৯/১১-এর ২৫ বছর: আফগানিস্তান–ইরাক যুদ্ধ থেকে বহুমেরু বিশ্ব
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪০ এএম
বিশেষ প্রতিনিধি: সঞ্জয় মজুমদার
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তিতে আজ নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ও পেনসিলভানিয়ায় নিহতদের স্মরণ করা হচ্ছে। প্রায় ৩ হাজার মানুষের প্রাণহানির সেই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র যে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু করেছিল, তা শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকের রাজনীতিই বদলায়নি; বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, সামরিক হস্তক্ষেপ, গোয়েন্দা কাঠামো এবং বিশ্বশক্তির ভারসাম্যেও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন এনেছে।
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বড় সামরিক অভিযান শুরু হয় আফগানিস্তানে। তালেবান সরকার ও আল-কায়েদাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত সেই অভিযানে প্রাথমিকভাবে ওয়াশিংটন দ্রুত সামরিক সাফল্য পেলেও পরবর্তী দুই দশকের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত একটি জটিল রাষ্ট্র পুনর্গঠন প্রকল্পে পরিণত হয়। ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবান আবার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের দীর্ঘ সংঘাতের ফলে দেশটির জনগণ এখনো গভীর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ভার বহন করছে। ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে জাতিসংঘের নথিভুক্ত হিসাবেই ৪০ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ৭৭ হাজারের বেশি আহত হয়েছে।
এরপর ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরু হয়। ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতন ঘটলেও যুদ্ধ-পরবর্তী দখলদারিত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরবর্তী বছরগুলোতে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণকে পাল্টে দেয়। Council on Foreign Relations-এর মূল্যায়নে, ইরাক অভিযানে কথিত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত পাওয়া যায়নি এবং পরবর্তী দখলদারিত্ব মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে।
তবে ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরেও। যুক্তরাষ্ট্রে Department of Homeland Security গঠিত হয়, গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবিরোধী ক্ষমতা সম্প্রসারিত হয় এবং সন্ত্রাসী অর্থায়ন ঠেকাতে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সময়ে বিমানবন্দর নিরাপত্তা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও সীমান্ত নজরদারি পর্যন্ত নিরাপত্তা নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—সামরিক শক্তি দিয়ে সন্ত্রাসবাদকে কতটা নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে? ২৫ বছর পর আল-কায়েদা আগের তুলনায় দুর্বল হলেও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংগঠনটি একটি কেন্দ্রীভূত কাঠামোর বদলে বিভিন্ন আঞ্চলিক সহযোগী গোষ্ঠীর মাধ্যমে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে প্রভাব ধরে রেখেছে। অর্থাৎ একটি সংগঠনকে সামরিকভাবে দুর্বল করা গেলেও তার আদর্শিক ও সাংগঠনিক উত্তরাধিকার পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি।
এই জায়গাতেই ৯/১১-পরবর্তী নীতির সবচেয়ে বড় বিতর্ক—সন্ত্রাসবাদ কি শুধু সামরিক সমস্যা, নাকি এর পেছনে থাকা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ? সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, শুধু সশস্ত্র গোষ্ঠীকে পরাজিত করার পরিবর্তে যে পরিবেশে চরমপন্থী মতাদর্শ জনপ্রিয়তা পায়, সেটিও মোকাবিলা করা প্রয়োজন। অন্যথায় সামরিক অভিযান একটি গোষ্ঠীকে দুর্বল করলেও নতুন গোষ্ঠী বা নতুন ধরনের হুমকি তৈরি হতে পারে।
আজকের বিশ্বে সেই হুমকির চরিত্রও বদলে গেছে। সন্ত্রাসবাদ এখন শুধু পাহাড়ি ঘাঁটি বা সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্যা নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্রচারণা, ড্রোন এবং নতুন প্রযুক্তি চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতার ধরন বদলে দিয়েছে। Council on Foreign Relations-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বিশেষভাবে ড্রোন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নতুন ধরনের সন্ত্রাসী হুমকির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, ৯/১১-পরবর্তী দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘ সামরিক ব্যস্ততার সময় চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে—যদিও বর্তমান বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার জন্য ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোই একমাত্র কারণ নয়। অর্থনৈতিক শক্তির পরিবর্তন, চীনের উত্থান, রাশিয়ার পুনঃসক্রিয়তা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বিকাশ এবং পশ্চিমা জোটব্যবস্থার পরিবর্তনও এই রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২৫ বছর পর তাই ৯/১১-এর উত্তরাধিকারকে শুধু ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সাফল্য বা ব্যর্থতা’ দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করেছে, দুটি দীর্ঘ যুদ্ধ পরিচালনা করেছে, বিপুল মানবিক ও আর্থিক মূল্য দিয়েছে এবং একই সঙ্গে এমন একটি বিশ্বে প্রবেশ করেছে যেখানে আগের মতো একক পরাশক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে একাধিক শক্তি।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—একটি সন্ত্রাসী হামলার সামরিক প্রতিক্রিয়া কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে, কিন্তু সামরিক বিজয় আর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একই বিষয় নয়। আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা, ইরাকের অস্থিতিশীলতা এবং আজকের বহুমাত্রিক নিরাপত্তা হুমকি সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।
২০২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাই শুধু অতীতের প্রায় ৩ হাজার নিহত মানুষের স্মরণদিবস নয়; এটি একটি প্রশ্নেরও দিন—২০০১-এর পর যে বিশ্ব তৈরি হয়েছিল, ২৫ বছর পর সেই বিশ্ব কি আবার বদলে যাচ্ছে? আর যদি বদলে যায়, আগামী দশকের বিশ্বব্যবস্থা কি একক নেতৃত্বের পরিবর্তে আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বহুমেরু এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে এগোবে? ৯/১১-এর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার সম্ভবত এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।