‘এমপিদের পাত্তা দেন না কেন’, ডিসির জবাব: ‘শব্দচয়নে সতর্ক থাকুন’

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ পিএম

রফিকুল ইসলাম সাবুল: রংপুর প্রতিনিধি 

রংপুরে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাত, পদমর্যাদাক্রম না মানা ও সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল। জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করা হলে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। জবাবে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, বক্তব্য দেওয়ার সময় সবাইকে শব্দচয়নে সতর্ক থাকতে হবে।

রংপুরে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রশাসনের সঙ্গে সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের কথার লড়াই হয়েছে। সভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া, সরকারি বিভিন্ন কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখা এবং সার ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তোলেন তিনি। প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটি দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে প্রয়োজনে আন্দোলন ও ঘেরাও কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন এই সংসদ সদস্য।

রোববার (১১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় রংপুর জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান। সংসদ সদস্যের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, জেলার সর্বোচ্চ ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় সবারই শব্দচয়নে সতর্ক থাকা উচিত।

সভায় রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী ও রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিনসহ জেলা ও মহানগর পুলিশের কর্মকর্তা এবং জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

‘এমপিদের পাত্তা দেন না কেন’

সভায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। রাষ্ট্র নির্ধারিত পদমর্যাদাক্রম (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের সম্মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

বেলাল বলেন, ‘আপনারা এমপিদের পাত্তা দিচ্ছেন না। হোয়াই? হোয়াই? কী ভেবেছেন আপনারা? আপনারা আসমান থেকে এসেছেন? মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছেন? উই আর দ্য সনস অব দিস ল্যান্ড সয়েল। আমাদের জনগণ ভোট দিয়েছে। আমাদের পাত্তা দেন না কেন, কেন, কেন?’

জনগণের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলনে নামার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা ভদ্রলোক। পাশাপাশি আমরা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধি। জনগণের ন্যায্য দাবিতে বাধ্য হয়ে আমাকে আন্দোলনে নামতে হবে। আমার মূল শক্তি হলো জনগণ।’

সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ

সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য বেলাল। তাঁর অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কিছু ব্যবসায়ী ডিলারশিপ পাননি। অন্যদিকে, দলীয় পরিচয়ের কারণে অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিরা ডিলারশিপ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘একটি সার ডিলারশিপের জন্য অনেক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী আবেদন করেছেন, সমস্ত শর্ত পূরণ হয়েছে। বাট সে পেল না। পেল কে? দলীয় পরিচয়ে একজন বিশেষ লোক, যার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, কোনো গোডাউন নেই, কোনো সলভেন্সি নেই। তারপরও সে কীভাবে পেল?’

বেলাল আরও বলেন, ‘সারের বিষয়ে একটি লজ্জাজনক, ন্যক্কারজনক দলীয়করণ হয়েছে। আমি এর তীব্র নিন্দা করছি। সব ডিলার একটি দল থেকে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হলেন কেন?’

তবে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কমিটিতে এমপিদের প্রতিনিধি নেই

জেলার বিভিন্ন সরকারি কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখার অভিযোগও তোলেন বেলাল। তাঁর দাবি, অনেক কমিটিতে জনপ্রতিনিধিদের প্রতিনিধি রাখার বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘জেলায় অনেক কমিটি আছে। আপনারা জানেন, অনেক কমিটি। কিন্তু এমপির কয়জন প্রতিনিধি সেখানে আছেন? সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, এমপির প্রতিনিধি থাকবে। সেটাও নেই।’

জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত না করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে জনমতের যথাযথ প্রতিফলন ঘটে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোতে বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি রাখার আহ্বান জানান।

প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার না থাকায় অসন্তোষ

সভায় সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার উপস্থিত না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন বেলাল। তাঁর মতে, নগরীর আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘সিটি নিয়ে আলোচনা হবে, আর সিটি প্রশাসক থাকবেন না, বা মেয়র থাকবেন না এটা তো হতে পারে না। তাঁরা আসবেন না কেন, আমি বুঝি না। আমার মাথায় ঢোকে না। এমপিরা যদি থাকতে পারেন, হোয়াই নট প্রশাসক, হোয়াই নট মেয়র? আমি বুঝি না। হোয়াই নট পুলিশ কমিশনার?’

এ সময় সভাটি পুনর্নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

‘থানা ও ডিসি অফিস ঘেরাও করতে বাধ্য করবেন না’

প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে বেলাল বলেন, কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণের দাবি উপেক্ষা করা হলে তাঁরা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

বেলাল বলেন, ‘আপনাদের তামাশা আমরা দেখছি। আপনারা একটি দলের তেল মারছেন। কত তেল মারবেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বাধ্য করবেন না থানায় ঘেরাও করার জন্য। আমাদের বাধ্য করবেন না ডিসি অফিস ঘেরাও করার জন্য।’

জবাবে ডিসি বললেন, ‘শব্দচয়নে সতর্ক থাকুন’

সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, এ ধরনের বড় পরিসরের সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় সবাইকে শব্দচয়নের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সরকারি কর্মকর্তারা যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন উল্লেখ করে তিনি পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে কথা বলার ওপর গুরুত্ব দেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের সব সদস্যকেই শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্কভাবে কথা বলা দরকার। কারণ, এটি একটি জেলার সর্বোচ্চ ফোরাম। এখানে সব সরকারি কর্মকর্তা আছেন। তাঁরা সবাই যোগ্যতার ভিত্তিতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পেয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘কাকে কীভাবে, কতটুকু বলব, সে ক্ষেত্রে আমাদের সবারই সম্মান বজায় রেখে কথা বলার সুযোগ আছে। বিশেষ করে শব্দচয়নের ক্ষেত্রে। আমরা কোন ভাষায়, কী শব্দ বলব, কোন জায়গায় বলব—এসব বিষয়ে আসলে আমাদের সবারই খেয়াল রাখা উচিত।’

দুর্গাপূজার নিরাপত্তা ও নগরীর সমস্যা নিয়েও আলোচনা

সভায় আসন্ন দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদ্‌যাপনে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানান বেলাল। পূজামণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। পূজার পরিবেশ বিঘ্নিত করার চেষ্টা ঠেকাতে প্রশাসনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এ ছাড়া শ্যামা সুন্দরী খাল সংস্কার, যানজট নিরসন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার এবং ঢাকা কোচ স্ট্যান্ড শহরের বাইরে স্থানান্তরের বিষয়েও বক্তব্য দেন এই সংসদ সদস্য।

সভায় প্রশাসনের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়, সরকারি কমিটিতে প্রতিনিধিত্ব এবং সার ডিলার নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো আলোচনায় গুরুত্ব পায়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হবে।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com