উত্তর ইথিওপিয়ায় নতুন সংঘর্ষে উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ: ইরিত্রীয় বাহিনীর উপস্থিতির খবর নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৬ এএম

 

বিশেষ প্রতিনিধি। সঞ্জয় মজুমদার, ১১ অক্টোবর ২০২৬।

ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের তিগ্রে, আফার ও আমহারা অঞ্চলে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি সব পক্ষকে অবিলম্বে সংঘর্ষ বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং ইথিওপিয়ার ভূখণ্ডে ইরিত্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে পাওয়া প্রতিবেদন সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জাতিসংঘের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে পুরো হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিকের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, সংঘর্ষে জড়িত পক্ষগুলোর উচিত ২০২২ সালের প্রিটোরিয়া চুক্তির কাঠামোর আওতায় সংলাপে ফিরে যাওয়া। গুতেরেস একই সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোকে অন্য দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। 

ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে উত্তেজনা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও বেড়েছে। ইথিওপিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো চিঠিতে অভিযোগ করেছে, ইরিত্রীয় বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে দেশটির উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করেছে এবং সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করছে। ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেদিয়ন তিমোথেওস এ ঘটনাকে আগ্রাসন হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকারের কথা উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে, ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওসমান সালেহ জাতিসংঘের কাছে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। ইরিত্রিয়ার দাবি, ইথিওপিয়া নিজের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তৈরি করতে অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলছে। ফলে দুই দেশের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ইরিত্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি এবং সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো তথ্য এখনো সীমিত; তাই এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। 

এই উত্তেজনার পেছনে তিগ্রে অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ও তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের (টিপিএলএফ) মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। ২০২২ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে সংঘর্ষ বন্ধের পথ তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিরোধ ও নতুন করে সশস্ত্র সংঘর্ষের খবর ওই সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ইথিওপিয়ার লোহিত সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাওয়ার আগ্রহও দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়িয়েছে। ১৯৯৩ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হওয়ার পর ইথিওপিয়া স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। দেশটির সমুদ্রবন্দরে প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা এবং ইরিত্রিয়ার সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত উদ্বেগ দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। তবে বর্তমান সংঘর্ষের সব কারণকে শুধু সমুদ্রবন্দরে প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। 

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার ওপর নতুন চাপ। সংঘর্ষ দীর্ঘায়িত হলে মানুষের বাস্তুচ্যুতি, চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাধা বাড়তে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতিতে ইথিওপিয়ার সহিংসতা ও ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়া উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। 

জাতিসংঘ এখন সংঘর্ষ বন্ধ, সংলাপ পুনরায় শুরু এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সংযমের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনায় ফিরতে রাজি হয় কি না এবং সীমান্ত ও সামরিক তৎপরতা নিয়ে বিরোধ কমাতে কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। নতুন সংঘর্ষ যাতে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংকটে পরিণত না হয়, সে জন্য যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন প্রধান উদ্বেগের বিষয়।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com