি প্রায় চার বছর ধরে অস্ত্রোপচার করছেন। রোগীর কাগজপত্র ও পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের আগে হিমোগ্লোবিন ৭.৪ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে এক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছিল।
আল মদিনা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক মোস্তাকিম বলেন, রোগীর ভর্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন মেডিকেল অফিসার দিয়ে অ্যানেস্থেশিয়া ও অস্ত্রোপচার করানো হয়েছে। রোগীর কাগজপত্র দেখে চিকিৎসকই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মৃত্যুর পর স্বজনদের সঙ্গে লিখিতভাবে মীমাংসা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন অভিযোগের কারণে এর আগে ওই ক্লিনিক বন্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় বিষয় ঠিক করে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের লাইসেন্স নেয়।
রোগীর মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, তিনি নিজে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ১০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে অনুমোদিত এবং সেখানে সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসক থাকার কথা। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক না থাকার অভিযোগ সত্য হলে সেটিও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাসিমার মৃত্যুর ঘটনায় অস্ত্রোপচারের আগে তাঁর হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি মূল্যায়ন, রক্ত দেওয়ার সিদ্ধান্ত, অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবস্থাপনা এবং অস্ত্রোপচারের পর পর্যবেক্ষণ—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা নথি, অস্ত্রোপচারের রেকর্ড, অ্যানেস্থেশিয়া নোট, ওষুধের তালিকা, রক্ত দেওয়ার নথি এবং মৃত্যুর কারণসংক্রান্ত চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমেই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও কোনো চিকিৎসাগত অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।