আমিত্বের রাজনীতি: ‘আমাদের লোক’ নয়, যোগ্যতাই হোক প্রধান বিবেচনা

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩২ পিএম

রাজনীতির অন্যতম বিপজ্জনক ব্যাধি হলো ‘আমিত্ব’। এটি কেবল ব্যক্তিগত অহংকার কিংবা আত্মম্ভরিতার প্রকাশ নয়; এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আরও ভয়ংকর। যখন কোনো নেতা নিজেকে দলের চেয়ে বড় মনে করেন, কোনো গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের সম্পত্তি ভাবতে শুরু করে, কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্য যোগ্যতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমিত্ব ব্যক্তি থেকে সংগঠন, সংগঠন থেকে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরিণতি হয় মেধার অবমূল্যায়ন, দলীয়করণ, সুবিধাবাদ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।

আমিত্বের রাজনীতি শেখায়—‘আমিই সঠিক’, ‘আমার লোকই যোগ্য’, ‘আমার বিরোধিতা মানেই শত্রুতা’। অথচ রাজনীতির মূল কথা হওয়ার কথা জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও জনগণের অংশগ্রহণ। ব্যক্তির অহংকার যখন আদর্শকে গ্রাস করে, তখন রাজনীতি আর জনসেবার মাধ্যম থাকে না; হয়ে ওঠে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার।

 

‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতির বিপদ

আমিত্বের রাজনৈতিক প্রকাশ সবচেয়ে স্পষ্ট ‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতিতে। এখানে যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতার চেয়ে গুরুত্ব পায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দলীয় পরিচয় এবং নেতার প্রতি আনুগত্য। ফলে পদ-পদবিতে মূল্যায়িত হন তোষামোদকারীরা, আর উপেক্ষিত হন যোগ্য ও নীতিনিষ্ঠ মানুষ—বিশেষত যাঁরা প্রশ্ন তোলেন কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন।

এই সংস্কৃতি সাময়িকভাবে কোনো নেতা বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনকে দুর্বল করে। কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ে, সুযোগসন্ধানীরা প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং আদর্শের জায়গা দখল করে সুবিধাবাদ। একসময় সংগঠন জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে।

ত্যাগ ও আনুগত্যের মূল্য অবশ্যই আছে। কিন্তু অতীতের অবদান কাউকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। নেতৃত্ব কিংবা দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।

 

নেতা বড়, নাকি প্রতিষ্ঠান?

রাজনীতিতে নেতৃত্ব অপরিহার্য, কিন্তু নেতৃত্বের অর্থ মালিকানা নয়। একজন নেতার দায়িত্ব সংগঠনকে শক্তিশালী করা, যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করা এবং মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সামাল দেওয়া। কিন্তু তিনি যদি সমালোচনা সহ্য করতে না পারেন, নিজের ঘনিষ্ঠদের জবাবদিহির বাইরে রাখেন কিংবা বিকল্প নেতৃত্বের উত্থান ঠেকান, তাহলে সংগঠন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।

গণতান্ত্রিক নেতা নিজের বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করতে ভয় পান না; বরং এটিকে দায়িত্ব মনে করেন। বিপরীতে, আমিত্বে আক্রান্ত নেতা নিজের চারপাশে এমন বলয় তৈরি করেন, যেখানে প্রশংসা নিরাপদ, কিন্তু ভিন্নমত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে নেতার কাছে বাস্তবতার বদলে পৌঁছায় মনঃপূত তথ্য, আর ভুল সংশোধনের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়।

যে নেতৃত্ব সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, সে নেতৃত্ব নিজের ভুল সংশোধনের ক্ষমতাও হারায়। তাই নেতার চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে বড় করে দেখার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

 

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কি দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার?

আমিত্বের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি নিয়োগব্যবস্থা পরিচালিত হওয়া উচিত আইন, পেশাদারত্ব ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রাধান্য পেলে নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পেশাদারত্ব, আইনের শাসন ও জনসেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।

নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছ মানদণ্ড নিশ্চিত করা তাই অপরিহার্য। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা পাবেন না, আবার ভিন্নমতের কারণে কেউ বৈধ অধিকার থেকেও বঞ্চিত হবেন না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হবে যোগ্যতার স্বীকৃতি, দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার নয়।

 

মেধার অবমূল্যায়ন, ভবিষ্যতের অবক্ষয়

একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ শুধু অর্থ, অবকাঠামো কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; মানুষের মেধা, দক্ষতা ও নৈতিকতাও তার বড় শক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্য থাকলেও ভিত দুর্বল থেকে যায়।

কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ব্যক্তিকে সরিয়ে অনুগত কাউকে দায়িত্ব দিলে তার ক্ষতি শুধু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেবার মান কমে, সম্পদের অপচয় বাড়ে এবং দক্ষ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একইভাবে, রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ্য কর্মীরা উপেক্ষিত হলে সাংগঠনিক শক্তি ও জনআস্থা—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা মানে শুধু শিক্ষাগত সনদ বা পরীক্ষার নম্বর নয়। সততা, অভিজ্ঞতা, দায়িত্বশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও নৈতিক দৃঢ়তাও যোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মেধার সঙ্গে নৈতিকতা এবং দক্ষতার সঙ্গে জবাবদিহির সমন্বয় ঘটাতে হবে।

 

আমিত্ব থেকে কর্তৃত্ববাদ

ব্যক্তিগত অহংকার আর কর্তৃত্ববাদ এক বিষয় নয়। তবে আত্মকেন্দ্রিকতা, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা ও ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ পরস্পরকে শক্তিশালী করতে পারে। ব্যক্তি যখন নিজের মতকেই একমাত্র সত্য মনে করেন, তখন ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা না করে দমন করার প্রবণতা তৈরি হয়। রাজনৈতিক সংগঠনে এই মানসিকতা প্রতিষ্ঠা পেলে সমালোচক হয়ে ওঠেন শত্রু, আর ক্ষমতা চলে যায় জবাবদিহির বাইরে।

কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা অনেক সময় ছোট ছোট অনিয়মকে স্বাভাবিক করে তোলার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। প্রশ্ন করলেই অপছন্দ, প্রতিবাদ করলেই অবাধ্যতার তকমা, আর দলীয় স্বার্থের নামে অন্যায়কে প্রশ্রয়—এসবই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে।

এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। শুধু প্রতিপক্ষের অন্যায় তুলে ধরলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না; নিজের দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও একই নৈতিক অবস্থান নিতে হয়। ন্যায়বিচারের মানদণ্ড সবার জন্য সমান না হলে তা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সুবিধাবাদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

 

ভিন্নমত হোক শক্তি, শত্রুতা নয়

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য মতের ঐক্যে নয়, মতপার্থক্যের মধ্যেও সহাবস্থানে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র শক্তিশালী করা জরুরি। নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ, অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এবং আর্থিক কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

নেতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যায়। বরং যুক্তিসংগত সমালোচনা সংগঠনকে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেয়। যে সংগঠন প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সংগঠন নিজের দুর্বলতাও শনাক্ত করতে পারে না।

একই সঙ্গে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজে সহনশীলতা, যুক্তিবোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা বাড়াতে হবে। কারণ, ব্যক্তিপূজা ও অন্ধ আনুগত্যের সংস্কৃতি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রভাব রাজনীতিতেও পড়বেই।

 

ব্যক্তির ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠান, পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যোগ্যতা

আমিত্বের রাজনীতি থেকে মুক্তি পেতে শুধু নৈতিক আহ্বান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রের প্রয়োগ, নিয়মিত নেতৃত্ব নির্বাচন, স্বচ্ছ পদায়ন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়িত্বের মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও দলীয় পরিচয়ের বদলে যোগ্যতা, সততা ও পেশাগত দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেই অপরিহার্য হয়ে যান না; কোনো পরিবারের সন্তান হলেই নেতৃত্বের যোগ্যতা অর্জন করেন না। একইভাবে, রাজনৈতিক মতভিন্নতা কারও মেধা কিংবা অবদান অস্বীকারের যুক্তি হতে পারে না। নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হওয়া উচিত কাজ, জনআস্থা, নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।

শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে ওঠে, যাতে কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও তার কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। ব্যক্তি আসবেন, ব্যক্তি চলে যাবেন; কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

 

শেষ কথা

আমিত্বের বিপরীতে প্রয়োজন আত্মমর্যাদাহীনতা নয়, দায়িত্বশীল আত্মবিশ্বাস; অন্ধ আনুগত্য নয়, নীতিনিষ্ঠ সহযোগিতা; ব্যক্তিপূজা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধা। একজন যোগ্য নেতা নিজের কৃতিত্ব সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগ করেন, ভুল স্বীকার করেন এবং অন্যদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন। আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁর অধিকার ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেয়।

আজ সময় এসেছে ‘আমার লোক’ নয়, যোগ্য লোক বেছে নেওয়ার; ‘আমি একাই সব’ নয়, আমরা সবাই মিলে এগিয়ে যাওয়ার। দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অর্থবিত্তের প্রভাবকে পেছনে রেখে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কারণ, আমিত্ব ক্ষমতাকে ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত করতে চায়; গণতন্ত্র ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনে। আমিত্ব নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়; প্রকৃত নেতৃত্ব সবার যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে।

রাজনীতির সাফল্য কতজন মানুষ একজন নেতার অনুগত, তা দিয়ে মাপা যায় না; বরং সেই নেতৃত্ব কতটা যোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রেখে যেতে পেরেছে, তা দিয়েই তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয়।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com